তারপর কর্নেলের আর পাত্তা নেই। বসে আছি তো আছিই। অস্বস্তি যত, বিরক্তিও তত। কতক্ষণ পরে পেছনে কোথাও শুকনো পাতার মচমচ শব্দ এল। দ্রুত পিছু ফিরে দেখি, পুকুরের দিকে নেমে যাচ্ছে একটা গাধা। তার পিঠে একটা বোঁচকা বাঁধা। রামুর গাধাটা নয় তো?
গাধাটা অদৃশ্য হলে আবার রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। একটু পরে দেখি কর্নেল যা বলেছিলেন, ঠিক তা-ই। সেই রিকশাটা এসে থামল। রিকশা থেকে রোগা চেহারার ধুতিপাঞ্জাবি পরা এক ভদ্রলোক হন্তদন্ত নামলেন। অমনই তিনবার শিস দিলাম।
এতক্ষণে কর্নেল বেড়া গলে বেরিয়ে এলেন। চাপা স্বরে বললেন, কেটে পড়া যাক। চলে এসো।
আমরা গুঁড়ি মেরে পুকুরের দিকে এগিয়ে গেলাম। পুকুরের চারপাড়ে ঘন জঙ্গল। তলায় দামে ঢাকা খানিকটা জল। গাধাটা পিঠে বোঁচকা নিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে জলজ ঘাস খাচ্ছে। কর্নেল গাধাটার দিকে প্রায় দৌড়ে গেলেন। ওঁর এই পাগলামি দেখে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম।
উনি কাছে যেতেই গাধাটা এক লাফে পুকুরের ধারে ধারে নড়বড় করে দৌড়োতে থাকল। কর্নেল তাড়া করলেন। গাধাটা পাড়ের জঙ্গল ফুঁড়ে উধাও হয়ে গেল।
এবং কর্নেলও।
অগত্যা আমাকে দৌড়োতে হল। পাশের জঙ্গলে ঢুকেছি, পেছন থেকে চেরা গলায় হাঁকডাক ভেসে এল, চোর! চোর! ধর! ধর!
একবার ঘুরে দেখে নিলাম, সেই রিকশাওলা আর সম্ভবত মোহন মাস্টারমশাই দৌড়ে আসছেন। কেলেঙ্কারিতে পড়া গেল দেখছি। জঙ্গল পেরিয়ে গিয়ে দেখলাম কর্নেল বা গাধা নেই। হলুদ ফুলে ঢাকা সরষে আর সবুজ ধানখেত এদিকটায়। ডানদিকে পোড়ো ভিটে আর ভাঙাচোরা মন্দির। লুকিয়ে পড়ার জন্য সেদিকটায় দৌড়ে গেলাম। পেছনের চ্যাঁচামেচি ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে।
হাঁপাতে হাঁপাতে একটা ভাঙা শিবমন্দিরের আড়ালে গিয়ে গুঁড়ি মেরে বসলাম। তারপরে দেখতে পেলাম কর্নেলকে। চোখে বাইনোকুলার রেখে একটা উঁচু গাছের ডগায় কিছু দেখছেন। কাছে গিয়ে বললাম, কী অদ্ভুত কাণ্ড আপনার।
ডার্লিং। আমার চেয়ে অদ্ভুত কাণ্ড করল রামুর গাধাটা। রামু পাগল হয়েছে। গাধাটার তো পাগল হওয়ার কথা নয়।
বিরক্ত হয়ে বললাম, আর একটু হলেই কেলেঙ্কারি হত। সেই রিকশাওলা আর মোহনবাবু আমার পেছনে চোর-চোর, ধর-ধর বলে তাড়া করেছিলেন।
কর্নেল বাইনোকুলার নামিয়ে বললেন, তোমাকে দেখে ফেলেছিলেন নাকি?
হ্যাঁ।
সেটা তোমারই বোকামি। আমার পেছন-পেছন তোমারও দৌড়োনো উচিত ছিল। বলে কর্নেল চারপাশটা দেখে নিয়ে পা বাড়ালেন। কুইক জয়ন্ত। আর এখানে নয়। গাধাটা এতক্ষণে ঝিলের জঙ্গলে গিয়ে পৌঁছেছে।
নাহ। আপাতত গাধার পেছনে ছোটা নিরর্থক।
সোজা এগিয়ে সেই পিচের রাস্তায় পৌঁছোলাম দুজনে! তারপর একটা খালি সাইকেল রিকশা দাঁড় করিয়ে কর্নেল বললেন, জমিদারবাড়ি। তাড়াতাড়ি চলো ভাই।
আকার প্রকারে মনে হচ্ছিল, এসব বাড়িকেই হয়তো একসময় বলা হত সাতমহলা পুরী। কিন্তু এখন হতশ্রী অবস্থা। দেউড়ি আছে এবং মাথায় দুটো সিংহও আছে। কিন্তু সিংহের পেট ফুড়ে অশ্বত্থচারা গজিয়েছে। দারোয়ান থাকার কথা নয়। দু-ধারে পামগাছ এবং এবড়োখেবড়ো একফালি রাস্তা। পোর্টিকোর তলায় গিয়ে রিকশা থেকে দুজনে নামলাম। তারপর হলঘরের দরজায় দীপককে দেখলাম। বলল, আসুন, আসুন। ওপর থেকে আপনাদের দেখতে পেলাম। আবার কোনও গন্ডগোল হয়নি তো?
কর্নেল বললেন, নাহ। তোমার বাবা আছেন?
বাবা স্কুলে গেলেন একটু আগে। ম্যানেজিং কমিটির মিটিং আছে। উনি তো কমিটির সেক্রেটারি। ভেতরে আসুন।
হলঘরে ঢুকে কর্নেল বললেন, হালদারমশাইয়ের খবর কী?
দীপক হাসল, ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়েছেন! অদ্ভুত মানুষ!
আচ্ছা দিপু, তোমাদের পাতালঘরের চাবি কার কাছে থাকে?
দীপক একটু গম্ভীর হয়ে বলল, ভজুয়ার কাছে নীচে কিছু ঘরের চাবি থাকত। কারণ সেই-ই এসব ঘর দেখাশোনা করত। আসলে ভজুয়া যে ঘরে থাকত, তার পাশে একটা ঘরে পুরোনো ভাঙাচোরা আসবাবপত্র ঠাসা আছে। ওই ঘরের কোনাতেই পাতালঘরে নামার গোপন সিঁড়ি আছে।
ঘরটা একটু দেখতে চাই। মানে সেই সিন্দুকটা।
এক মিনিট! মায়ের কাছ থেকে চাবি নিয়ে আসছি।
একটু পরে সে চাবির গোছা নিয়ে ফিরে এল। গোলাকধাঁধার মতো কয়েকটা ঘরের ভেতর দিয়ে সেই ঘরটাতে নিয়ে গেল সে। দরজা খুলে সুইচ টিপে আলো জ্বালল। আবর্জনার মতো পুরোনো চেয়ার-টেবিল-খাট ইত্যাদির স্তূপে ঘরটা ভর্তি। এক কোণে কাঠের আলমারি দাঁড় করানো আছে। দীপক সেটা ঠেলে সরাতেই একটা ছোট্ট দরজা দেখা গেল। সে দরজা খুলে গোপন সুইচ টিপে আলো জ্বালল। বলল, আসুন।
সিঁড়ি দিয়ে নেমে ছোট্ট একটা ঘরে পৌঁছোলাম। কেমন ভ্যাপসা দুর্গন্ধ। দেওয়ালে সিঁদুরের ছোপে একটা স্বস্তিকা আঁকা। তার নীচেই কালো কাঠের সিন্দুকটা খুলল দীপক। কর্নেলের পকেটে সব সময় টর্চ থাকে দেখছি। টর্চের আলোয় ভেতরটা খুঁটিয়ে দেখতে থাকলেন। ততক্ষণে দুর্গন্ধে আমি অস্থির। কর্নেল হঠাৎ ঝুঁকে একটা কালচে ছোট্ট জিনিস সিন্দুকের ভেতর থেকে তুলে নিলেন। উজ্জ্বল মুখে বললেন, হুঁ! পাওয়া গেল তা হলে।
দীপক বলল, কী পাওয়া গেল কর্নেল?
কর্নেল বললেন, যা পাওয়া উচিত ছিল। চলো, বেরোনো যাক এখান থেকে।
.
০৫.
হলঘরে ফিরে কর্নেল বললেন, এই জিনিসটার খোঁজে ম্যাজিকবাবুর ডেরায় হানা দিয়েছিলাম। তার ম্যাজিকের বাকসো-পাটরা তন্নতন্ন খুঁজে যখন পেলাম না, তখন বুঝলাম এটা হয়তো সিন্দুকের ভেতর থেকে গেছে। কাপালিকবেশী লোকটি যে-ই হোক, তাকে ম্যাজিকবাবু এটা দিলে প্রাণে মারা পড়ত না। ম্যাজিকবাবু ভজুয়ার সাহায্যে সিন্দুক থেকে তান্ত্রিক আদিনাথের বন্ধ লাশের হাড়গোড় নিয়ে গিয়েছিল…
