মনাই জোরে মাথা দোলাল। কর্নেল ওর হাতে একটা দশটাকার নোট গুঁজে দিলেন। সে টাকাটা নিয়ে পকেটে ঢোকাল। বলল, চলুন স্যার! সেই গাছ থেকে লালপাতার ঝুরি পেড়ে দেব।
ওবেলা আসব’খন। তো, ভজুয়া তোমার বাবার কাছে আড্ডা দিতে আসত না?
আসত। আসত স্যার!
সাধুবাবা থাকার সময় ভজুয়া এসেছিল?
হুঁ।
কর্নেল উঠলেন। বললেন, ওবেলা আসব। তখন তোমার মায়ের সঙ্গে দেখা করব। চলি!
শ্মশানতলা থেকে একফালি পায়ে-চলা পথে পৌঁছে বললাম, ছেলেটা বেশ স্মার্ট। এবং অত্যন্ত সরল।
প্রকৃতির মধ্যে যারা থাকে, তারা স্বভাবত সরল হয়। আর ওকে স্মার্ট বললে। সে-ও ঠিক। কারণ এখনই ওকে বেঁচে থাকার জন্য লড়াই দিতে হবে। সম্ভবত এই বয়সেই ঘাটোয়ারিবাবু ওকে কাজে বহাল করবেন। তবে মড়াপোড়ানো কাজটা ওর পক্ষে কঠিন হবে না। বাবার সঙ্গে এই কাজটা ওকে করতে হয়েছে। আমি দেখেছি।
এবার আমরা কোথায় যাচ্ছি?
ম্যাজিকবাবুর বাড়ি।
কঙ্কগড়ের এদিকটা চেহারায় একেবারে পাড়াগাঁ। গা ঘেঁষাঘেঁষি মাটির বাড়ি, টালি বা খড়ের চাল। কিন্তু কয়েকটা বাড়ির মাথায় টিভির অ্যান্টেনা দেখে অবাক হলাম। কিছুক্ষণ পরে একটা পিচের রাস্তায় উঠলাম। এরপর মফসসল শহরের চেহারা। নতুন-পুরোনো একতলা বা দোতলা বাড়ি। পিচ রাস্তায় ট্রাক, টেম্পো, জিপ, প্রাইভেট কার এবং সাইকেল রিকশার বিরক্তিকর আনাগোনা। মোড়ে একটা খালি সাইকেল রিকশার কাছে গেলেন কর্নেল। বললেন, ওহে রিকশাওলা, এখানে ম্যাজিকবাবুর বাড়িটা কোথায় জানো?
রিকশাওলা চমকে-ওঠা ভঙ্গিতে বলল, ম্যাজিকবাবু? সে তো মা চণ্ডীর থানে নরবলি হয়ে গেছে স্যার!
বলো কী!
আজ্ঞে হ্যাঁ। সে এক সাংঘাতিক কাণ্ড। কথায় বলে, বেদের মরণ সাপের হাতে। যে ভূতটাকে নিয়ে খেলা দেখাত, সেই ভূতটাই নাকি বলি দিয়েছে!
ভূত নিয়ে খেলা দেখাত ম্যাজিকবাবু? কেমন ভূত? তুমি দেখেছিলে ভূতের খেলা?
রিকশাওলা দুঃখিত মুখে একটু হাসল। দেখেছিলাম স্যার! নরকঙ্কাল ইস্টেজে এসে নাচত। ম্যাজিকবাবু বলত, ওঠ। উঠে দাঁড়াত। বোস, বললে বসত। নাচ, বললে নাচত। সে কী নাচ স্যার!
কর্নেল চুরুট জ্বেলে বললেন, ওর বাড়িটা কোথায়? নিয়ে চলো আমাদের।
রিকশাওলা বলল, ম্যাজিকবাবুর নিজের বাড়ি তো ছিল না স্যার! বাউন্ডুলে লোক। মাঝে-মাঝে এসে থাকত। আবার চলে যেত কোথায়।
কিন্তু কার বাড়িতে এসে থাকত?
মোহনবাবুর বাড়িতে। ইস্কুলের মাস্টার উনি।
চলো। মোহনবাবুর কাছে যাওয়া যাক। বলে কর্নেল রিকশায় উঠে বসলেন। ওঁর ইশারায় আমিও উঠে বসলাম।
রিকশাওলা বলল, কিন্তু মাস্টারমশাই তো এখন ইস্কুলে আছেন।
ওঁর বাড়ি গিয়ে খবর দেব’খন। তুমি ওঁর বাড়িতেই নিয়ে চলো।
বাড়ি অবধি রিকশা যাবে না।
যতদূর যায়, নিয়ে চলো।
রিকশাওলা অনিচ্ছা-অনিচ্ছা করে প্যাডেলে চাপ দিল। যেতে-যেতে বলল, মাস্টারমশাইয়ের বাড়িতে কাউকে পাবেন না। মিছিমিছি হয়রান হবেন, স্যার!
কর্নেল বললেন, কেন? বাড়িতে লোক নেই?
নাহ। মাস্টারমশাই একা থাকেন। বিয়ে-টিয়ে করেননি। বিধবা দিদিকে এনে রেখেছিলেন। তিনিও স্বগগে গেছেন।
ম্যাজিকবাবু সঙ্গে নিশ্চয় কোনও সম্পর্ক ছিল মাস্টারমশাইয়ের?
শুনেছি, পিসতুতো না মাসতুতো ভাই ওঁরা!
পিচরাস্তা ছেড়ে খোয়াঢাকা এবড়োখেবড়ো ঘিঞ্জি গলি রাস্তায় এগোচ্ছিল রিকশা। একসময় নিরিবিলি একটা জায়গায় পৌঁছোলাম। কাছাকাছি বাড়ি নেই। শুধু জরাজীর্ণ ছোটো ছোটো মন্দির আর পোড়ো ভিটে। জঙ্গল গজিয়ে আছে চারদিকে। সংকীর্ণ রাস্তাটা সোজা এগিয়ে গেছে। একধারে রিকশা দাঁড় করিয়ে রিকশাওলা বলল, আর যাওয়া যাবে না স্যার। এই যে পায়ে চলা রাস্তা দেখছেন, সিধে গিয়ে বাঁ দিকে তাকাবেন। মাস্টারমশাইয়ের বাড়ি দেখতে পাবেন!
আমরা নামলে সে রিকশা ঘুরিয়ে একটু হেসে বলল, মাস্টারমশাইকে খবর দেওয়ার লোক পাবেন কি? দেখুন। বরঞ্চ আমাকে দুটো টাকা বাড়তি দিলে ইস্কুলে খবর দেব। আপনাদের ফেরত নিয়েও যাব।
কর্নেল ওকে পাঁচ টাকার নোট দিয়ে বললেন, দরকার নেই। আমি লোক খুঁজে নেব। রিকশাওলা এতক্ষণে সন্দিগ্ধমুখে আমাদের দিকে তাকাতে তাকাতে রিকশার সিটে উঠল। তারপর কে জানে কেন, খুব জোরে রিকশা চালিয়ে চলে গেল। কর্নেল অভ্যাসমতো বাইনোকুলারে চারদিক দেখে নিয়ে বললেন, এসো জয়ন্ত। কুইক। আমার ধারণা, রিকশাওলা মোহনবাবুকে যেচে পড়েই খবর দেবে, দুজন উটকো লোক ওঁর বাড়িতে গেছেন।
পায়ে চলা পথে শুকনো পাতা পড়ে আছে। দু-ধারে পোড়ো ভিটে আর ভাঙাচোরা শিবমন্দির। ঘন ঝোপঝাড় আর উঁচু গাছপালা পাখিদের তুমুল চ্যাঁচামেচি চলেছে। এলোমেলো জোরালো হাওয়া দিচ্ছে। বাঁ দিকে প্রায় হানাবাড়ির মতো দেখতে একটা একতলা বাড়ি দেখা গেল। সদর দরজায় তালা আঁটা। কর্নেল বাড়ির পেছন দিকে এগিয়ে গেলেন। ওঁকে অনুসরণ করলাম। ওদিকটায় একটা হজামজা পুকুর দেখা গেল। কর্নেল আবার চারপাশটা খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে বললেন, তুমি এই ঝোপের আড়াল থেকে ওই রাস্তার দিকে লক্ষ্য রাখো। কাউকে এদিকে আসতে দেখলে তিনবার শিস দেবে। বোকামি কোরো না কিন্তু। সাবধান।
বাড়ির পেছনের পাঁচিল জায়গায় জায়গায় ধসে গেছে কবে। সেখানে ডালপালার বেড়া দেওয়া হয়েছে। এখানে বেড়া ঠেলে সরিয়ে কর্নেল ঢুকে গেলেন। বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল। পকেট থেকে রিভলভারটা বের করে বাগিয়ে ধরলাম এবং গুঁড়ি মেরে বসলাম। রাস্তাটার দিকে নজর রাখলাম।
