কেউ ধাক্কা দিচ্ছিল। তড়াক করে উঠে বসলাম। কর্নেলকে দেখতে পেলাম। মাথার টুপিতে শুকনো পাতা, মাকড়সার জাল, খড়কুটো আটকে আছে। হাতে প্রজাপতি ধরা নেট-স্টিক। গলায় কামেরা এবং বাইনোকুলার ঝুলছে। বললেন, দশটা বাজে প্রায়। ব্রেকফাস্ট রেডি। রঘুলালকে বলে গিয়েছিলাম, তোমাকে যেন যথেচ্ছ ঘুমোতে দেয়।
উনি পোশাক বদলাতে ব্যস্ত হলেন। বুঝলাম, যথারীতি ভোরবেলা প্রকৃতিজগতে চলে গিয়েছিলেন। তবে অনেক দেরি করেই ফিরেছেন আজ।
কিছুক্ষণ পরে ব্রেকফাস্টে বসে বললাম, কঙ্কালের ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছি না। সত্যিই কি ওটা তান্ত্রিক আদিনাথের কঙ্কাল? কর্নেল দাড়ি থেকে এটা পোকা বের করে উড়িয়ে দিলেন। বললেন, কাল রাতেই একটা বোঝাপড়া হয়ে যেত। কিন্তু তোমার হঠকারিতার জন্যই সব ভেস্তে গেল। তুমি যদি আমার কথা মেনে চুপচাপ থাকতে, আমাকে আর বেশি পরিশ্রম করতে হত না।
কী মুশকিল! ব্যাটাচ্ছেলে হালদারমশাইয়ের গলায় খাঁড়ার কোপ চালাতে যাচ্ছিল যে। কর্নেল আনমনে বললেন, যা হওয়ার হয়ে গেছে। খেয়ে নিয়ে বেরোনো যাক।
ওই ভূতুড়ে জঙ্গলে?
নাহ। শ্মশানে।
.
০৪.
কঙ্কাল দর্শনের পর শ্মশানযাত্রা। যদিও দিনদুপুর, ব্যাপারটা বেশ অস্বস্তিকর। কর্নেলের সঙ্গে হাঁটতে-হাঁটতে বনবাদাড় ভেঙে যেখানে পৌঁছোলাম, সেখানে একটা নদী। নামেই নদী। বালি আর পাথরে ঠাসা অগভীর একটা সোঁতা। এঁকেবেঁকে ঝিরঝিরে একফালি কালো জল অবশ্য বয়ে যাচ্ছে। প্রকাণ্ড একটা বটগাছের তলায় জীর্ণ কুঁড়েঘর। নদীর বালিতে গর্ত খুঁড়ে তিনটে কাচ্চাবাচ্চা হুল্লোড় করে কী খেলা খেলছে।
কর্নেল কুঁড়েঘরের কাছে গেলেন। এতক্ষণে ওপাশে একটা বাঁশের মাচা দেখতে পেলাম। মাচায় বসে আছে একটা পনেরো-ষোলো বছরের ছেলে। কষ্টিপাথরে খোদাই করা চেহারা যেন। পরনে হাফপ্যান্ট আর ছেঁড়া লাল গেঞ্জি। আমাদের দেখে সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। কর্নেল মিঠে গলায় বললেন, কী মনাই? আমাকে চিনতে পারছ না? গত বছর তুমি আমাকে জঙ্গলের গাছ থেকে কত অর্কিড পেড়ে দিয়েছিলে, মনে পড়ছে।
মনাই নামে ছেলেটির মুখে একই হাসি ফুটল। মাচা থেকে নেমে সেলাম দিয়ে বলল নদীর ওপারে একটা গাছে দেখেছি স্যার! লাল-লাল পাতা।
তোমার বাবার খবর শুনে মন খারাপ হয়ে গেছে মনাই!
মনাইয়ে মুখের খুশি চলে গেল। চোখ নামিয়ে আঙুল খুঁটতে থাকল। বুঝলাম, মনাই সেই জগাইয়ের ছেলে। তার চোখ ছলছল করছিল।
কর্নেল বললেন, তোমার মা কোথায়?
মনাই আস্তে বলল, ঘাটোয়ারিবাবুর অফিসে গেছে। বাবার মাইনের টাকা বাকি। বাবু রোজ ঘোরাচ্ছে মাকে।
কর্নেল বাঁশের মাচায় সাবধানে বসলেন। পুরোনো মাচা ওঁর ভার সইতে পারবে না মনে হচ্ছিল। উনি ইশারায় আমাকে বসতে বললেন। ভয়ে ভয়ে একপাশে বসলাম। কর্নেল বললেন, জগাইয়ের এটা আড্ডা-দেওয়ার আখড়া ছিল জয়ন্ত! সন্ধেবেলা ওর কাছে কত লোক আড্ডা দিতে আসত। তাই না মনাই?
মনাই মাথা নাড়ল।
মাঝে মাঝে সাধুসন্ন্যাসীরাও এসে এখানে ধুনি জ্বালিয়ে বসতেন শুনেছি। জগাই বলছিল। তো তোমার বাবা খুন হওয়ার আগেও নিশ্চয় কোনো সাধুসন্ন্যাসী এসেছিলেন। ওই যে! ধুনির ছাই দেখছি।
মনাই একটু ইতস্তত করে বলল, ম্যাজিকবাবুর সঙ্গে এক সাধু আসত স্যার! চেহারা দেখলে ভয় করে। মাথায় জটা। লাল চোখ। মা বলছিল, ওই সাধুই প্রথমে ম্যাজিকবাবুকে চণ্ডীর থানে বলি দিয়েছে। তারপর বাবাকে।
ম্যাজিকবাবু মানে শচীন হাজরা?
মনাই মাথা দোলাল। বলল, মা বলছিল, ওই সাধুই অজ্ঞান করে বাবাকে বলি দিয়েছে। বাবাকে যে রাত্তিরে বলি দেয়, খুব ঝড়বৃষ্টি হচ্ছিল। আমি জেগেই ছিলাম। মা বারবার ঘরের দোর ফাঁক করে বাবাকে ডাকছিল। বাবা এল না। শেষে জলঝড় থামলে মা লণ্ঠন হাতে এখানে এল। আমাকেও সঙ্গে নিয়ে এল। বলল, দুজনে ঠ্যাং ধরে টানতে-টানতে ঘরে ঢোকাব।
কর্নেল চুরুট জ্বেলে বললেন, বলো কী! তারপর?
এসে দেখি বাবা নেই। সাধু বসে আছে। মা সাধুবাবাকে ডাকাডাকি করল। সাধুবাবা চোখ বুজে মন্তর পড়ছিল। তাকালই না। তখন মা সাধুবাবাকে বকাঝকা করল। অনেকক্ষণ পরে সাধুবাবা চোখ কটমট করে বলল, জগাইকে একটা কাজে পাঠিয়েছি। তোরা ঘুমোগে যা।
তোমরা ঘুমোতে গেলে?
মনাই ছোট্ট শ্বাস ছেড়ে বলল, হুঁ। তারপর আর বাবার পাত্তা নেই। সক্কালে একটা মড়া এল। ঘাটোয়ারিবাবুর লোক এক পাঁজা কাঠ মাথায় করে এল। বাবা নেই দেখে সে মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করল। সেই সময় রামু হাঁপাতে হাঁপাতে এসে খবর দিল চণ্ডীর থানে।
মনাই ঢোক গিলে থেমে গেল। কর্নেল বললেন, পুলিশ আসেনি তারপর?
এসেছিল স্যার! মা সব বলেছে পুলিশকে।
আচ্ছা মনাই, সেই সাধুবাবুকে আগে কখনও দেখেছ? ভালো করে ভেবে বলো।
দেখিনি। তবে চেনা-চেনা মনে হয়েছিল।
ভজুয়াকে নিশ্চয় চিনতে তুমি? সে-ও তো বলি হয়ে গেছে শুনেছি।
হ্যাঁ স্যার! মা বলছিল এ-ও সাধুবাবার কাজ। সাধুবাবা নাকি মানুষ না। মানুষের রূপ ধরে এসেছিল।
কর্নেল গম্ভীর মুখে মাথা দোলালেন। ঠিক বলেছ মনাই! শুনেছি সাধুবাবা আসলে একটা নরকঙ্কাল।
মনাই চমকে উঠল। ভয়-পাওয়া মুখে বলল, স্যার! মা বলছিল, সাধুবাবার কাছে যেন একটা কঙ্কাল দাঁড়িয়েছিল। আমি দেখতে পাইনি। মা নাকি দেখেছিল।
সেই ঝড়বৃষ্টির রাতে?
