হ্যাঁ। কর্নেল বললেন। এবং আমরাও কঙ্কালটাকে দেখেছি।
হালদারমশাই জোরে মাথা নেড়ে বললেন, আমি দেখি নাই। আমি একজন কাপালিক দেখেছি। তারে ফলো করেছিলাম।
দীপক বলল, কাপালিক! বলেন কী মামাবাবু?
হঃ! কাল রাত্রেও তারে ফলো করেছিলাম। চণ্ডীর মন্দিরে ওখানে ত্রিশূল দিয়ে মাটি খুঁড়ছিল। আমার সাড়া পেয়ে পালিয়ে গেল। আবার আজও বহুক্ষণ ওত পেতে থেকে তারে দেখলাম। আজ আর মাটি খুঁড়ছিল না। তার পিঠে একটা বোঁচকা বাঁধা ছিল। বোঁচকা লইয়া দৌড়ানো সহজ নয়। বোঁচকায় কী থাকতে পারে বলুন তো কর্নেলসাব?
কর্নেল বললেন, কঙ্কাল থাকতেও পারে।
দীপক বলল, তা হলে ওটা কি ঠাকুরদার জ্যাঠামশাইয়ের সেই কঙ্কাল?
কর্নেল বললেন, কিছু বলা যায় না।! তবে আর এখানে নয়। বাংলোয় ফেরা যাক। দিপু তুমিও এসো। মামাবাবুর সঙ্গে বাড়ি ফিরবে।
দীপক পা বাড়িয়ে নার্ভাস হেসে বলল, ঠাকুরদার লেখা বইটার কথা তা হলে সত্যি? কিন্তু কে ওই কাপালিক?
আমি বললাম, সে-যে-ই হোক, আপনাদের পাতালঘর থেকে সে কঙ্কাল চুরি করেছে। এবং কোথায় খুলি পোঁতা ছিল তাও আবিষ্কার করেছে। তারপর ধড়ের সঙ্গে মুণ্ড জুড়েছে। প্রেতাত্মায় বিশ্বাস করি বা না করি, এই ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে।
হালদারমশাই আনমনে বললেন, আমি কঙ্কাল দেখলাম না ক্যান?
বললাম, চোখে দেখেননি। তার বিদঘুঁটে কথাবার্তা কানে তো শুনেছেন।
হঃ। বলে গুম হয়ে গেলেন গোয়েন্দা ভদ্রলোক।
ডাকবাংলোয় আবার আলো নেই। তার চেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, আমাদের ঘরের দরজার তালা ভাঙা। কিচেনের দিকে গিয়ে দেখি, মেন সুইচ আগের মতো অফ করা আছে। অন করে দিলাম। আলো জ্বলে উঠল। ঘরে ফিরে এসে দেখলাম, লন্ডভন্ড অবস্থা। কর্নেল তাঁর কিটব্যাগ গোছাচ্ছেন। হালদারমশাই বিড়বিড় করছেন, চোর! চোর! কাপালিক না, চোর!
দীপক আর আমি ওলট-পালট বিছানা দুটো ঠিকঠাক করে ফেললাম। আমার ব্যাগের জিনিসপত্র মেঝেয় ছত্রখান হয়ে পড়েছিল। গুছিয়ে নিলাম।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, চোর বড্ড বোকা। তার এটুকু বোঝা উচিত ছিল, যা সে খুঁজতে এসেছে, তা বাংলোয় রেখে যাওয়ার পাত্র আমি নই। আসলে প্রথমে সে ধরেই নিয়েছিল জিনিসটা হালদারমশাইয়ের কাছে আছে। তাই তাকে বলিদানের ভয় দেখাচ্ছিল। আমরা গিয়ে পড়ার পর সে পালিয়ে গেল। কিন্তু তার মাথায় তখন খটকা বেধেছে। বলিদানের হুমকিতেও যখন জিনিসটা পাওয়া গেল না তখন ওটা নিশ্চয় হালদারমশাইয়ের কাছে নেই। সম্ভবত আমার কাছেই আছে। অতএব আমাদের অনুপস্থিতির সুযোগে সে বাংলোয় এসে হানা দিয়েছিল।
কর্নেল মেঝের দিকে তাকালেন। খালি পায়ে এসেছিল চোর। লাল সুরকির স্পষ্ট ছাপ পড়েছে। হুঁ, একটুখানি জলকাদা ভেঙেই মানে শর্টকাটে এসেছিল সে। যাইহোক, রাত তিনটে বাজে প্রায়। জয়ন্ত, তুমি কিচেনে গিয়ে কেরোসিন কুকার জ্বেলে, প্লিজ, একপট কফি করে ফেলো। কফি! কফি এখন খুবই দরকার!
দীপক বলল, চলুন জয়ন্তদা! আমি আপনাকে হেল্প করছি।
রঘুলাল কাজের লোক। কিচেনে সব কিছু ঠিকঠাক রেখে গিয়েছিল। কফি তৈরির কাজটা আমিই করলাম। দীপক প্রহরীর মতো বল্লম আর টর্চ হাতে দাঁড়িয়ে রইল। তার ভাবভঙ্গিতে বোঝা যাচ্ছিল, যে ভীষণ ভয় পেয়েছে। পাওয়ারই কথা। ভয় কি আমিও পাইনি? এই চর্মচক্ষে জ্যান্ত কঙ্কাল দর্শন আর তার বিকট খ্যানখেনে গলায় কথাবার্তা শোনা জীবনে একটা সাংঘাতিক অভিজ্ঞতা। কর্নেল ঠিকই বলেন, প্রকৃতির রহস্যের শেষ নেই সভ্যতার আলোর তলায় আদিম রহস্যে ভরা অন্ধকার থেকে গেছে।
কফি করতে করতে হালদারমশাইয়ের দুর্দশার বিবরণ দিলাম দীপকবাবুকে। দীপক হাসবার চেষ্টা করে বলল, ডিটেকটিভদ্রলোকের মাথায় ছিট আছে।
বললাম, কর্নেলের মাথাতেও কম ছিট নেই।
ট্রেতে কফির পট আর পেয়ালা সাজিয়ে নিয়ে এলাম। দীপক কিচেনে তালা এঁটে দিল। ঘরে ঢুকে দেখি হালদারমশাই চাপা গলায় কর্নেলকে তার তদন্ত রিপোর্ট দিচ্ছেন।
কফি খেতে-খেতে ক্রমশ চাঙ্গা হচ্ছিলেন প্রাইভেট ডিটেকটিভ। প্যান্ট শার্টে লালচে দাগড়া-দাগড়া ছোপ। খি-খি করে হেসে বললেন, কর্নেলস্যার কইলেন, যে দড়ি দিয়া আমারে– বাঁধছিল, তা নাকি রামু ধোপার গাধা বাঁধার দড়ি। ঠিক, ঠিক। তাই তো ভাবছিলাম, কাপালিক দড়ি পাইল কই?
রামু এবং তার গাধাকে নিয়ে কর্নেল হালদারমশাইয়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ রসিকতার পর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বললেন, নাহ দিপু এবার শুয়ে পড়া উচিত। তোমার মামাবাবুর ওপর বড় ধকল গেছে। ওঁর বিশ্রাম দরকার।
হঃ। বলে হালদারমশাই উঠে দাঁড়ালেন।
ওঁরা চলে যাওয়ার পর দরজা বন্ধ করে বাতি নিভিয়ে আমরা শুয়ে পড়লাম। কর্নেল বললেন, তা হলে ডার্লিং, তোমাকে যা বলেছিলাম…
ওঁর কথার ওপর বললাম, হ্যাঁ। রহস্য ঘনীভূত। কিন্তু কঙ্কাল যে জিনিসটা চাইছিল, সেটা কি ওই চাকতি?
হ্যাঁ। ব্রোঞ্জের সিল।
কী আছে ওতে?
কর্নেল সেই ছড়াটা আওড়ালেন ঘুমঘুম কণ্ঠস্বরে :
আটঘাট বাঁধা
বার পনেরো চাঁদা
বুড়ো শিবের শূলে
আমার মাথা ছুঁলে
ওঁ হ্রীং ক্লীং ফট
কে ছাড়াবে জট।
তারপর ওঁর নাক-ডাকা শুরু হল। কয়েকবার ডেকে আর সাড়া পাওয়া গেল না। ঘুমোবার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু এমন সাংঘাতিক অভিজ্ঞতার পর ঘুমোনো যায় না। বারবার সেই দৃশ্যটা চোখে ভাসছিল। মশালের আলোয় ভাঙা দেওয়ালের ধারে একটা নরকঙ্কাল। দুহাতে চকচকে খাঁড়া; তার ওই খ্যানখেনে অদ্ভুত কণ্ঠস্বর।
