আর মশালের পাশে দাঁড়িয়ে বিকট অঙ্গভঙ্গি করছে সেই নরকঙ্কালটা। মশালের পেছনে একটা পাথুরে দেওয়াল। দেওয়ালে কঙ্কালটার ছায়াও নড়ছে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করা কঠিন, এ এমন একটা দৃশ্য।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার, কঙ্কালের দুহাতের মুঠোয় একটা চকচকে খাঁড়া। একটু তফাতে একটা হাড়িকাঠ পোঁতা আছে। তার পাশে একটা লোক আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে। কঙ্কালটা খাড়া নাচিয়ে খ্যানখেনে গলায় বলে উঠল, এখনও বলছি ওটা কোথায় আছে বল। না বললেই বলি হয়ে যাবি।
বন্দি লোকটা গোঁ-গোঁ করে কী বলার চেষ্টা করল। পারল না।
কঙ্কালটা হুংকার দিল। ন্যাকামি হচ্ছে? তুই আমার খুলির সমাধি খুঁড়েছিস। তুই, তুই ওটা পেয়েছিস। দে বলছি!
বন্দি লোকটা আবার গোঁ-গোঁ করে উঠল। তখন কঙ্কালটা এক পা বাড়িয়ে খাঁড়া তুলে তেমনই খ্যানখেনে গলায় বলে উঠল, তবে মর!
এরপর আমার মাথার ঠিক রইল না। কর্নেলের নিষেধ ভুলে গেলাম। চোখের সামনে নরবলি হবে! আস্ত একটা ভূত মানুষের গলায় কোপ বসাবে। এ সহ্য করা যায়? একলাফে বেরিয়ে গিয়ে রিভলবার তুলে গর্জে উঠলাম, নিকুচি করেছে ব্যাটাছেলে ভুতের!
অমনই কঙ্কালটা শূন্যে ভেসে পেছনের পাঁচিলের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। তাড়া করতে যাচ্ছি, কর্নেল ডাকলেন, জয়ন্ত! জয়ন্ত! কী পাগলামি করছ? খাপ্পা হয়ে বললাম পাগলামি আমি করছি না আপনি? চোখের সামনে একটা মানুষকে একটা ভূত ব্যাটাচ্ছেলে বলি দেবে…
কর্নেল অট্টহাসি হাসলেন। প্রেতাত্মার পেছনে তাড়া করে লাভ নেই, ডার্লিং! বরং এসো হলদারমশাইয়ের বাঁধন খুলে দিই।
আকাশ থেকে পড়ে বললাম, উনি হালদারমশাই? কী সর্বনাশ!
কর্নেল মশালটা উপড়ে এনে বন্দি হালদারমশাইয়ের কাছে পুঁতলেন। মশালটা তৈরি করা হয়েছে একটা ত্রিশুলে। টর্চের আলোয় গোয়েন্দা ভদ্রলোকের দুর্দশা দেখে কষ্ট হল। দড়ির বাঁধন খুলে দেওয়ার পর উনি তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন। খি-খি করে একচোট হেসে বললেন, বলি দিত না। ভয় দ্যাখাইতাছিল।
কর্নেল টর্চের আলো জ্বেলে সেই ভাঙা দেওয়ালের কাছে কিছু তদন্ত করতে গেলেন। আমি বললাম, হালদারমশাই! কঙ্কালটার হাতে খাঁড়া ছিল। সে সত্যি আপনার গলায় কোপ বসাতে যাচ্ছিল।
ক্কী? কঙ্কাল? হালদারমশাই পোশাক থেকে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন। কই কঙ্কাল? কোথায় কঙ্কাল? কোথায় দেখলেন?
গোয়েন্দা ভদ্রলোক বাধা দিয়ে বললেন, নাহ। একজন সাধুবাবা। ক্যাপালিক কইতে পারেন। তারে ফলো করে আসছিলাম। হঠাৎ সে গাছের উপর থেকে জাম্প দিল। ওঃ! কী সাংঘাতিক জোর তার গায়ে মশাই!
কিন্তু আমরা দেখলাম একটা কঙ্কাল খাঁড়া হাতে আপনাকে শাসাচ্ছে।
ভুল দ্যাখছেন! বলে হালদারমশাই প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকালেন। আবার একচোট হেসে বললেন, আমার ফায়ার আর্মস আছে টের পায় নাই।
তা হলে কোনো কঙ্কাল আপনি দেখেননি?
নাহ।
কিন্তু সে আপনার সঙ্গে কথা বলছিল। শাসাচ্ছিল।
কাপালিক! কাপালিক!
কর্নেল এসে বললেন, কঙ্কালটাকে হালদারমশাই দেখতে পাননি। কারণ ওঁকে ওপাশে কাত করে ফেলে রেখেছিল। উনি ভাবছিলেন, যে কাপালিক ওঁকে ধরেছে, সে-ই কথা বলছে।
হালদারমশাই নস্যির কৌটো বের করে নস্যি নিলেন। তারপর বললেন, কর্নেলস্যার! জয়ন্তবাবু কঙ্কালের কথা বলছেন। কিছু বুঝতে পারছি না। আপনি বুঝাইয়া দেন, এখানে স্কেলিটন আইল ক্যামনে?
পরে বুঝিয়ে দেব। এদিকটায় ঝিলের একটা ঘাট আছে। চলুন ঝিলের জলে ঘাড়ে আর চোখেমুখে জলের ঝাপটা দেবেন। ব্রেন ঝরঝরে হয়ে যাবে।
কর্নেল মশালটা মাটিতে ঘষটে নেভালেন। তারপর ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলেন। এখানেও একটা ভাঙাচোরা পাথুরে ঘাট।
হালদারমশাই রগড়ে হাত-মুখ ধুলেন। কাঁধে জলের ঝাপটা দিলেন। তারপর বললেন, ওই যাঃ! হোয়ার আর মাই শুজ? অ্যান্ড মাই টর্চ?
কর্নেল হাসলেন। দেখলেন তো? জল আপনার ব্রেন কেমন চাঙ্গা করে দিয়েছে।
হালদারমশাইয়ের জুতো দুটো ওপাশে একটি ভাঙা মন্দিরের তলায় অনেক খোঁজার পর পাওয়া গেল। কিন্তু টর্চটা পাওয়া গেল না। এদিকটায় একসময় দালানকোঠা ছিল বোঝা যাচ্ছে। কর্নেলকে জিজ্ঞেস করলে বললেন, হ্যাঁ। এখানেই কঙ্কগড়ের রাজধানী ছিল। এখন জঙ্গল। মুঘল আমলের একটা গড়ও ছিল। সেটা এই জঙ্গলের দক্ষিণ-পশ্চিমে। এখন একটা ঢিবিমাত্র। যাই হোক, আর এখানে নয়। বাংলোয় ফেরা যাক।
হালদারমশাই শ্বাস ছেড়ে বললেন, টর্চটা গেল। কাপালিকেরই কাজ!
কর্নেল বললেন, কাপালিক আপনার টর্চ কুড়োনোর সময় পায়নি। কাল সকালে এসে বরং ভালো করে খুঁজবেন।
আমরা কয়েক পা এগিয়েছি, হঠাৎ পেছন থেকে একঝলক টর্চের আলো এসে পড়ল। তারপর দীপকের সাড়া পেলাম। কর্নেল! আমি দিপু।
হালদারমশাই ঘুরে দাঁড়িয়ে সহাস্যে বললেন, এসো ভাগনে! এসো, মামা ভাগনে একসঙ্গে বাড়ি ফিরব।
দীপক প্রায় দৌড়ে এল। উত্তেজিতভাবে বলল জঙ্গলে আলো দেখতে পেয়েছিলাম কিছুক্ষণ আগে। তাই বেরিয়ে পড়েছিলাম, জঙ্গলে ঢুকতে যাচ্ছি, হঠাৎ একটা বিকট হাসি শুনলাম। টর্চ জ্বেলে দেখি…
কর্নেল বলে উঠলেন, কঙ্কাল?
হ্যাঁ! আস্ত কঙ্কাল। দীপকের হাতে একটা বল্লম দেখা গেল। সেটা তুলে সে বলল, বল্লমটা তাক করতেই কঙ্কালটা ভ্যানিশ! নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না কর্নেল! তবে আমি মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম। কী করা উচিত ভাবছি, সেই সময় ঝিলের ঘাটে টর্চের আলো চোখে পড়ল। আপনাদের কথাবার্তা শুনতে পেলাম। আলোটা দেখেই কি আপনারাও এখানে এসেছিলেন?
