বুরাখ আমাকে ধরল। তার শরীর তুলতুলে স্পঞ্জের মতো। আমার প্রতিবিম্ব মমির মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার দিকে হাত নেড়ে চিন্তার ভাষায় বললুম, বিদায় জয়ন্ত চৌধুরি।
হতচ্ছাড়া দ্বিতীয় জয়ন্ত কেন জানি না, গোমড়া মুখে দাঁড়িয়ে রইল। নির্বাসনের দুঃখেই কি? ওজরাক হাত তুলল। বিদায় বন্ধু!
ওজরাক, না মুসা!!
কেউ ডাকছিল। চোখ খুলেই ভড়কে গেলুম। আমার উপর ঝুঁকে আছে চিরচেনা দাড়িওয়ালা একটা মুখ। মুখে সস্নেহ হাসি—কেমন বোধ করছ, ডার্লিং? একটু অপেক্ষা করো। কাশিম খাঁ অ্যামবুল্যান্স আনতে গেছেন।
উঠতে গিয়ে টের পেলুম, শরীর প্রায় নিঃসাড়। মাথার পিছনে যন্ত্রণা। আস্তে বললুম, আমি কোথায়?
—কান্দ্রার তৃণভূমিতে।
—বুঝেছি! ওজরাকের রোবট বুরাখ আমাকে এখানে রেখে গেছে। কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, ওজরাকের রোবট নয় জয়ন্ত, গুজর রাখাল ছেলেরা।
–অসম্ভব!
—উঁহু। দক্ষিণে পাহাড়ের ধারে গভীর খাদে একটা ডোবা আছে। জলের ধারে তুমি পড়েছিলে। রাখাল ছেলেরা এতদূরে বয়ে এনে আমাকে খবর দিতে গিয়েছিল।
এবার দেখলুম, চারপাশে ভিড় করে গুজররা দাঁড়িয়ে আছে। হালাকু এবং রিয়াও আছে। হালাকু ভয় পাওয়া গলায় বলল, হুজুর! উনি ওজরাকের চেলা বুরাখের নাম করছেন! ওঝা ডাকাই উচিত ছিল।
রাগ করে বললুম, ওজরাক আমার বন্ধু। তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। সে আলফা-সেন্টোরি নক্ষত্রজগতের বাসিন্দা। সে এক আলোর মানুষ।
কর্নেল নির্বিকারভাবে বললেন, আলোর নয়, নেহাতই রক্তমাংসের। তার নাম মুসা।
—কী বলছেন! কে মুসা?
–একসময়কার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পদার্থবিজ্ঞানী। কাশ্মীরের লোক। ল অফ প্যারিটি নিয়ে গবেষণায় সুনাম ছিল। দুঃখের বিষয়, তিনি পরে কট্টর ভারতবিরোধী হয়ে পড়েন। লাল আপেল দল তাঁরই গড়া।
বললুম, আমি বিশ্বাস করি না। ওজরাকের সঙ্গে আমার কত কথা হয়েছে। সে–
কথা কেড়ে কর্নেল বললেন, তুমি পাহাড় থেকে ডোবার জলে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে ডার্লিং! অজ্ঞান অবস্থায় বোধ করি একটি উদ্ভট স্বপ্ন দেখেছ। আমরা আজ দুপুরে পশ্চিম পাহাড়ের ভিতর লাল আপেল-নেতা মুসার গোপন ঘাঁটি আবিষ্কার করেছি। মুসা তার ম্যাগ্নেটিক ফ্লাইং শিপে চেপে আকসাই চীনের দিকে পালিয়ে গেছেন। সঙ্গে রোবটটিকেও নিয়ে গেছেন। তবে তাঁর আবিষ্কৃত ম্যাটার ড়ুপ্লিকেটিং মেশিন, ইমেজ রিফ্লেক্টর, কিছু লেসার অস্ত্র আর চুরি যাওয়া জিনিসগুলো উদ্ধার করতে পেরেছি।
অবাক হয়ে বললুম, রত্ন আর মূর্তি চুরি কেন করতেন মুসা?
—ড়ুপ্লিকেটরে ওগুলোর অসংখ্য বস্তু-প্রতিবিম্ব তৈরি করে বিদেশে বেচে দলের জন্য অর্থ সংগ্রহই ছিল উদ্দেশ্য। কিন্তু মুসা প্রথমে খেয়াল করেননি, বস্তু-প্রতিবিম্বের অ্যান্টি-ম্যাটার হওয়ার চান্স আছে। ওতে হাত দিলেই বিস্ফোরণ ঘটবে। পরে ব্যাপারটা খেয়াল হওয়ায় স্পেস রিসার্চ ল্যাব থেকে অ্যান্টি-ম্যাটার ডিটেকশন সিস্টেম চুরি করেন।
—কীভাবে চুরি করতেন?
-ম্যাগ্নেটিক ফ্লাইং শিপ রেডার স্ক্রিনের পাল্লার বাইরে কোথাও রেখে মিসাইল সিস্টেমের সাহায্যে রোবটটিকে নির্দিষ্ট টার্গেটের দিকে পাঠাতেন। ধরো, কোনও জাদুঘরে রত্ন বা মূর্তি হাতাতে চান। আগে থেকে লাল-আপেলের চররা দর্শকদের ভিড় সেই জাদুঘরে গিয়ে জিনিসটা কোথায় আছে এবং কীভাবে সে ঘরে পৌঁছনো যাবে, সবকিছু তথ্য সংগ্রহ করেছে। নকশা তৈরি করেছে। মুসা সেইসব তথ্য ও নকশার ডাটা কোড-ল্যাংগুয়েজে রূপান্তরিত করে রোবটের মাথায় ভিতরকার কম্পিউটারে ফিড করিয়েছেন। রোবটের বুকে টিভি ক্যামেরা ফিট করে দিয়েছেন। এবার রোবটটি কম্পিউটারের সাহায্যে টার্গেটে পৌঁছে কাজ করবে। লেসার বিমের তাপে ঘরের তালা গলাবে। লকারে রত্ন থাকলে লকার গলিয়ে ফেলবে। মূর্তির বেলায় অবশ্য কাজটা সহজ। যদি রোবট ভুল করে, সেজন্য সাবধানী মুসা ফ্লাইং শিপে বসে টিভি স্ক্রিনে লক্ষ রাখতেন। বেগতিক দেখলে রিমোট কন্ট্রোল সিস্টেমে রোবটকে সাহায্য করতেন। রোবটের সামনে মানুষ পড়লে রোবট লেসার বিম প্রয়োগ করে তাকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে। আশা করি, পদ্ধতিটা বুঝতে পেরেছ?
—কিন্তু ঘুঙুরের শব্দ, শিস, ঝড়?
—ডঃ সোম ঠিক বলেছিলেন। মুসার ম্যাগ্নেটিক ফ্লাইং শিপ এবং পৃথিবীপৃষ্ঠের চৌম্বক প্রবাহের মধ্যে বিকর্ষণঘটিত এবং বিকর্ষণজনিত অভিঘাত বায়ুমণ্ডলে তরঙ্গ সৃষ্টি করত। ঝড় এবং ওইসব অদ্ভুত শব্দ তারই ফলাফল।
একটু চুপ করে থেকে বললুম, রিয়ার প্রতিবিম্ব, আমার বা আপনার প্রতিবিম্ব নিয়ে কি তামাশা করতেন মুসা?
কর্নেল হাসলেন। তামাশা নয়। ত্রিমাত্রিক প্রতিবিম্বের মরীচিকা প্রতিফলিত করে ভয় দেখানোই ছিল উদ্দেশ্য, যাতে কেউ পশ্চিম পাহাড় তল্লাটে পা না বাড়াই! ওজরাকের কিংবদন্তিকে কাজ লাগাতে চেষ্টা করেছেন মুসা।
—ওজরাকের পাঞ্জাও কি ওঁর তৈরি?
–না জয়ন্ত! ওগুলো ন্যাচারাল রক ফর্মেশন। হাজার হাজার বছর আগে এই এলাকায় উল্কা পড়েছিল। উল্কার উপাদান আর ভূ-পৃষ্ঠের শিলা-উপাদানে বহু রাসায়নিক পদার্থ আছে। উভয়ের মিশ্রণে বিক্রিয়ার ফলে ওই চাকতিগুলো ব্যাঙের ছাতার মতো সৃষ্টি হয়েছিল। শিলাছত্রাক বলতে পার। তবে মুসা এগুলো ওজরাক-রহস্যের নিদর্শন হিসাবে কাজে লাগাতেন। চোখে ধূলো দেওয়ার প্রচেষ্টা আর কী!
সামরিক বাহিনীর অ্যাম্বুল্যান্স এসে গেল। গুজরদের ভিড় হটিয়ে কাশিম খাঁ এলেন। সঙ্গে স্ট্রেচার নিয়ে দুজন স্বাস্থ্যকর্মী। স্ট্রেচারে যখন আমাকে ওঠানো হয়েছে, চোখ গেল পশ্চিম পাহাড়ের দিকে। অমনি ওজরাকের ইন্দ্রজাল দেখতে পেলুম। কী অপরূপ বর্ণবিচ্ছুরণ! ধারায়-ধারায় নেমে আসছে অজস্র রঙের ঝরনা। কান্দ্রার তৃণভূমিকে স্বর্গের সৌন্দর্যে সাজিয়ে তুলেছে। কে বলে ওজরাক নিছক স্বপ্ন? ওই তো দেখছে পাচ্ছি, আঁকাবাঁকা বর্ণালীরেখায় স্পষ্ট ফুটে উঠেছে তার ছাপ। যে আলোর আঙুল আমি দেখেছি, ওই তো তার বিস্ময়কর প্রতীক।
