—কান্দ্রার নবাবের নুরে আলম কি তুমিই নিয়ে এসেছ?
—হ্যাঁ, জিনিসটা আমারই। অসাবধানে পড়ে গিয়েছিল। একটা লোক কুড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তোমাদের সময়ের হিসাবে এ টিনা দুশো বছর আগেকার। যাই হোক, পরে জানতে পেরে রোবট পাঠিয়ে নিয়ে এসেছি।
—আমাদের বিভিন্ন জাদুঘর থেকে যেসব রত্ন আর মূর্তি চুরি গেছে, তাও কী তোমার কীর্তি?
—আমারই।
—কেন এসব করেছ?
—ওগুলোর বস্তু-প্রতিবিম্ব সৃষ্টি করব বলে। কাজ হয়ে গেলেই ওগুলো ফেরত পাঠাব।
—প্রতিবিম্ব কেন সৃষ্টি করবে?
–দেশে ফিরে গিয়ে সবাইকে দেখাব। কিছু নিদর্শন নিয়ে যাওয়া তো উচিত।
—কিন্তু এসআরএল থেকে অ্যান্টিম্যাটার ডিটেকশন যন্ত্র কেন নিয়ে এসেছে?
–দরকার হয়েছে। এ ধরনের জিনিস আজও আমরা তৈরি করতে পারিনি। তাই বহুবার অ্যান্টিম্যাটার গ্যালাক্সি—যাকে বলা যায় প্রতিবিম্ব সেখানে দৈবাৎ গিয়ে পড়ে আমাদের অনেকে ধ্বংস হয়েছে। আমাদের শরীর আলো-কণিকায় গড়া। কিন্তু অ্যান্টি-পার্টিকল নয়। আলফা-সেন্টোরি এলাকা এই গ্যালাক্সিরই অন্তর্ভুক্ত। তবে তোমাদের যন্ত্রটার বস্তু-প্রতিবিম্ব তৈরি করে ফেরত পাঠাব রোবটের হাতে। অন্যের জিনিস আমরা নিই না। নিলে তা ফেরত দিই। রোবট এনেছি সেইজন্যই।
তোমরাও তাহলে রোবট তৈরি করেছ?
–বন্ধু! আমার একই গ্যালাক্সির প্রাণী। পরিবেশের দরুন আমাদের দেহের উপাদানে যতই তফাত থাক, একই গ্যালাক্সিতে একই ধরনের সভ্যতার বিকাশ ঘটবে, এটাই প্রকৃতির নিয়ম। তবে তোমরা এখনও পিছনে পড়ে আছে। আমাদের যন্ত্র-প্রাণী তোমাদের চেয়ে বহু উন্নত।
—তোমাদের খাদ্য কী?
—এনার্জি। নক্ষত্র থেকে এনার্জি সংগ্রহ করে আমাদের খাদ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা হয়েছে।…তুমি হাসছ কেন বন্ধু?
—রিয়ার, আমার আর আমার বৃদ্ধ বন্ধুর প্রতিবিম্ব পাঠিয়েছিলে কেন?
—কৌতুক ছাড়া আর কোনও উদ্দেশ্য ছিল না।
—বশির খাঁকে মারলে কেন?
—আমার রোবটের পাল্লায় পড়েছিল। ওর নাম বুরাখ। বুরাখ এই ঘাঁটি পাহারা দেয়। ও যাকে ছোঁয়, সে মারা পড়ে। পৃথিবীতে এসে বুরাখ বড় নিষ্ঠুর আয় বদরাগী হয়ে গেছে। ওকে সামলানো যাচ্ছে না।
–রিয়াদের মদ্দা ভেড়াটা কী দোষ করেছিল?
—বুরাখ গাড়োলটা দেখে অবাক হয়েছিল। তাই ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছিল।
—বুরাখের পায়ে কি ঘুঙুর বেঁধে রেখেছ?
—সে আবার কী জিনিস? ওটা যন্ত্রের শব্দ। আমার স্পেসশিপের মতো বুরাখও ম্যাগ্নেটিক এলিমেন্টে তৈরি।
–আমাকে উদ্ধার করল কে?
—বুরাখ। আমার হুকুমে।
—আমি পুড়ে ছাই হইনি যে?
—আমি ওর ধ্বংস-ক্ষমতা নিউট্রাল করে দিয়েছিলুম।
—আমাকে কী বন্দি করে রাখবে, বন্ধু?
—না। তোমার বস্তু-প্রতিবিম্ব সৃষ্টি করে নিয়ে তারপর তোমাকে রেখে আসব।
বলে ওজরাক পিছনের আলোর দেয়ালের সঙ্গে মিশে গেল। এতক্ষণে আমার মাথাটা ঝিমঝিম করতে থাকল। আবার চোখ বুজে এল। চেষ্টা করেও চোখ খুলতে পারলুম না। শূন্যে ভাসার আরামদায়ক অনুভূতি আমাকে ঘুমের দিকে টানছিল।…
বিদায় বন্ধু ওজরাক!
কেউ যেন দূর থেকে ডাকছিল। চোখ খুলে দেখি, ওজরাক দাঁড়িয়ে আছে। আমার মস্তিষ্কের স্নায়ুতে তার স্নায়ুতরঙ্গের প্রতীকী ভাষা প্রতিধ্বনিত হল : বন্ধু! বন্ধু! তোমার বস্তু-প্রতিবিম্ব দেখো। কেমন হয়েছে বল?
ভরহীন অবস্থায় ভেসে থেকে দেখলুম, অবিকল আরেক আমি দাঁড়িয়ে আছে ওজরাকের পাশে। মুখ দিয়ে মানুষের ভাষায় বলার চেষ্টা করলুম, হাই জয়ন্ত চৌধুরি! কোনও শব্দই বেরুল না। তখন হাত নাড়লুম। আমার প্রতিবিম্ব বাঁ হাত নেড়ে একটু হাসল।
ওজরাক জানিয়ে দিল, বাতাস না থাকায় শব্দ হবে না। বাতাসের বদলে আমরা আলোকতরঙ্গ থেকে শ্বাসপ্রশ্বাস নিই। আমরা কথা বলি স্নায়ুতরঙ্গের মাধ্যমে।
–বন্ধু ওজরাক! আমার প্রতিবিম্ব তো অ্যান্টিম্যাটার। তবু বিস্ফোরণ ঘটছে না কেন?
—শক্তিশালী কণিকা ট্যাকিওনের ফ্রেমে ঘিরে রেখেছি।
—ওই স্কেলের মতো জিনিসটা কী?
—ড়ুপ্লিকেটিং মেশিন। ওটা বস্তু-প্রতিবিম্ব তৈরি করে।
—রিয়ার, আমার বা কর্নেলের প্রতিবিম্ব তৈরি করেছিলে ওতে?
-হ্যাঁ। তবে ওটার সঙ্গে আই আর প্রোজেক্টর জুড়ে তবেই তোমাদের প্রতিবিম্ব পাঠাতে পেরেছিলুম।
–ইমেজ রিফ্লেকশন প্রোজেক্টর! আমার বৃদ্ধ বন্ধু কর্নেল নীলাদ্রি সরকার এই যন্ত্রটার কথা বলছিলেন বটে!
–বুড়ো লোকটিকে আমার খুব পছন্দ।
—ওঁকে ধরে আনতে বুরাখকে পাঠিয়ে দাও না কেন?
—হাতে সময় নেই। ডাক এসে গেছে। আমাকে রওনা দিতে হবে।
ওজরাকের চাঞ্চল্য অনুভব করছিলুম। আমার স্নায়ুতে প্রচণ্ড চাপ লাগছিল। সে একটা হাত বাড়িয়ে দিল আমার দিকে। এবার দেখতে পেলুম ওর হাতের তালু থেকে আঙুল পর্যন্ত আঁকাবাঁকা পাঁচটা সাদা রেখা ঝিকমিক করছে। বজ্রের প্রতীক। ভয়ে ভয়ে হাত বাড়িয়ে দিলুম। কোনও অনুভূতি জাগল না। মনে হল না কিছু আঁকড়ে ধরেছি বা স্পর্শ করেছি। যেন শূন্যে করমর্দন করছি। কিন্তু চোখে দেখতে পাচ্ছি। তার হাতে আমার হাত। দুটে হাতই পরস্পর ঝাঁকুনি দিচ্ছি। স্নায়ুতরঙ্গের প্রতীকী ভাষায় বিদায় জানাচ্ছি পরস্পরকে।
তারপর ওজরাক আলোর দেয়ালের দিকে ঘুরল। অমনি একটা বেঁটে মূর্তি বেরিয়ে এল। সঠিক বর্ণনা অসম্ভব। বড় জোর বলা যায়, জল দিয়ে একটা বেঁটে ও চ্যাপ্টা পুতুল বানানো সম্ভব যদি হত, এইরকমই দেখাত। ওজরাক চিন্তার ভাষায় আদেশ দিল, বুরাখ! আমার পৃথিবীর বন্ধুকে রেখে এস।
