তারপরই আমার হাসি পেল। স্বপ্নের ওজরাক আমার প্রতিবিম্ব নিয়ে চলে গেছে ৪.৩ আলোকবর্ষ দূরের আলফা সেন্টোরি নক্ষত্রলোকে। এতক্ষণ কি সেখানে ওজরাকের ডাইনিংরুমে বসে দ্বিতীয় জয়ন্ত চৌধুরি খিদের চোটে গপগপ করে এনার্জি খাচ্ছে? সে কি বুঝতে পারছে, সে বাঁহাতে খাচ্ছে এবং তার পিলে পেটের ডানদিকে, যকৃৎ বাঁদিকে, হার্ট ডানদিকে—সে এক উল্টো-মানুষ?
তা না বুঝলে সে বড্ড বোকা। স্নায়ুতরঙ্গের ভাষায় ওজরাকের উদ্দেশে বললুম, বন্ধু! জয়ন্তের ঘিলুতে অন্তত এক চামচ কসমিক ইনটেলিজেন্স মিশিয়ে দিও। সে বরাবর বড্ড বোকা।…
২.০১ কঙ্কগড়ের কঙ্কাল
০১.
কর্নেল নীলাদ্রি সরকার খুব মন দিয়ে কী একটা বই পড়ছিলেন। ছেঁড়াখোঁড়া মলাট। পোকায় কাটা হলদে পাতা। নিশ্চয় কোনও পুরোনো দুষ্প্রাপ্য বই। কিন্তু শেষ মার্চের এই সুন্দর সকালবেলাটা গম্ভীর মুখে বই পড়ে নষ্ট করার মানে হয়? দাঁতে কামড়ানো চুরুট কখন নিভে গেছে এবং সাদা দাড়িতে ছাইয়ের টুকরো আটকে আছে। একটু কেশে ওঁর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলাম। ধ্যান ভাঙল না। আমার উলটো দিকে সোফায় বসে প্রাইভেট ডিটেকটিভ হালদারমশাই উশখুশ করছিলেন। একটিপ নস্যি নাকে গুঁজে আনমনে বললেন, যাই গিয়া!
এতক্ষণে কর্নেল বই বন্ধ করে বলে উঠলেন, হালদারমশাই কি প্রেতাত্মায় বিশ্বাস করেন?
হালদারমশাইয়ের দুই চোখ গুলি-গুলি হয়ে উঠল। জোরে মাথা নেড়ে বললেন, নাহ। ক্যান?
কর্নেল আমার দিকে তাকালেন। জয়ন্ত তুমি?
নাহ।
কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুটটি একবার জ্বেলে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, সমস্যা হল, আমাকেও কেউ এই প্রশ্ন করলে আমিও সোজা নাহ বলে দিতাম। কিন্তু অসংখ্য মানুষ প্রেতাত্মায় বিশ্বাস করে। তাদের সংখ্যাই পৃথিবীতে বেশি। কাজেই তারা এই বিশ্বাসের বশে এমন সাংঘাতিক-সাংঘাতিক সব কাণ্ড করে বসে কহতব্য নয়।
হালদারমশাই উত্তেজিত ভাবে বললেন, কেডা কী করল?
কর্নেল হাসলেন। করল নয়, করেছিল। ভেবে দেখুন হালদারমশাই। ১০৮টা নরবলি।
কন কী। পুলিশ তারে ধরে নাই?
পুলিশ এ-রহস্য ভেদ করতে পারেনি। যিনি পেরেছিলেন, তিনিই এই বইটা লিখে গেছেন। কর্নেল বইটার পাতা খুলে দেখালেন। তান্ত্রিক আদিনাথের জীবন এবং সাধনা। নামটা আমার পছন্দ। লেখকের নাম হরনাথ শাস্ত্রী। প্রায় নব্বই বছর আগে লেখা এবং ছাপা বই। আদিনাথ ছিলেন হরনাথের জ্যাঠামশাই।
বললাম, ওই তান্ত্রিক ভদ্রলোক ১০৮টা নরবলি দিয়েছিলেন?
তা-ই তো লিখেছেন হরনাথ। তান্ত্রিক ভদ্রলোকের বিশ্বাস ছিল, ওই ১০৮টা প্রেতাত্মা তাঁর চ্যালা হবে। তবে শেষরক্ষা হয়নি। একদিন ভোরবেলা স্বয়ং তান্ত্রিককেই মন্দিরের হাড়িকাঠের কাছে পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল। মুণ্ডহীন ধড়। রক্তে-রক্তে ছয়লাপ! নিজেই বলি হয়ে গেলেন।
হালদারমশাইয়ের গোঁফের ডগা তিরতির করে কাঁপছিল। বললেন, মুণ্ড গেল কই?
কর্নেল হেলান দিয়ে চোখ বুজে বললেন, মুন্ডু পাওয়া যায়নি। অগত্যা ধড়টা শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। হরনাথ লিখেছেন, দেড় মণ ঘি আর আট মণ কাঠের আগুনেও তান্ত্রিকের ধড় একটুও পোড়েনি। শেষে লোক জানাজানি এবং পুলিশের ভয়ে মুণ্ডকাটা ধড়ে পাথর বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। অদ্ভুত ব্যাপার, পরদিন ধড়টা জলে ভেসে ওঠে। নদীতে স্রোত ছিল অথচ ধড়টা দিব্যি স্থির ভাসছে।
বললাম, হরনাথবাবু দেখেছিলেন এসব ঘটনা?
তখন ওঁর বয়স মাত্র পনেরো বছর। কাজেই স্মৃতি থেকে লেখা। কিন্তু তারপর উনি যা লিখেছেন, তা আরও অদ্ভুত। বছর কুড়ি পরে হরনাথবাবু নাকি স্বপ্নে তান্ত্রিক জ্যাঠামশাইকে দেখতে পান। তান্ত্রিক ভদ্রলোক ভাইপোকে বলেন, কেউ যদি আমার মুণ্ডুটা ধড়ের সঙ্গে জোড়া দেয়, আমি আবার সশরীরে ফিরে আসব।
ততদিনে দুটোই তো কঙ্কাল। নিছক হাড় আর খুলি।
হালদারমশাই সায় দিয়ে বলেন, হঃ! স্কেলিটন অ্যান্ড স্কাল!
কর্নেল চোখ খুলে সোজা হয়ে বসলেন। কিন্তু খুলি কোথায় পোঁতা আছে হরনাথ জানতেন না। কেউই জানত না। উনি কবন্ধ মড়াটা এনে সিন্দুকে রেখে দিয়েছিলেন। তারপর খুলির খোঁজে হন্যে হচ্ছিলেন। হঠাৎ আবার একদিন আদিনাথ স্বপ্নে দেখা দিয়ে একটা মজার ধাঁধা বললেন। ওতেই নাকি খুলির সূত্র লুকনো আছে।
আটঘাট বাঁধা
বার পনেরো চাঁদা
বুড়ো শিবের শূলে
আমার মাথা ছুঁলে
ও হ্রীং ক্লীং ফট
কে ছাড়াবে জট৷
অবাক হয়ে বললাম, আপনার মুখস্থ হয়ে গেছে দেখছি!
কর্নেল হাসলেন। সহজে মুখস্থ হবে বলেই তো আগের দিনের লোকেরা ছড়া বাঁধত। মাস্টারমশাইরা অনেক ফরমুলা ছড়ার আকারে ছাত্রদের শেখাতেন।
হালদারমশাই উৎসাহে মাথা নেড়ে বললেন, হঃ। একখান শিখছিলাম :
ইফ যদি ইজ হয়
বাট কিন্তু নট নয়…
গোয়েন্দা ভদ্রলোক আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ওঁকে ইশারায় থামিয়ে দিয়ে বললাম, তা এই উদ্ভট বই নিয়ে মাথা ঘামানোর কারণ কী কর্নেল?
কর্নেল গম্ভীর হয়ে দাড়ির ছাই ঝাড়লেন। তারপর অভ্যাসমতো চওড়া টাকে হাত বুলিয়ে বললেন, হরনাথ এই ধাঁধার জট ছাড়াতে পারেননি। ওঁর বংশধররাও পারেননি। কিন্তু সম্প্রতি যা সব ঘটছে বা ঘটেছে, তা থেকে এলাকার লোকদের বিশ্বাস জন্মেছে, তান্ত্রিক আদিনাথের সশরীরে পুনরাবির্ভাব ঘটেছে। প্রথমত, সিন্দুকের কঙ্কালটা কে বা কারা চুরি করেছে। দ্বিতীয়ত, দেবী চণ্ডিকার পোড়ো মন্দিরের সামনে পর-পর দুটো নরবলি দেওয়া হয়েছে। তৃতীয়ত, রামু ধোপা সন্ধ্যার মুখে ঝিল থেকে কাপড়ের বোঁচকা গাধার পিঠে চাপিয়ে বাড়ি ফিরছিল। সবে চাঁদের আলো ফুটেছে, একটা কঙ্কাল ওর সামনে দাঁড়িয়ে হুংকার দিয়ে বলেন, আমি সেই আদিনাথ। রামু গোঁ গোঁ করতে করতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে।
