বললাম, হ্যাঁ। তোমরা আমাকে ধরে এনেছ কেন?
—তোকে আমাদের লড়াইয়ের কথা লিখে তোর কলকাতার কাগজে পাঠাতে হবে।
-কী লড়াই তোমাদের?
-কাশ্মীরের লোক চাই স্বাধীন কাশ্মীর। তাই তারা লড়াই করছে।
হাসবার চেষ্টা করে বললুম, কাশ্মীরের লোক ভারতে থাকতেই চায়। কাশ্মীর ভারতেরই অংশ। তাই স্বাধীনতার পর এতকাল ধরে তারা ভোট দিয়ে ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতো সরকার গড়ছে। স্বাধীন কাশ্মীর চাইলে তারা কেউ ভোট দিত না। ভোট বয়কট করত।
দ্বিতীয় লোকটি দাঁত খিচিয়ে বলল, ভোট দিচ্ছে তারা বাধ্য হয়ে।
—তোমাদের সঙ্গে তর্ক কথার ইচ্ছে নেই। কারণ তোমরা মিথ্যাবাদী।
দ্বিতীয় লোকটি আমার চোয়ালে ঘুষি মারল। প্রথম লোকটি তাকে বাধা দিয়ে বলল, মেজাজ ঠিক রাখো দোস্ত। এই বুড়বাক! শোন। কাশ্মীরি বুড়বাকরাই ভোট দিচ্ছে। তুই আমাদের নায্য লড়াইয়ের কথা লিখে দস্তখস্ত করে দিবি। আমাদের লোক কলকাতায় তোর কাগজের ঠিকানায় পাঠিয়ে দেবে।
—আমি লিখলেও তা ছাপা হবে না।
দুজনেই একটু অবাক হল। প্রথমজন বলল, কেন ছাপা হবে না? তুই তো তোর কাগজের রিপোর্টার! যা পাঠাবি, তাই ছাপা হবে।
—না হবে না। খবরের কাগজ যা খুশি ছাপতে পারে না।
দ্বিতীয় লোকটি খাপ্পা হয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, বলেছিলুম দোস্ত, এভাবে কাজ হবে না! ওকে পাহাড় থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিই, চল। ওকে ছেড়ে দিলে উল্টে আমাদের বিরুদ্ধে লিখে সরকারকে খেপিয়ে দেবে।
প্রথম লোকটি কাঁধের ব্যাগ থেকে একটা কাগজ বের করে আমাকে দিল। ইংরেজিতে টাইপ করা কাগজ। পড়ে আমার চক্ষুস্থির। আমি দৈনিক সত্যসেবকে খবর পাঠাচ্ছি : কাশ্মীরের জনগণের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পেরেছি, তারা স্বাধীন কাশ্মীর চায় ইত্যাদি, ইত্যাদি।
বুঝলুম, লাল আপেলের উগ্রপন্থীরা রীতিমতো শিক্ষিত এবং চতুর লোক। সব খবর ওদের নখদর্পণে। প্রথম লোকটি বলল, দস্তখত করে দে!
কাগজটা ছিঁড়ে ওর মুখে ছুড়ে মারলুম। সঙ্গে সঙ্গে সেও উঠে দাঁড়াল। সঙ্গীকে কিছু বলল। তারপর দুজনে আমাকে হ্যাচকা টানে ওঠাল। ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে চলল।
দরজার সামনে একটা চাতাল মতো। সেখানে গিয়েই আমার বুক কেঁপে উঠল। মাথা ঘুরতে থাকল। চারদিকে খাড়া সব পাহাড় এবং সামনে অতল খাদ। সেই খাদের নিচে অন্ধকার থমথম করছে।
তাহলে এবার নরকে গিয়ে রিপোর্টারি কর!—বলে দুজনেই আমাকে প্রচণ্ড ধাক্কা মারল। গড়িয়ে পড়লুম শূন্যে। আর্তনাদ করলুম কি? জানি না। শুধু টের পাচ্ছিলুম অনন্তকাল ধরে শূন্য তলিয়ে যাচ্ছি এবং নিচে থমথমে অন্ধকার হাঁ করে আছে।…
স্বপ্ন কিংবা স্বপ্ন নয়। হঠাৎ কিসের ছোঁয়া লাগল। খুব আরামদায়ক নরম জিনিসে আটকে গেলুম, অথবা কোনও অলৌকিক বিশাল করতল আমাকে লুফে নিল। কোনও ঝাকুনি পর্যন্ত লাগল না।
আস্তে আস্তে চোখ খুলে তাকালুম। একটা বিস্ময়কর পরিবেশ! এটা একটা ঘরই বটে। কিন্তু চারপাশের দেয়াল ও ছাদ অনুজ্জ্বল নানা রঙের আলো দিয়ে যেন তৈরি। এত রং, অথচ চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে না। কিন্তু তার চেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, আমি শূন্যে চিত হয়ে ভাসছি। পিঠের নিচে কিছু নেই।
আমার সামনে একটু তফাতে দাঁড়িয়ে আছে একটা মানুষের গড়নের পুতুল। হ্যাঁ, পুতুলই বটে। সাদা কাচের পুতুল। তার সারা দেহে নানা রঙের আলোর স্রোত বইছে। তার পরনে কোনও পোশাক নেই, অথবা ওই হরেক-রঙা চঞ্চল আলোই তার পোশাক।
বর্ণনা দেওয়া অসম্ভব। তার মুখটা পুতুলের মুখের মতো আঁকানো। চুলগুলো লাল। চোখ দুটো নীল। ঠোঁট দুটোও লাল। তার চোখের উপর ভুরু বলতে কিছু নেই। অথচ কী সুন্দর তার চেহারা! পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিল্পীর তুলিতে আঁকা একটি ছবি।
সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলুম। পারলুম না। যতবার পা দুটো নিচের মেঝের দিকে নিয়ে যাচ্ছি, আবার ভেসে উঠছি। এবার মনে হল, আমি ভরশূন্য অবস্থায় আছি সম্ভবত। মহাকাশযানের ভিতর মহাকাশচারীদের এমনি অবস্থা টিভিতে কতবার দেখেছি।
তারপর টের পেলুম, ওই রঙিন পুতুলের মতো প্রাণীটা আমাকে কিছু বলছে। তার ঠোঁট দুটো কিন্তু নড়ছে না। অথচ আমার মাথার ভিতর তার কথা ভেসে উঠছে অনুভূতিমালার মধ্যে দিয়ে। সে বলছে, তোমার কোনও ক্ষতি করব না। ভয় পেও না। আর দেখো, আমি তোমার সঙ্গে স্নায়বিক তরঙ্গের ভাষায় কথা বলছি। তুমিও বলার চেষ্টা করো। আমি বুঝতে পারব। নাও, চেষ্টা করো। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম। স্নায়বিক তরঙ্গের ভাষাটা আবার কেমন?
-বন্ধু! ব্রেনওয়েভের কথাই আমি বলছি। মনকে তোমার বক্তব্যের দিকে একাগ্র করতে হবে। তুমি যা বলতে চাইবে, তার সঙ্গে অন্য চিন্তাকে এনে ফেলো না। চেষ্টা করে দেখো, পারবে।
মনকে একাগ্র করে চিন্তার মধ্যে বললুম, তুমি কে, বন্ধু?
—ওজরাক।
চমকে উঠলুম।–তুমিই তাহলে ওজরাক!
আমার স্নায়ুতরঙ্গে ওজরাকের হাসি প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। চিন্তা দিয়ে বললুম, আমাকে কোথায় এনেছ?
—আমার পৃথিবীর ঘাঁটিতে। কান্দ্রার পশ্চিম পাহাড়ে।
—আর কোথায় আছে তোমার ঘাঁটি?
—তোমাদের জানা গ্রহ বৃহস্পতিতে।
–তোমার দেশ কোথায়?
—আলফা সেন্টোরির একটি গ্রহে। এখানে থেকে ৪.৩ আলোকবর্ষ দূরে। এ অবশ্য তোমাদের হিসাব। তোমাদের সময়ের মাপের সঙ্গে আমাদের সময়ের মাপের কোনও মিল নেই।
-তুমিই কি পাঞ্জা ফেলে রাখো যেখানে সেখানে?
-হ্যাঁ। তোমাদের মনে কৌতূহল সৃষ্টির জন্য। যদি কেউ যোগাযোগ করে, সেই ভেবে।
