কাশিম খাঁর রিভলভারের গুলি খেয়ে আমাকেও চিত হয়ে পড়ে থাকতে হত। ভাগ্যিস কর্নেল তাকে বাধা দিয়েছিলেন।…
গুজরদের তাঁবুতে ফিরে আসার পথে কর্নেল এই কাহিনি আমাকে শুনিয়ে বললেন, জয়ন্ত! ওজরাক যেই হোক, মারাত্মক লেসার রশ্মিকে অস্ত্র হিসাবে সে ব্যবহার করছে। তবে আমরা লেসার অস্ত্র বলতে যা বুঝি, তার চেয়ে উন্নতমানের এবং সাংঘাতিক তার অস্ত্র।
—কিন্তু বশিরের উপর তার রাগের কারণ কী? কাশিম খাঁ হাসতে হাসতে বললেন, বশির কোনও বেয়াদপি করে থাকবে তার সঙ্গে।
কর্নেল বললেন, আপনার জিপ তো লেকের কাছে। তাহলে কিছুক্ষণ আমাদের তাঁবুতে কাটিয়ে যান!
কাশিম খাঁ বললেন, আজ থাক, কর্নেল! দেরি হয়ে যাবে। এখনই ফিরে গিয়ে আমাকে এই ঘটনার রিপোর্ট দিতে হবে। তাছাড়া গুজরদের তাঁবুতে আমার যাওয়া ঠিক নয়। ওদের মধ্যেও লাল আপেলের চর আছে।
-বলেন কী!
—সেইরকমই খবর আছে আমাদের হাতে। আপনারা একটু সাবধানে থাকবেন।
একটু দূরে গুজরদের তাঁবুতে আলো দেখা যাচ্ছিল। কাশিম খাঁ বিদায় নিয়ে অন্ধকারে উধাও হয়ে গেলেন। ভদ্রলোকের সাহসের প্রশংসা করতে হয়। এমন কাণ্ডের পর নার্ভ ঠিক রেখেছেন এবং অন্ধকারে ঘাসের জঙ্গল আর পাথরের দুর্গমতা পেরিয়ে অকুতোভয়ে কেমন হেঁটে গেলেন।
ওকগাছটা ফাঁকা জায়গায় কালো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তলায় একটা কাঠ পুঁতে মশাল জ্বেলে বেঁধে রেখেছে হালাকু। পাথরটাতে বসে বোধ হয় আমাদের তাঁবু পাহারা দিচ্ছে সে। হাতে বল্লম।
আমাদের দেখে সেলাম দিয়ে বলল, খুব ভাবনায় ছিলুম হুজুর। যাকগে, দেওতাজির কৃপায় ভালয় ভালয় ফিরতে পেরেছেন।…
রাত এগারোটা অব্দি ওদের তাঁবুর ওদিকে নাচগান চলল। শুকনো ঘাসের উপর চামড়ার বিছানা আর বালিশে শুয়ে অনভ্যাসের দরুন ঘুম অসম্ভব ব্যাপার। কর্নেলের রীতিনীতি আলাদা। উনি গাছের ডালে শুয়েও নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে পারেন দেখেছি।
শুয়ে ঘুমজড়ানো গলায় বললেন, খামোকা মির্জাসায়েবকে কাগজে বিজ্ঞাপন দিতে পাঠালুম। একগাদা টাকা গচ্চা যাবে। নিশুতি রাতে নবাবী রত্নালঙ্কারের লোভে কোনও চোর আসবে না। আসলে আমি ওজরাককে ভুল বুঝেছিলুম।—ল অফ প্যারিটি….নেচারস লেফট হ্যান্ড টুইস্টের পদ্ধতি…
নাক ডাকার মধ্যে কর্নেল যেন ঘুমের দেশে যেতে যেতে প্রলাপ বকছেন। বিরক্ত হয়ে ডাকলুম, কর্নেল! কর্নেল!
নাক ডাকা থামাল। বললেন, বলো ডার্লিং!
-কী শুধু ল অফ প্যারিটি-প্যারিটি করছেন! আসল ব্যাপারটা কী?
—মিরর-ইমেজ তৈরির কৌশল ওজরাক জানে।
—তা তো জানেই। সেটা আমি আর আপনি স্বচক্ষে দেখেছি দুজনে। রিয়াও দেখেছিল।
আবার নাক ডাকতে থাকল কর্নেলের। আমার খোঁচা খেয়ে জড়ানো গলায় শুধু বললেন, জেরক্স মেশিনের মতো একটা ড়ুপ্লিকেটিং মেশিনই যথেষ্ট। তার সঙ্গে আই আর প্রোজেক্টর।
–কী বলছেন?
–ইমেজ রিফ্লেকশন প্রোজেক্টর।
–কর্নেল! প্লিজ! খুলে বলুন। তালে তালে নাক ডাকতে থাকল। আর হাত বাড়িয়ে খোঁচাখুঁচি করেও জাগাতে পারলুন না। শরীর তো নয়, পাথর।
তাঁবুর সামনে হালাকু আগুনের কুণ্ড জ্বেলে দিয়েছিল। এখনও আগুন জুগজুগ করছে। ওদের নাচগান থেমে গেছে। নিঃসাড় স্তব্ধ তৃণভূমিতে মাঝে মাঝে রাতপাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। কখনও ঘুম জড়ানো গলায় কুকুরগুলো ডেকেই চুপ করে যাচ্ছে। হালাকু যে কম্বল দিয়েছে, সেটা খুবই কর্কশ। ভেড়ার লোম দড়ির মতো পাকিয়ে তৈরি। তার উপর আঠা দিয়ে একরাশ পশম এঁটেছে। কিন্তু যত নরম হোক কিংবা গরম হোক, অস্বস্তিকর।
রাত বারোটার পর সেই পাহাড়ি ঝোড়ো হাওয়াটা শনশনিয়ে এসে গেল। ঘাসের জঙ্গলে ভূতুড়ে শব্দ হতে থাকল। আমাদের তাঁবুর মুখ পুর্বদিকে। ঝড়টা বইছে পশ্চিম থেকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁবুর তলা দিয়ে কনকনে বিচ্ছিরি হাওয়া ঢুকে তোলপাড় জুড়ে দিল। তাঁবুটাই মাঝে মাঝে উড়ে যাওার ভঙ্গি করছে। চুপচাপ কম্বলের ভিতর সেঁটে থাকলুম।
হঠাৎ খেয়াল হল, হালাকু বলে গেছে, কুণ্ডের আগুনটা যেন শোওয়ার আগে নিভিয়ে ফেলি। কারণ, রাতের ঝড়টা এলে অঙ্গার উড়ে ঘাসের জঙ্গলে পড়বে এবং আগুন ধরে যাবে।
পর্দার ফাঁকে উঁকি মেরে দেখি, ঝড়ের ধাক্কায় প্রায় নিভে যাওয়া আগুন চাঙ্গা হয়ে উঠেছে এবং ফুলকি ছড়াচ্ছে চিড়বিড়িয়ে।
দেখামাত্র বেরিয়ে গেলুম। পাশেই জলভরা মাটির পাত্র আছে। পাত্র থেকে জল ঢেলে আগুনের কুণ্ডটা নিভিয়ে দিলুম। তারপর হেঁট হয়ে তাঁবুতে ঢুকতে যাচ্ছি, মাথার পিছনে খটাস করে আঘাত লাগল। প্রচণ্ড আঘাত। মাথা ঘুরে গেল। এক সেকেন্ডের জন্য মনে হল, তাঁবুর কাঠেই হয়তো ধাক্কা লেগেছে।
তারপর কী হয়েছে, জানি না।….
চোখ খুলে কিছু বুঝতে পারছিলুম না। একটা বদ্ধ পাথরের ঘর, ঢালুমতো এবড়ো-খেবড়ো তার ছাদ এবং একটা গোল ঘুলঘুলি দিয়ে দিনের আলো এসে পড়েছে। দুজন লোক একপাশে বসে ফ্লাক্স থেকে চা বা কফি ঢেলে খাচ্ছে। তাদের মাথায় লাল রুমাল বাঁধা। পাশে দুটো স্টেনগান পড়ে আছে।
অমনি মনে পড়ে গেল লাল আপেল-এর কথা। উঠে বসার চেষ্টা করলুম। কিন্তু মাথায় যন্ত্রণা। অনেক কষ্টে অবশ্য উঠতে পারলুম। লোক দুটো কুতকুতে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে পাত্রে চুমুক দিচ্ছিল। একজন দুর্বোধ্য ভাষায় অপরজনকে কিছু বলল। অপরজন মাথা নাড়ল। তখন প্রথমজন ভাঙা-ভাঙা হিন্দিতে আমাকে বলল, এই বাঙালি বুড়বাক! তুই কি খবরের কাগজের লোক?
