কর্নেল গুড়ি মেরে এগিয়ে পাথর ও ঝোপের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমি ওঁর কথামতো একটা পাথরের আড়ালে বসে বাঁদিকে লক্ষ রাখলুম।
বসে আছি তো আছি। তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ জ্বালা করছে। দিন শেষের আবছায়া ক্রমে ঘন হয়ে যাচ্ছে। কনকনে ঠাণ্ডা বইতে শুরু করেছে। কিন্তু কর্নেলের যেমন ফেরার নাম নেই, তেমনি বাঁদিকে তাকিয়ে এতক্ষণ কারুর টিকিটি পর্যন্ত চোখে পড়েনি। আঁধার জমে এলে অসহ্য লাগল। অস্বস্তিটাও বেড়ে গেল। এখন কর্নেল ফিরে এলে তিনি সিধে না উল্টো কর্নেল তাও বোঝা কঠিন হবে যে।
তাছাড়া একেবারে ওজরাকের এলাকায় এসে পড়েছি। খপ করে ধরে মহাকাশে কোনও অজানা গ্রহে নিয়ে গিয়ে ফেললে আর এর চিরচেনা পৃথিবীতে ফেরার চান্স নেই।
মরিয়া হয়ে উঠে দাঁড়ালুম। টর্চ জ্বেলে নাড়তে নাড়তে গলা ফাটিয়ে ডাকাতে লাগলুম, কর্নেল। কর্নেল।—সত্যি বলতে কী, এ ডাকাডাকি নেহাত আতঙ্কের চোটেই।
কোনও সাড়া এল না। আরও বারকতক ডেকে হঠাৎ মাথায় এল, কর্নেলের নিশ্চয় কোনও বিপদ ঘটেছে। এতকাল কত সাংঘাতিক বিপদ থেকে, এমনকী মৃত্যুর মুখ থেকে ওই বৃদ্ধ আমাকে
উদ্ধার করে এনেছেন! আর আমি ওঁর বিপদের সময় আতঙ্কে পাগলের মতো কাণ্ড করছি।
পকেট থেকে গুলিভরা রিভলভার বের করে উনি যেদিকে গেছেন, সেদিকে এগিয়ে চললুম। এবার আমার মনে সাহস আর জেদ ফিরে এসেছে। ওজরাক হোক আর যেই হোক, একটা হেস্তনেস্ত না করে ছাড়ব না।
কিছুদূর এগিয়ে পাহাড়ের দেয়ালের ঠিক নিচে একখানে টর্চের আলো ফেলে চমকে উঠলুম। কেউ চিত হয়ে পড়ে আছে পাথরের উপর। বুকের ভিতরটা ধড়াস করে উঠল। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখি কর্নেল নন। অচেনা একজন লোক! চোখ বুজে নিস্পন্দ পড়ে আছে। পরনে সাধারণ প্যান্ট-শার্ট আর চামড়ার জ্যাকেট। মুখের গড়নে কাশ্মীরি বলেই মনে হচ্ছিল।
বেঁচে আছে কি না হাতের নাড়ি পরীক্ষা করে দেখার জন্য ওর ডান হাতটা যেই তুলতে গেছি, একমুঠো ছাই উঠে এল হাতে। ওমনি হাত ঝেড়ে পিছিয়ে এলুম। টর্চের আলো কমে এসেছে। ততক্ষণে। ব্যাটারি ফুরিয়ে গেছে তাহলে। ভীষণ অসহায় বোধ করলুম। সেই সঙ্গে আতঙ্কটা আবার টেনে ধরল আগের মতো। এই হতভাগ্য লোকটিও নির্ঘাত ওজরাকের বলি! এখানে কেন এসেছিল সে? কর্নেলও কি এমনি ছাই হয়ে পড়ে আছেন কোথাও?
টর্চের আলো নিভিয়ে দিলুম। তারপরই একটু দূরে কর্নেলের কণ্ঠস্বর শুনে চমকে উঠলুম।—জয়ন্ত নাকি?
আমার গায়ে টর্চের আলো পড়ল। বোবাধরা গলায় বললুম, আপনি কর্নেল তো?
—হ্যাঁ, ডার্লিং! তুমি যা ভাবছ, তা নই।
টর্চ নিভে গেল। তখন আমার টর্চ জ্বেলে দেখি, কর্নেল এবং একজন লোক এগিয়ে আসছে। কপালের কাটা দাগটা দেখে নিতে ভুল করলুম না। প্রকৃত কর্নেলই বটে। উত্তেজিতভাবে বললুম, এখানে একটা ডেডবডি পড়ে আছে। একেবারে ছাই হয়ে গেছে পুড়ে। অথচ চেহারা অবিকৃত, পোশাকও!
কর্নেল বললেন, দেখেছি। কিন্তু তোমার ভয় পেয়ে ছুটোছুটি চঁচামেচি করা উচিত ছিল না। জোর বেঁচে গেছ। তোমাকে ওখানে বসে থাকতে বলেছিলুম।
আঁধারে কিছু দেখা যাচ্ছিল না যে! তাছাড়া আপনার দেরি দেখে–
কর্নেল বাধা দিয়ে বললেন, ঠিক আছে। কাশিমসায়েব, আর এখানে নয়, চলুন। যেতে যেতে কথা হবে। হতভাগ্য বশির খাঁয়ের ডেডবডি ফেলে রেখে যেতে হচ্ছে, এটাই দুঃখ।
লাল আপেলের খপ্পরে
কাশিম খাঁ প্রতিরক্ষা দফতরের ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চের একজন অফিসার। আর যে লোকটা পুড়ে ছাই হয়ে পড়ে আছে, সেই বশির খাঁ তাঁরই একজন স্থানীয় এজেন্ট। বশির তাকে গোপনে খবর দিয়েছিল, পশ্চিম পাহাড়ের ওখানে কিছুদিন থেকে সন্দেহজনক লোকের গতিবিধি তার নজরে পড়েছে।
আসলে বশির ছিল ডাবল-এজেন্ট। চীন ও পাকিস্তানের সাহায্যে একটি দেশদ্রোহী গোষ্ঠী কাশ্মীরকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন রাষ্ট্র করার জন্য বহুদিন থেকে চক্রান্ত করছে। সেই গোষ্ঠীর সাংকেতিক নাম লাল আপেল। বশির এদের কাছেও টাকা খেত।
গত রাত্রে উফো নামের ফলে কান্দ্রা এলাকায় প্রতিরক্ষা দফতরের লোকেদের মধ্যে খুব উত্তেজনা ছিল। বশির এই সুযোগে কাশিম খাঁকে পশ্চিম পাহাড়তলিতে যেতে বলেছিল মিথ্যা খবর দিয়ে। সেখানে ওত পেতে বসে ছিল লাল আপেলের একজন ঘাতক।
কিন্তু তারপরই ঘটেছিল ভারি অদ্ভুত ঘটনা।
কাশিম খাঁ যখন বশিরের কথামতো নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছেছেন, দেখলেন বশির পাহাড়ের খাড়া দেয়ালের নিচে দাঁড়িয়ে তাকে ইশারায় ডাকছে। এই রকমই অবশ্য কথা ছিল। কিন্তু কাশিম খাঁ ওর কাছে যাওয়ার জন্য সবে পা বাড়িয়েছেন, হঠাৎ দেয়াল ঠুড়ে এক ঝলক বিদ্যুৎ খেলে গেল যেন এবং সঙ্গে সঙ্গে বশির পড়ে গেল নিঃশব্দে। বিদ্যুতের ঝলকটা বড়জোর এক সেকেন্ডের জন্য।
কাশিম খাঁ থমকে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তারপর দেখলেন, বশিরের বাঁদিকে একটা পাথরের আড়াল থেকে একজন লোক পড়ি-কী-মরি করে দৌড়ে পালাচ্ছে। তার মাথায় লাল রুমাল বাঁধা। সঙ্গে সঙ্গে কাশিম খাঁ বুঝতে পেরেছিলেন লোকটা লাল আপেল। তাই রিভলভার তাক করে গুলি ছুড়েছিলেন।
কাশিম খাঁর তাড়া খেয়ে সে লুকিয়ে পড়েছিল। এই সময় কাশিম খাঁ কর্নেলকে ছুটে আসতে দেখেন। দিন-শেষের আবছা আলোয় কর্নেলকে দেখে তিনি ভ্যাগিস চিনতে পেরেছিলেন। নইলে কর্নেলকে গুলি খেয়ে পড়ে থাকতে হত।
ততক্ষণে কাশিম খাঁ বশিরের মতলব বুঝতে পেরেছেন। কর্নেল এবং তিনি সেই লাল আপেলের ঘাতককে খুঁজতে থাকেন। কিন্তু লোকটাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। তার কিছুক্ষণ পরেই আমি কর্নেলের খোঁজে সেখানে গিয়ে পড়ি।
