-বাপস! মুখে পাগলাটে হাসি, চোখে পাগলাটে চাউনি!
ওজরাক যেই হোক, আমাদের নিয়ে তামাশা শুরু করেছে দেখছি। কর্নেল চুরুট বের করে অভ্যস্ত ভঙ্গিতে জ্বেলে নিলেন। ধোঁয়ার মধ্যে ফের বললেন, আমার সব থিওরি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে, জয়ন্ত! এতকাল অসংখ্য রহস্যের মোকাবিলা করেছি এবং অদ্ভুত অদ্ভুত ঘটনার চুলচেরা ব্যাখ্যা করতে পেরেছি। কিন্তু এবার যে রহস্যের সামনে এসে পড়েছি, তার সম্ভবত কোনও পার্থিব ব্যাখ্যা নেই।
অবাক হয়ে বললুম, আপনি কি তাহলে জিনের অস্তিত্বে বিশ্বাসী হলেন, কর্নেল?
—জানি না। সত্যি কিছু জানি না।
আমার প্রাজ্ঞ বন্ধুকে এমন হতাশাগ্রস্ত কখনও দেখিনি। সারা দুপুর তাঁকে ভীষণ গম্ভীর ও চিন্তাকুল দেখছিলুম। গুজরদের সামাজিক ভোজে গিয়ে উনি নামমাত্র আহার করলেন। প্রকাণ্ড চাপাটি, ভেড়ার মাংস, মধু, ছাগলের দুধ, শুকনো ফল—আয়োজনে কোনও ত্রুটি ছিল না। খাওয়ার পর উদ্দাম নাচগান শুরু করল ওরা। রিয়াও খুব নাচল। একফাকে আমরা দুজনে কেটে পড়েছিলুম। তাঁবুতে একটু বিশ্রাম নেওয়ার পর কর্নেল বললেন, ইচ্ছে ছিল রিয়াকে টোপ হিসাবে ব্যবহার করব। কিন্তু আর সাহস করে ঝুঁকি নিতে পারছি না। চলো, দুজনেই রওনা হই।
কথাটা বুঝতে পারলুম না। জিগ্যেস করেও কোনও জবাব পেলুম না কর্নেলের। শুধু মনে পড়ল, হালাকুকে কর্নেল সকালে বলছিলেন, রিয়াকে নিয়ে সেই উফো নামার জায়গায় যাবেন।
মাইলতিনেক পাথুরে মাটি আর ঘাসের জঙ্গল ভেঙে যেখানে পৌঁছলুম, সেখান থেকে পূর্বে কান্দ্রা শহর এবং এসআরএল অবজারভেটরি ইত্যাদি পরিষ্কার দেখা যায়। পশ্চিমের পাহাড়ে আজও সেই আলোর অপরূপ নানা রঙের খেলা দেখা যাচ্ছিল।
কর্নেল বললেন, কালরাত্রে মনে হচ্ছিল উফো নামার জায়গাটা এতদূরে নয়। নেহাত চোখের ভুল। দেখতে পাচ্ছ জয়ন্ত, কতখানি জায়গায় ঘাস পুড়ে ছাই হয়ে গেছে?
প্রায় তিরিশ বর্গমিটার জায়গা কালো হয়ে আছে। কর্নেল সাবধান করে না দিলেও ওই ছাইয়ের ত্রিসীমানায় ঘেঁসতুম না। কর্নেল হাঁটু মুড়ে একপ্রান্তে বসে ছাই দেখতে দেখতে বললেন, সকালে ডঃ সোম এবং আর যাঁরা এসেছিলেন, অনেক ছাই তুলে নিয়ে গেছেন দেখছি। তেজস্ক্রিয়তা থাকাও হয়তো সম্ভব ছাইয়ের মধ্যে।
—তাহলে অত কাছে বসে আছেন কেন? উঠে আসুন।
কর্নেল একটু হাসলেন। উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, থাকলেও সে তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ খুব সামান্যই হবে। ক্ষতি করার ক্ষমতা হয়তো খুবই কম।
চারদিকে চক্কর দিয়ে এলেন কর্নেল। মনে মনে হিসেব কষে বললেন, উফোটা যদি চৌম্বকশক্তিসম্পন্ন বিমানই হয়, আয়তনে খুবই ছোট। ব্যাস বড় জোর দশফুট—তার বেশি কিছুতেই নয়। তিনটে ঠ্যাং ছিল। ওই দেখ, তিনটে গর্ত। আকার কাল রাত্রে যা দেখেছি, কিছুটা কমলালেবুর মতো—ওপর ও নিচেটা চাপা।
—আমার তো মনে হচ্ছিল, ফ্যানের বডি-অংশটার মতো।
কতকটা তাই বটে। কর্নেল ঘুরে পিছনে কী দেখছিলেন। কী ওটা?—বলে এগিয়ে গেলেন। তারপর হেঁট হয়ে যে জিনিসটা কুড়িয়ে নিলেন, সেটা আমার পরিচিত। ওজরাকের পাঞ্জা!
কর্নেল পাঞ্জাটা দেখতে দেখতে বললেন, ডঃ সোমদের এটা চোখে পড়া উচিত ছিল।
পড়েনি কেন?
বললুম, ওঁরা চলে যাওয়ার পর ওজরাক হয়তো পাঞ্জাটা আপনার জন্য রেখে গেছে।
কর্নেল আমার রসিকতায় মন দিলেন না। পাঞ্জাটা পকেটস্থ করে বললেন, চলো তো, ওদিকটা দেখে আসি।
আমরা সিধে নাকবরাবর পশ্চিমদিকে হেঁটে চললুম। চূড়ায়-চূড়ায় সেই বিচিত্র বর্ণালী এখনও বিচ্ছুরিত হচ্ছে। পিচকিরির ধারার মতো নেমে আসছে সবুজ তৃণভূমিতে। চোখ-ধাঁধানো ওই অপার্থিব ইন্দ্রজাল মস্তিষ্ককে আচ্ছন্ন করে ফেলছিল। মাইলটাক এগিয়ে সেই নহর দেখতে পেলুম। একটু দ্বিধা হচ্ছিল। অস্বস্তি জাগছিল। কিন্তু কর্নেলকে অনুসরণ করতেই হল।
নহরের ওপারে কিছুদূরে গিয়ে পাহাড়ের ছায়ার মধ্যে পৌঁছেলুম আমরা। আরও কিছুটা যাওয়ার পর চূড়ার বর্ণালী আর দেখা যাচ্ছিল না। আমাদের সামনে খাড়া দাঁড়িয়ে আছে কঠিন গ্র্যানাইট শিলার আকাশভেদী দেয়াল। নিচে বিশাল বিশাল পাথরের চাই পড়ে আছে। যুগ যুগ ধরে ভেঙে পড়েছে ওই দেয়ালের চাবড়া। সেগুলোর ভিতর দিয়ে এগিয়ে কর্নেল একখানে দাঁড়ালেন। তারপর বাইনোকুলারের সাধারণ লেন্সে আরও একটা লেন্স এঁটে দিলেন।
কিছুক্ষণ চূড়াগুলো খুঁটিয়ে দেখার পর বললেন, আশ্চর্য তো! এই পাহাড়ের কোনও চূড়াতেই একচিলতে বরফ জমেনি। এ তো অসম্ভব ব্যাপার! চারদিকের সব পাহাড়ের মাথায় বরফ জমে আছে। শুধু এই অংশটায় বরফ নেই। অবাক লাগছে, ডঃ সোম এই বৈশিষ্ট্যের কথা তো বলেননি।
সূর্য কালো পাহাড়ের পিছনে নেমেছে। তাই চূড়াগুলোর শীর্ষরেখা রঙিন দেখাচ্ছে এবং আকাশেও খানিকটা জায়গা জুড়ে ছোপ পড়েছে।
সেদিকে তাকিয়েছিলুম তন্ময় হয়ে। হঠাৎ কোথাও গুলির শব্দ শোনা গেল কয়েকবার এবং কর্নেলের চাপা গলার ডাকে সম্বিৎ ফিরল। কর্নেল চাপাস্বরে বললেন, তুমি এখানে অপেক্ষা কর। আমি আসছি। তুমি বরং বাঁদিকে—
দ্রুত বললুম, কোথায় যাবেন? চলুন, আমি যাচ্ছি।
—না। তুমি এখানে পাথরের আড়ালে বসে বাঁদিকে লক্ষ রাখখা। কাউকে দেখতে পেলে কি না আমাকে বলো। ওদিকে লক্ষ রাখার জন্য তোমাকে এখানে থাকতে হবে।
মাথামুণ্ড বুঝলুম না। একা থাকতে আমার অস্বস্তিও হচ্ছিল। কিন্তু বরাবর ওঁর কথা মেনে চলেছি, এখনও মেনে নিলুম। ভেবে পেলুম না, কে এমন জায়গায় এসে গুলি ছুড়ছে? কেনই বা ছুড়ছে?
