কর্নেলের ছাইরঙা টুপি একবারের জন্য চোখে পড়ল। বুঝলুম কোনও বিরল প্রজাতির পাখির পিছনে ধেয়ে চলেছেন। তার মানে এবেলার মতো ওঁর আশা বৃথা।
সিগারেট ধরিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্যে মন দিলাম। কর্নেলের এমন বাতিকগ্রস্ত আচরণ নতুন দেখছি না। পোলারশ্রেণীর ভিতর বাতাসের অর্কেস্ট্রা বেড়ে গেছে ততক্ষণে। রঙিন ফুলগাছগুলো তালে তালে নাচ জুড়েছে। একসময় হঠাৎ আমার মাথায় উপর উঁতগাছের ডালপালা থেকে একঝাক টিয়াপাখি বেসুরে চেঁচিয়ে উঠল এবং ঊ্যা টা করে চেঁচাতে চেঁচাতে পালিয়ে গেল।
তারপরই বাঁদিকে কয়েক হাত তফাতে কর্নেলকে দেখতে পেলুম। কিন্তু এমন কেন দেখাচ্ছে ওঁকে? মুখে কেমন পাগলাটে হাসি। চোখ দুটো রাঙা। বললুম, অমন করে তাকাচ্ছেন কেন? কী হয়েছে?
কর্নেল নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে তেমনি পাগলাটে হাসি ঠোঁটে রেখে একটু এগিয়ে এলেন। অবাক হয়ে বললুম, কথা বলবেন তো? অমন করছেন কেন?
কর্নেল প্যান্টের পকেট থেকে চুরুট বের করলেন। দৃষ্টি কিন্তু আমার দিকেই। চুরুটটা ঠোঁটে রেখে লাইটার ধরাচ্ছেন, সেই সময় লক্ষ্য করলুম, চুরুটটা বাঁহাতে বের করেছেন এবং লাইটার ধরাচ্ছে ডানহাতে।
এতকাল ওঁর অভ্যাসের সঙ্গে পরিচিত আমি। ডানহাতে চুরুট নিয়ে বাঁহাতে লাইটার জ্বালেন। দ্বিতীয়বার খটকা লাগল ওঁর কপালের দিকে তাকিয়ে। ওঁর কপালে বাঁদিকে একটু কাটা দাগ আছে। কিন্তু এখন দেখছি দাগটা ডানদিকে।
দেখামাত্র আঁতকে পিছিয়ে এসে চেঁচিয়ে উঠলুম, কর্নেল! আপনি উল্টো মানুষ!
সঙ্গে সঙ্গে কর্নেল অদৃশ্য। আমিও ঝোপজঙ্গল ভেঙে পাথরে আছাড় খেতে খেতে একেবারে তাঁবুর সামনে গিয়ে ধপাস করে বসে পড়লুম। হালাকু দৌড়ে এসে বলল, কী হয়েছে হুজুর?
বললুম। কিছু না।…
আবার এক মৃতদেহ
ধাক্কাটা সামলে নিতে সময় লাগল। বার বার মনে হচ্ছিল, ব্যাপারটা হয়তো আমি চোখ দিয়ে দেখিনি, মন দিয়ে দেখেছি। অর্থাৎ নিতান্তই দিবাস্বপ্ন! তঁতগাছের ছায়ায় স্নিগ্ধ বাতাসে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্যের মধ্যে অকারণ দিনদুপুরে ভূত দেখার মতোই উল্টো-কর্নেল দর্শনের কোনও মানে হয় না।
হালাকু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তখনও। একটু ধাতস্থ হওয়ার পর বললুম, তেমন কিছু না সর্দার! নহরের ওপারের জঙ্গলে বাঘের মতো কী যেন দেখলুম।
হালাকু হাসতে হাসতে বলল, এ মুল্লুকে শের কোথায় হুজুর? নিশ্চয় তাহলে বোজি কুহি দেখেছেন।
—বোজি কুহি? সে আবার কী জানোয়ার?
–বুনো পাহাড়ি ছাগল।
হালাকু নিশ্চয় আইবেক্সের কথা বলছে। সে কিছু ক্ষণ বোজি কুহি নিয়ে বকবক করল। তারপর চলে গেল তাদের তাঁবুর দিকে। একটা গাছের তলায় ভেড়ার মাংস কাটা হচ্ছে। আমাদের সম্মানে গুজরদের ডেরায় আজ ভোজ দেওয়া হবে। রান্নাবান্নার আয়োজন চলেছে ওখানে। একটু পরে রিয়া এল সুন্দর নকশা আঁকা চীনা মাটির পাত্রে একগাদা শুকনো ফল নিয়ে বলল, ছোটসায়েব, বাবা এই ফলগুলো দিয়ে পাঠাল। বড়সায়েব এলে দুজনে মিলে খাবেন আপনারা। রান্না হতে আজ বিকেল হয়ে যাবে কিনা!
থালাটা সে বাঁহাতে নামিয়ে রাখতেই আঁতকে উঠে বললুম, ও কী রিয়া! তুমি বাঁহাতে থালা রাখছ যে?
অপ্রস্তুত হয়ে সে ডানহাত ঠেকাল থালায়। মুখে কাঁচুমাচু হাসি।
তবু সন্দেহ গেল না। মায়াবি ওজরাক রিয়ার প্রতিবিম্বকে পাঠিয়েছে কি না বোঝা দরকার। বললুম, আচ্ছা রিয়া, তুমি কোন হাতে খাবার খাও?
রিয়া খুব অবাক হয়ে ডানহাতটা দেখাল। তখন সন্দেহটা চলে গেল। শুকনো ফলের থালাটা তাঁবুর ভিতর রেখে একটা পাথরের ওপর বসে রইলুম। দৃষ্টি পশ্চিমে নহরের ওদিকে। কিছুক্ষণ পরে দূরে ঘাসের জঙ্গলে চলমান একটা ছাইরঙা টুপি দেখতে পেলুম। অমনি সতর্ক হয়ে উঠলুম।
টুপিপরা লোকটি ঘাসের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে নহরের পাড়ে এল। হ্যাঁ, কর্নেল নীলাদ্রি সরকার তো বটেই। কিন্তু আসল, না জাল? প্রকৃত কর্নেল, না দর্পণবিম্ব কর্নেল? সিধে কর্নেল, না, উল্টো কর্নেল? ওজরাকের দেশের সীমান্তে এসে এবার থেকে পদে পদে সতর্ক থাকা দরকার।
নহর পেরিয়ে সিধে বা উল্টো কর্নেল হনহন করে এগিয়ে আসছেন। বুকে ক্যামেরা ও বাইনোকুলার তেমনি ঝুলছে। প্রজাপতি-ধরা লাঠি ও জাল অবশ্য নিয়ে বেরোননি। ওকতলায় পৌঁছে হাসিমুখে যেই সম্ভাষণ করেছেন, হ্যালো ডার্লিং, অমনি পকেট থেকে রিভলভার বের করে গর্জে উঠেছি, হ্যান্ডস আপ!
থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন দুহাত তুলে।
বললুম, একটু নড়লেই গুলি ছুড়ব। দাঁড়ান, আগে পরীক্ষা করি। তারপর
—জয়ন্ত! জয়ন্ত! কী আশ্চর্য!
সতর্কভাবে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে কপালের দাগটা দেখলুম। ঠিক বাঁদিকেই আছে। তবু নিঃসন্দেহ হওয়া দরকার। বললুম, চুরুট বের করে লাইটার জ্বেলে ধরিয়ে নিন।
কর্নেল হো হো হেসে হাত নামিয়ে বললেন, ডার্লিং, আমি উল্টো-টুল্টো নই। একেবারে সিধে। হুঁ, বুঝেছি। কিছুক্ষণ আগে ওই ঘাসের জঙ্গলে আমিও একজন উল্টো-জয়ন্তকে দেখে এলুম।
হকচকিয়ে গিয়ে বললুম, বলেন কী!
–তুমি কোথায় উল্টো-কর্নেলকে দেখলে?
–ওই তো ওখানে!
কর্নেল পাথরটাতে বসে বললেন, উল্টো-তুমি একেবারে রাশিয়ান ব্যালে নাচ দেখিয়ে আমাকে মুগ্ধ করে দিয়েছ! ওঃ! সে কী নাচ তোমার। বলশয়ের স্টেজে অমন হংসনৃত্য নাচলে রুশ-নাচিয়েদের মাথা হেঁটে হয়ে যেত।
—উল্টো-আপনি কিন্তু বদ্ধপাগল!
—তা স্বাভাবিক। সিধে-আমির মধ্যে কিছু পাগলামি থাকা যখন সম্ভব!
