—জিনিসটা কী?
—অ্যান্টিম্যাটার ডিটেকশন সিস্টেম।
কর্নেল নড়ে বসলেন। আমি হকচকিয়ে গেলুম। কর্নেল বললেন, যন্ত্রটা আয়তনে নিশ্চয় ছোট ছিল? নইলে চোরের অসুবিধে হওয়ার কথা।
—খুবই ছোট। একটা পকেট-রেডিওর মতো দেখতে। তার কম্পিউটারের আয়তন আরও ছোট। একটা মাউথ-অর্গানের সাইজ।
ডঃ সোম উঠে দাঁড়ালেন।—ডঃ হোসেনের ওখানে যেতে হচ্ছে এখনই। আপনারা ইচ্ছে করলে আসতে পারে আমার সঙ্গে।
কর্নেল বললেন, থাক্। বরং পরে একদিন গিয়ে আলাপ করব ওঁর সঙ্গে। আমার একটা জরুরি অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।…
বদর খাঁ কাল রাতের ঘটনা নিয়ে উত্তেজিতভাবে আলোচনা করতে করতে গাড়ি চালাচ্ছিল। জিনের বাদশা ওজরাকের ভয়ে সে তটস্থ। রাতে ওজরাকের উড়ন-খাটোলা নামতে দেখেছে অনেকে। তাই নিয়ে সারা এলাকা জুড়ে নাকি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ কেউ কান্দ্রা ছেড়ে চলে যাওয়ার কথাও নাকি ভাবছে।
লেকের কাছে আমাদের পৌঁছে দিয়ে বদর খাঁ বলল, আপনারা কখন ফিরবেন সায়েব?
কর্নেল বললেন, পরশু সকালে ঠিক এই সময় তুমি গাড়ি নিয়ে চলে আসবে এখানে। আমরা এই চেনার গাছের তলায় তোমার অপেক্ষা করব।
বদর খাঁ গাড়ি নিয়ে চলে গেল। আমাদের দুজনের পিঠেই ছোটখাট দুটো বোঁচকা। বিস্তর টুকিটাকি জিনিসে ভর্তি। পাইন বনটা পেরিয়ে তৃণভূমিতে পৌঁছে গুজরদের কুকুরগুলোর কথা মনে পড়ল। কিন্তু দূর থেকে নজর রেখেও তাদের লেজের ডগাটুকুও দেখতে পাচ্ছিলুম না।
ঘাসের মাঠে কয়েকটা ঘোড়া চরছে। খোঁয়াড়টা শূন্য। ভেড়া-ছাগল-দুম্বার পাল চরাতে নিয়ে গেছে গুজর রাখালেরা। তাঁবুর সামনে বুনো আখরোট গাছের তলায় কিছু মেয়ে মাখন তৈরি করছে। মাটির মাত্রে দুধ জ্বাল দিচ্ছে কেউ। বুড়োরা চামড়ায় নুন মাখিয়ে রোদে দিচ্ছে। হালাকু সর্দার আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। এগিয়ে এসে আমাদের সে অভ্যর্থনা করল।
হালাকু একটু তফাতে ওক গাছের তলায় একটা নতুন তাঁবু দেখিয়ে বলল, ওই আপনাদের ডেরা হুজুর। আশা করি, কোনও তকলিফ হবে না। যে নহরের কথা বলেছিলুম, সেটা পিছনেই। খুব পরিষ্কার জল পাবেন। আর পাখির কথা বলেছিলেন, নহরের ওখানে হরেকরকম হাড়ি পাখি দেখতে পাবেন। যত খুশি, ফোটো খিচুন—ওরা ভয় পায় না। নবাববাহাদুরও ওখানে এসে ডেরা পাতেন। গত মাসেও এসে কিছুদিন ছিলেন ওখানে।
তাঁবুটা ছাগলের চামড়া সেলাই করে তৈরি। কেমন একটা আঁশ গন্ধ। কর্নেল আমার মুখের ভাবে সেটা টের পেয়ে বললেন, ডার্লিং, ঘণ্টা কয়েকের মধ্যে সয়ে যাবে।
সন্ধ্যার মতো দু-পাত্র টাটকা ছাগলের দুধ নিয়ে এল হালাকু। সঙ্গে মেয়ে রিয়া! হালাকু বলল, সায়েবদের খাতিরযত্নের ভার রিয়ার উপর। যা দরকার, একে বলবেন।
হালাকু কাল রাতের উড়ন-খাটোলা নামার গল্প করতে লাগল। কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন, ঠিক কোন জায়গায় নেমেছিল বলতে পার সর্দার?
জবাব দিল রিয়া।—আমি জানি। আগের বারও সেখানে নেমেছিল।—বলে সে পূর্ব-দক্ষিণ দিকে আঙুল নির্দেশ করল।
হালাকু অবাক হয়ে বলল, তুই কেমন করে জানলি?
রিয়া বলল, সেদিন সকালে পাল চরাতে গিয়ে পোড়া ঘাস দেখেছিলুম। তুমি আজকাল সব কথা ভুলে যাও। তাই শুনে তুমি বকাবকি করেছিলে না?
কর্নেল পাশে পড়ে থাকা একটা পাথরের উপর উঠে চোখে বাইনোকুলার রাখলেন। দেখতে দেখতে বললেন, হু, রিয়া ঠিকই দেখিয়েছে। ওখানে মিলিটারি ভ্যান নিয়ে একদল অফিসার তদন্ত করতে এসেছে। আরে! ডঃ সোমও এসে গেছেন দেখছি। জোরালো তদন্ত হচ্ছে তাহলে।
নেমে এসে ফের বললেন, তাহলে এবেলা আর ওখানে যাওয়া হল না। সর্দার, বিকেলে তোমার মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে জায়গাটা দেখতে গেলে আপত্তি করবে না তো?
হালাকু একগাল হেসে বলল, হুজুর! মা-হারা একটি মোটে মেয়ে। তাকে আপনার জিম্মায় দিয়েছি! ইচ্ছে করলে টাউনে নিয়ে গিয়ে লেখাপড়া শেখান, মেমসাব বানিয়ে দিন।
সে খুব হাসতে লাগল।
রিয়া গাল ফুলিয়ে বলল, আমি লেখাপড়া শিখব না। মেমসায়েবও হব না।
কর্নেল বললেন, তাহলে কী হতে চাও তুমি?
–কিছু না।
–বুঝেছি, মাঠে মাঠে জানোয়ারের পাল নিয়ে ঘুরে বেড়াতেই তোমার ভাল লাগে। রিয়া আস্তে বলল, খুব ভাল লাগে।
হালাকু বলল, ওর জন্ম হয়েছিল পামির এলাকার রিয়ায়। তাই ওর নাম রেখেছিলুম রিয়া। সেখানে এমনি ঘাসের মাঠ, হুজুর। ওই মুল্লুকে রিয়া কথার মানে ঝরনা।
রিয়ার সঙ্গে কর্নেলের খুব ভাব হয়ে গেল। আমার প্রতি তার লক্ষ্য কম। বুঝতে পারছিলুম, কর্নেলের দাড়িই ওকে বশ করে নিয়েছে। কিছুক্ষণ পরে আমরা দুজনে বেরিয়ে পড়লুম।
পিছনের নালাটা প্রায় ফুট তিরিশেক চওড়া। পাথরে ভর্তি। তার ফাঁকে ঝিরঝিরে স্বচ্ছ জল বয়ে যাচ্ছে। একখানে ডোবার মতো গর্ত করে জল জমানো হয়েছে। কর্নেল কিছুক্ষণ পাখি দেখায় মন দিলেন। টেলিলেন্স লাগানো ক্যামেরায় ছবিও তুললেন প্রচুর। নালার দুধারে রংবেরঙের ফুলের ঝোপ। মনে হচ্ছিল, স্বর্গে চলে এসেছি। পাখির গান, ফুলের রং, গাছপালার সবুজ জেল্লা আর স্নিগ্ধ রোদ নিয়ে চারদিকে আশ্চর্য এক পবিত্র সরলতা। একঝাঁক পোলারের ভিতর দিয়ে বাতাস বয়ে যেতে যেতে যেন অর্কেস্ট্রার বাজনা বাজিয়ে যাচ্ছে।
তুঁতগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে ছিলুম। কর্নেলকে দেখলুম নহরের বুকে পাথরে পা রেখে রেখে ওপারে চলে গেলেন। তারপর চোখে বাইনোকুলার স্থাপন করে ঝোপের আড়ালে উধাও হলেন।
উধাও তো উধাও! ওপারে ঘাসের জঙ্গল প্রায় ফুট পাঁচেক উঁচু হয়ে দূরে পাহাড়ের গায়ে মিশে গেছে। যেন এক সবুজ সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে ধূসর-নীল কঠিন শিলার উপর। মাঝে মাঝে দ্বীপের মতো উঁচু গাছের জটলা এবং কোথাও গ্রানাইট শিলার ঢিপি।
