তারপর চমকে উঠলুম চাপা ঝমর-ঝম ঘুঙুরের শব্দে। এক লাফে কর্নেলের বিছানার কাছে গিয়ে ওঁকে ধাক্কা দিতে দিতে বললুম, ঘুঙুরের শব্দ হচ্ছে, ওই শুনুন!
এবার কর্নেল উঠে বসলেন। অন্ধকারে ওঁকে দেখতে পাচ্ছিলুম না। ব্যস্তভাবে বললেন, কী আশ্চর্য! টর্চটাও জ্বলছে না দেখি। জয়ন্ত, তোমার টর্চটা দেখো তো?
আমার বিছানা হাতড়ে টর্চ পেলুম। কিন্তু জ্বলল না। বললুম, আমার টর্চটাও যে জ্বলছে না!
কর্নেল বললেন, বেরিও না। জানালা খুলে দেখা যাক, ব্যাপারটা কী?
ঘুঙুরের শব্দটা সমানে শোনা যাচ্ছে। ঝমর ঝম ঝমর ঝম ঝমর ঝম…একজন নয়, যেন অসংখ্য নর্তক-নর্তকী স্টেজে উদ্দাম নাচ জুড়েছে। ঘুঙুরের আওয়াজ অবশ্য চাপা, যেন বহুদূর থেকে শোনা যাচ্ছে। কর্নেলকে জানালা ফাঁক করতে দেখলুম। তখন তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালুম। আকাশ পরিষ্কার। ঝকমক করছে নক্ষত্র। অথচ জোরালো একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে শোঁ শোঁ শন-শন শব্দে। ঘুঙুরের শব্দটা কিন্তু বদ্ধ-ঘরের ভিতর যেমনটি শুনছিলুম, বাইরেও তেমনটি। ফিডলার কাঁকড়ার বেহালার বাজনা যেমন মাথার ভিতর বাজছে মনে হচ্ছিল, এও কতকটা তেমনি।
হঠাৎ অনেক দূরে একটা আলোর মতো জিনিস চোখে পড়ল। বললুম, ওটা কী কর্নেল?
কর্নেল জবাব দিলেন না।
আলোটা ভারি অদ্ভুত। মাটি থেকে সামান্য উঁচুতে ভাসছে। একটু পরে বুঝতে পারলুম, ওটা নিজেই আলোকিত। কিন্তু অন্য কোনও জিনিসকে আলোকিত করছে না। তাহলে ওটা নিশ্চয় আলো নয়।
অথচ ওটা যেন ঘুরছে। দেখতে কতকটা সিলিং ফ্যানের গোলাকার অংশটার মতো। ঘুরছে বলছি, কারণ ওটার গায়ে কিছু লাল নীল সবুজ হলুদ ফুটকি দেখতে পাচ্ছি এবং ফুটকিগুলো স্থান বদল করছে।
মিনিট তিনেক পরে অদ্ভুত আলোর মতো জিনিসটা উপরের দিকে উঠতে শুরু করল। অনেক উঁচুতে পৌঁছে স্থির হয়ে রইল আধ মিনিট। তারপর হঠাৎ একটা ছুড়ে মারা ডিসকাসের মতো কাত হয়ে বিদ্যুৎবেগে দূরে চলে যেতে যেতে মিলিয়ে গেল নক্ষত্রের মধ্যে।
খেয়াল করে দেখি, ঝড়টা থেমে গেছে। ঘুঙুরের শব্দও নেই। তারপর প্লেনের শব্দ শুনতে পেলুম। কর্নেল বললেন, মনে হচ্ছে বিমানবাহিনীর বিমান এতক্ষণে ওটার খোঁজে বেরিয়ে পড়েছে। যাই হোক, জয়ন্ত! তাহলে ওজরাকের উড়ন-খাটোলা স্বচক্ষে দর্শনের সৌভাগ্য হল আমাদের। অবশ্য উফো-দর্শনও বলা যায়। তুমি কলকাতা ফিরে দৈনিক সত্যসেবকে দারুণ জাঁকালো একটি রিপোর্ট লিখবে, আশা করি।-বলে কর্নেল জানালা বন্ধ করলেন। অমনি বাইরে আলো জ্বলে উঠল।
বললুম, নিশ্চয় লিখব।তারপর টেবিল ল্যাম্পের সুইচ টিপলুম। আলো জ্বলল।
কর্নেল তাঁর বিছানায় গিয়ে চিত হলেন। বললেন, ব্যাপারটা গোলমেলে হয়ে গেল দেখছি। আমাকে আবার গোড়া থেকে সাজাতে হবে।
জিগ্যেস করলুম, কী?
—ওজরাক এবং ওইসব চুরিচামারি নিয়ে একটা থিওরি দাঁড় করিয়েছিলুম।
দরজায় টোকার শব্দ এবং মির্জাসায়েবের উত্তেজিত ডাকাডাকি শুনে দরজা খুলে দিলুম। মির্জাসায়েব হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন, কর্নেল! কর্নেল! বড় তাজ্জব ঘটনা–
কর্নেল বাধা দিয়ে বললেন, সব দেখলুম, মির্জাসায়েব! বড় রহস্যময় ব্যাপার।
—আমার বড় ভয় ভয় করছে, কর্নেল! ওজরাক আবার কেন এসেছিল?
—এ প্রশ্নের জবাবের জন্য আমাকে দুটো বা তিনটে দিন সময় দিন।
মির্জাসায়েবের মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, উনি আশ্বস্ত হতে পারছেন না।…
উল্টো-কর্নেলের পাল্লায়
সকালের ফ্লাইটে মির্জা নবাব দিল্লি গেলেন কাগজে বিজ্ঞাপন দিতে। আমরা বিমানঘাঁটিতে ওঁকে বিদায় দিয়ে ডঃ সোমের কোয়ার্টারে গেলুম। বদর খাঁ গাড়ি নিয়ে বাইরে অপেক্ষা করতে থাকল। সে আমাদের কান্দ্রা লেকে পৌঁছে দেবে।
ডঃ সোম বললেন, সাংঘাতিক ব্যাপার, কর্নেল। কাল রাতে উফো নেমেছিল। তাকে তাড়া করে যাচ্ছিল এয়ারফোর্সের একটা মিগ বিমান। সেটা পশ্চিমের পাহাড়ে নিখোঁজ হয়ে গেছে। সম্ভবত কোথাও ভেঙে পড়েছে। আজ সকালে দুটো হেলিকপ্টার গেছে খুঁজতে।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, আপনি উফো বলছেন!
ডঃ সোমও হাসলেন।—প্রতিরক্ষাবিজ্ঞানী রামস্বরূপ ব্রহ্মের মতে নাকি অত্যন্ত উন্নত ধরনের চীনা বিমান। চৌম্বকশক্তিসম্পন্ন আরোহীবিহীন বিমান। বহু দূরের ঘাঁটিতে বসে রিমোট কন্ট্রোল সিস্টেমে চালানো যায় এই ম্যাগনেটিক প্লেনকে। ডঃ ব্রহ্মের ধারণা, ভূপৃষ্ঠের চৌম্বক প্রবাহের সংস্পর্শে এলেই স্বাভাবিক নিয়মে চুম্বকে চুম্বকে বিকর্ষণ ঘটে এবং বিপজ্জনক ঝড় সৃষ্টি হয়। পাওয়ার ফেল করে। ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।
—আপনার মতামত কী?
ডঃ সোম দাঁতের ফাঁকে উচ্চারণ করলেন আন-আইডেন্টিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্ট। কারণ নিঃসংশয়ে এখনও কিছু বলা যাচ্ছে না। অবশ্য উফো বললেই সেটা অন্য গ্রহের মহাকাশযান বোঝায় না। শুধু বোঝায়, অজানা উড়ন্ত জিনিস।
কফি না খাইয়ে ছাড়বেন না ডঃ সোম। কথাবার্তার ফাঁকে কফি এল। কফি খেতে খেতে ফোন বাজল। ডঃ সোম ফোনে কিছুক্ষণ কথা বলে গম্ভীর মুখে ফিরে এলেন আমাদের কাছে। বললেন, স্পেস রিসার্চ ল্যাবরেটরির ডিরেক্টর ডঃ হোসেন ওজরাকের পাঞ্জা কুড়িয়ে পেয়েছেন।
কর্নেল ও আমি চমকে উঠলুম। কর্নেল বললেন, কোনও ডেডবডি?
—তা তো বললেন না! ছাদের সোলার প্যানেলের ভিতর পড়ে ছিল বজ্রচিহ্ন আঁকা চাকতি।
—কিছু চুরি গেছে কি?
ডঃ সোম আস্তে বললেন, এ এম ডি এস যন্ত্রটা কম্পিউটারসুদ্ধ উপড়ে নিয়ে গেছে চোর।
