কর্নেল সে কথার জবাব না দিয়ে বললেন, একটা কাজ আপনাকে করতে হবে। আপনি কালই প্লেনে দিল্লি চলে যান এবং খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিন : নুরে আলম চুরি গিয়ে আপনি আপনার পূর্বপুরুষের সংগৃহীত বিখ্যাত কয়েকটি রত্ন আর রাখতে সাহস পাচ্ছেন না। তাই নিলামে বেচে দিতে চান। নিলামে যাঁরা কিনতে চান, তারা যেন এক সপ্তাহের মধ্যে যোগাযোগ করেন।
—সে কী! আর তেমন রত্ন কীই বা আছে? আমার পরলোকগতা স্ত্রীর কিছু জড়োয়া অলঙ্কার ছাড়া আর কিছু তো নেই! বলেছিলুম না? আমি এখন নামেই নবাব!
—সত্যি কিছু বেচতে হবে না মির্জাসাহেব। শুধু বিজ্ঞাপন দিতে বলছি।
আমি মুখ খুলতে যাচ্ছিলুম, কর্নেল এমন চোখ কটমট করে তাকালেন যে ঢোক গিলে থেমে গেলুম। মির্জাসায়েব বললেন, ঠিক আছে। তাই হবে।
কর্নেল বললেন, কাল সকালে আমরা হালাকুর অতিথি হয়ে যাচ্ছি। ফিরে এসেই আপনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আমার ইচ্ছা দুটো দিন অন্তত গুজরদের সঙ্গে কাটাব।…
কিছুক্ষণ পরে অতিথিশালায় শুতে এসে কর্নেলকে বললুম, আপনি যাই বলুন, ওজরাক অন্য গ্রহের কোনও উন্নত স্তরের প্রাণী। মানুষেরই উন্নত সংস্করণ—সুপারম্যান।
কর্নেল চুরুটের ধোঁয়ার ভিতর বললেন, কেন ডার্লিং?
—রিয়ার প্রতিবিম্বের কী ব্যাখ্যা হতে পারে? আপনি আমাকে ল অফ প্যারিটি এবং মিরর-ইমেজতত্ত্ব বোঝাচ্ছিলেন সেদিন। ওজরাক মিরর-ইমেজ সৃষ্টি করতে জানে। ওই ঘটনা শোনার পর আমার অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডের গল্পটা মনে পড়ছে। অ্যালিস যেমন আয়নার ভিতরকার দেশে গিয়েছিল, রিয়াও হয়তো তেমনি–
বাধা দিয়ে কর্নেল বললেন, উল্টো মানুষদের দেশ, বলো জয়ন্ত। আয়নার ভিতরকার মানুষে একেবারে উল্টো নয় কি? তার পিলে ডাইনে, লিভার বাঁয়ে, হার্ট ডানদিকে এবং তার চোখ, নাকের ফুটো, হাত, পা সবই উল্টো। মহাকাশ বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অবিকল উল্টো বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড আছে কোথাও—হুবহু প্রতিবিম্ব যেন। সেই এলাকায় গিয়ে পড়লে মহাকাশচারী তার মহাকাশযান সমেত উল্টো হয়ে যাবে, অথচ সে তা টের পাবে না। তারপর সে যখন তার নিজের বিশ্বে ফিরে আসবে, অমনি হবে সাংঘাতিক কাণ্ড। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে সে তার যান-সমেত পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। তোমাকে দড়ি ও ছড়ির উপমা দিয়েছিলুম। আশা করি মনে আছে!
বললুম, হ্যাঁ-ম্যাটার এবং অ্যান্টিম্যাটার পরস্পরের সংস্পর্শে এলে ধ্বংস হবে। কর্নেল! রিয়া বেচারি জোর বেঁচে গেছে বলা যায়। উল্টো-রিয়ার সঙ্গে ছোঁয়াছুঁয়ি হলেই কী হত ভেবে দেখুন!
হুঁ, ঠিক তাই ঘটত। ওজরাক যেই হোক, খুব সাবধানী এবং কৌতুকপ্রিয়। কর্নেল রাতের পোশাক পরতে ব্যস্ত হলেন। ফায়ারপ্লেসে আগুনের সামনে গিয়ে বসে ডাকলেন, এখানে এস ডার্লিং!
আরাম করে বসলুম আগুনের সামনে। বললুম, আচ্ছা কর্নেল, মিরর-ইমেজ বলুন বা উল্টো বস্তুই বলুন, বুঝলুম তার আণবিক গড়ন আপনার তত্ত্ব অনুসারে অসমানুপাতিক। কিন্তু তা অ্যান্টিম্যাটার কেন?
-কোনও অসমানুপাতিক আণবিক গড়নের বস্তুর মধ্যে পজিটিভ চার্জ করা ইলেকট্রন অর্থাৎ পজিট্রনের সঙ্গে নেগেটিভ চার্জ করা প্রোটনের সন্নিবেশ ঘটলে সেটি অ্যান্টিম্যাটার হয়ে যায়।
-তাহলে তো ম্যাটারকে অ্যান্টিম্যাটারে পরিণত করা সম্ভব?
—হ্যাঁ–তত্ত্বের দিক থেকে সম্ভব।
-বাস্তবেও সম্ভব হয়েছে বৈকি। রিয়ার প্রতিবিম্বের আর কী ব্যাখ্যা হয়? প্রকৃতির ডান হাত বাঁ হাতের লেখার কথা বলছিলেন। মানুষ তো প্রকৃতির বহু নিয়ম জেনে বিস্তর খেলা খেলতে পেরেছে। প্রকৃতির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেনি কি মানুষ?
—হুঁ—তা তো হয়েইছে।
প্রকৃতির লেফট হ্যান্ড টুইস্টের নিয়ম ওজরাক জানে।
কর্নেল হাসলেন।—ওজরাকের প্রতি তোমার বিশ্বাস ও ভক্তি দেখে আশঙ্কা হচ্ছে, ডার্লিং! ওজরাক তোমাকে তুলে নিয়ে না যায়! সাবধান!
হাসতে হাসতে বললুম, নিয়ে গেলে খুশিই হব। পৃথিবীটা গলে পচে গেছে। এখানে আর থাকতেই ইচ্ছে করে না।
কর্নেল আগুনে আবার একটা কাঠ গুঁজে দিয়ে হেলান দিলেন। চোখ বুজে রইলেন। আমি হাই তুলে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লুম।
নতুন জায়গায় গিয়ে সহজে ঘুম আসে না। কাল রাতে ভাল ঘুম হয়নি। এ রাতেও তাই। চোখ বুজে ঘুমোনোর চেষ্টা করছিলুম। ঘুম আসছিল না। মাঝে মাঝে চোখ খুলে দেখছিলুম, কর্নেল তখনও ফায়ারপ্লেসের সামনে বসে আছেন হেলান দিয়ে। চোখ বন্ধ। ওখানেই ঘুমচ্ছেন নাকি? অবশ্য ওঁর ঘুমের লক্ষণ হল নাক ডাকা। নাক যখন ডাকছে না, তখন ঘুমচ্ছেন না। চিন্তাভাবনা করছেন নিশ্চয়।
তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলুম। হঠাৎ ঘুম ভেঙে সেটা টের পেলুম। বাইরে চাপা শোঁ শো শব্দ শোনা যাচ্ছিল। ঝড় হচ্ছে নাকি? কান্দ্রা উপত্যকায় মাঝরাতে ঝড় আসে শুনেছি। তাহলে সেই ঝড়! কিন্তু ঘরের ভিতর এত অন্ধকার কেন? জানালার পর্দার মাথায় কাচের খানিকটা অংশ বাইরের আলো এসে প্রতিফলিত হতে দেখেছি। তার ফলে ঘরের আলো নেভালেও ঘরের ভিতর আবছা সবকিছু দেখা যায়। কিন্তু বাইরে আলো নিভে গেছে। ঝড়ের শব্দটা বাড়ছে। ফায়ারপ্লেসের আগুনও নিভে গেছে। টেবিলল্যাম্পের সুইচ টিপলেও আলো জ্বলল না। কর্নেলের নাক ডাকছিল। ডাকলুম, কর্নেল! কর্নেল!
নাক ডাকা থেমে গেল ওঁর। জড়ানো গলায় বললেন, কিছু না। ঘুমোও!
বললুম, ঝড় বইছে। পাওয়ার ফেল! আলো জ্বলছে না।
