রিয়ার মুখে আদিম সরলতা। তবু কথাগুলো সে বানিয়ে বলছে কি না বোঝা কঠিন। কর্নেল বললেন, হুঁ—আর গাড়োলটার কী হল?
জবাব দিল হালাকু।—রিয়ার মুখে এসব শুনে আর গাড়োলটার খোঁজে যেতে আমরা সাহস পাইনি! সন্ধে হয়ে গিয়েছিল। পরদিন সকালে দলবেঁধে শিঙ্গা, ঢোল এসব নিয়ে সেখানে গেলুম। নহরের ধারে ওজরাকের পুজো দিলুম। আগুনে ঘি আর ভেড়ার রক্ত দিয়ে পুজো দেওয়ার নিয়ম। পুজো দিয়ে সাহস করে নহরের ওপারে গেলুম। বেশিদূর যেতে হয়নি। গাড়োলটা ঘাসের ভিতর মরে পড়েছিল। কিন্তু হুজুর, তাজ্জব ব্যাপার—যেই মরা জানোয়ারটাকে ওঠাতে গেছি, দেখি কী, পুরোটাই ছাই!
কর্নেল, আমি ও বদর খাঁ একসঙ্গে বলে উঠলুম, ছাই!
—হ্যাঁ—একদলা ছাই। অথচ দেখে বোঝার উপায় ছিল না। যেমনকার চেহারা, লোমের রং তেমনি ছিল। কিন্তু হাত ঠেকাতেই ছাই হয়ে গেল। আমরা ভয় পেয়ে পালিয়ে এলুম। গুজরাক বড় জাদুকর, হুজুর! সে তো মানুষ নয়, সে হল পরীদের রাজা। পশ্চিম-পাহাড়ে আছে পরীস্তান। তার বাস সেখানেই। চিরকাল তার কথা শুনে আসছি আমরা।
বদর খাঁ মন্তব্য করল, ওজরাক তাহলে একজন জিন। কেতাবে জিনের কথা আছে বটে।
ওজরাকের আবির্ভাব
নবাবপ্রাসাদের ডাইনিং হলে ডিনার খেতে খেতে কর্নেল হালাকুর মেয়ে রিয়ার ঘটনাটা মির্জাসায়েবকে শোনাচ্ছিলেন। মির্জাসায়েব বললেন, এবার মনে হচ্ছে ওজরাকের ব্যাপারটা হয়তো রূপকথা নয়। একজন মুসলিম হিসেবে অবশ্যই আমি জিন বিশ্বাস করতে বাধ্য। আমাদের শাস্ত্রে বলা হয়েছে, খোদাতালা এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মানুষের মতো জিনকেও সৃষ্টি করেছেন। অবশ্য জিনের সৃষ্টি আগুন থেকে। তারা আকাশের অন্য একটা স্তরে বাস করে। আমার ধারণা, এর মধ্যে একটা তত্ত্ব লুকিয়ে আছে। আধুনিক বিজ্ঞান অন্য গ্যালাক্সিতে পৃথিবীর মতো গ্রহ এবং প্রাণী থাকার সম্ভাবনা অস্বীকার করে না। ইসলামি শাস্ত্রে উল্লিখিত আগুনের দেহধারী জিন কি তাহলে অন্য কোনও গ্রহের উন্নত কোন জীব? মুসলিম লোকশাস্ত্রে বলা হয়েছে, জিনরা পুরুষ। পরীরা হল তাদেরই স্ত্রীজাতি। জিন-পরীর ছটা লেগে নাকি মানুষের মারাত্মক অসুখ হয়। তার মানে, বহু আলোকবর্ষ দূরের কোনও অজ্ঞাত গ্রহের ওইসব প্রাণীদের শরীর আলোর কণিকা দিয়ে হয়তো তৈরি। তা থেকে যে রশ্মি ঠিকরে পড়ে, পৃথিবীর মানুষের পক্ষে তা ক্ষতিকর। তাই তাদের সংস্পর্শে গেলে মানুষ দুরারোগ্য অসুখ-বিসুখে ভুগে মারা পড়ে। আপনার কি মনে হয় কর্নেল?
কর্নেল একটু হেসে বললেন, পবিত্র কোরান আমিও পড়েছি মির্জাসায়েব! অবশ্য ইংরেজি অনুবাদে। কোরানে ঈশ্বর বলেছেন : আমি মানুষ ও জিন সৃষ্টি করেছি। তাছাড়া ১৮টি ব্রহ্মাণ্ড বা গ্যালাক্সির কথাও কোরানে বলা হয়েছে।
মির্জাসায়েব উৎসাহে চঞ্চল হয়ে বললেন, তাহলে দেখুন, আধুনিক বিজ্ঞানেও–
আমি ওঁর কথা কেড়ে বললুম, মহাভারত এবং রামায়ণেও বিস্তর ব্যাপার আছে, যা আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে মিলে যায়। যেমন, সৌরভ নগরী—যা মহাকাশে ভাসমান এক পুরী। কৃত্রিম উপগ্রহ নয়? তারপর নারদের বাহন পেঁকি। রকেট ছাড়া আর কি হতে পারে? চেঁকির সঙ্গে রকেটের গড়নের আশ্চর্য মিল! তারপর পুষ্পক রথ হল বিমান। মহাভারতের যুদ্ধের বর্ণনা পড়লে তো মনে হয় পারমাণবিক অস্ত্রের লড়াই।
কর্নেল বলে উঠলেন, ডার্লিং, আমরা হয়তো দানিকেনের আজগুবি তত্ত্বের দিকে এগোচ্ছি। মির্জাসাহেব, বরং শাস্ত্ৰ-পুরাণ থাক আপাতত। আপনার হতভাগা পরিচারক কিংবা হালাকুর পালছাড়া গাড়োল জিনের বাদশা ওজরাকের সংস্পর্শে এসে ছাই হয়ে গেছে কি না এখনও প্রমাণ পাইনি। ক্রমশ আমার মাথায় একটা চিন্তা ভেসে আসছে। কেউ কি লেসার রশ্মি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে? কে জানে!
মির্জাসাহেব বললেন, কিন্তু, ঝড়, পাওয়ার ফেল, আকাশ থেকে অদ্ভুত আলো নেমে আসা, ঘুঙুরের মতো শব্দ, তীব্র শিস–
—ওজরাক যদি জিনই হয়, সে আপনার এবং দেশের পাঁচটা প্রত্নশালার ধাতুরত্ন ও মূর্তি চুরি কেন করবে, ভেবে পাচ্ছি না মির্জাসাহেব। জিন যদি সত্যি থাকে, তার বাস সম্ভবত বহু আলোকবর্ষ দূরের কোন ব্রহ্মাণ্ডে। ধরে নিচ্ছি, সে কান্দ্রার পশ্চিম পাহাড়ে এসে ঘাঁটি করেছে। কিন্তু প্রত্নদ্রব্য আর মূল্যবান রত্নে তার লোভ কেন হবে? এসব তো নেহাত পৃথিবীর জিনিস। এসবের চেয়ে মূল্যবান আর বিস্ময়কর জিনিস আশা করি অন্য ব্রহ্মাণ্ডের গ্রহে বিস্তর আছে।
শুনেছি, জিনেরা খুব খেয়ালি। ওজরাকও নাকি খেয়ালি জাদুকর।
মির্জাসায়েব আনমনে বললেন। তবে আমার পূর্বপুরুষের সংগৃহীত নুরে আলম রত্নের কথা ভাবুন। এ রত্ন নিশ্চয় অন্য কোনও গ্রহের জিনিস। ধাতু-বিজ্ঞানীদের অজানা এ রত্ন। আমার মনে হচ্ছে ওজরাক এতদিনে হয়তো তা টের পেয়ে চুরি করে নিয়ে গেছে। কে বলতে পারে, আমার পূর্বপুরুষদের কেউ এ রত্ন পশ্চিমের পাহাড়ে কুড়িয়ে পাননি। রত্নটা হয়তো ছিল ওজরাকেরই।
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, ওজরাক যদি জিন এবং মায়াবি জাদুকর, তাহলে রাত-দুপুরে তাকে চুরি করতে হয় কেন? মির্জাসায়েব, ন্যায়শাস্ত্রে কাকতালীয় যোগ বলে একটা ব্যাপার আছে। কাক এসে তালগাছে বসল এবং অমনি একটা তাল পড়ল এই দেখে কেউ যদি ভাবে, কাক এসে বসাই তাল পড়ার কারণ, তাহলে সে ভুল করবে। যোগাযোগটা আকস্মিক।
মির্জাসায়েব ভুরু কুঁচকে বললেন, তার মানে?
