এক বাঙালি যাত্রী মাতৃভাষায় ফুসে উঠলেন, রোজ এই অবরোধ। কথায়-কথায় রাস্তা আটকানো চাই। বলে রাষ্ট্রভাষায় কন্ডাক্টরকে জিজ্ঞেস করলেন, আজ হুয়া ক্যা? কিস্কা বিল্লি মর গেয়ি?
কন্ডাক্টর হাসল। বহুত্ বড়ি বিল্লি বাবুজি! সুভাষজিকো মার ডালা।
ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন। ওরে বাবা! কৌন মারা?
মালুম নেহি।
ভদ্রলোক বোঁচকা-বুঁচকি গুছিয়ে নেমে গেলেন। কর্নেল পিঠে তার কিটব্যাগ এঁটে বললেন, ওঠ জয়ন্ত! নেমে পড়া যাক।
নেমে দেখি, সেই ভদ্রলোক এবং আরও কিছু বাসযাত্রী একটা টিলার নিচে পায়ে-চলা পথের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। কর্নেল হন্তদন্ত হয়ে সঙ্গ ধরলেন। ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলেন, ওদিকে কোনও বাসরুট আছে নাকি?
ভদ্রলোক থমকে দাঁড়ালেন। কী আশ্চর্য! আপনাকে সায়েব ভেবেছিলাম। এরিয়ার মিশনারি সায়েবরা আছেন। তা…
কর্নেল পকেট থেকে নেমকার্ড বের করে দিলেন। উনি বিড়বিড় করে পড়তে থাকলেন, কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। নেচারিস্ট। তারপর মুখ তুলে বললেন, নমস্কার! নমস্কার! আপনি মিলিটারির লোক। তা নেচারিস্ট মানে?
প্রকৃতিপ্রেমিক বলতে পারেন। আপনি কোথায় থাকেন? এদিকে কোথায় যাচ্ছেন?
তারাপুরে আমার বাড়ি। ছোটখাটো ব্যবসা করি। আমার নাম সদানন্দ রায়। এই পথে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গেলে নদীর ব্রিজে পৌঁছনো যাবে। তারপর ধরমতাল রোডের মোড়ে একটা কিছু পেয়ে যাব—জিপ কিংবা অটোরিকশা।
চলুন, আমরাও তারাপুর যাব। গল্প করতে-করতে হাঁটলে ক্লান্তি আসে না।
আজ্ঞে, কথাটা ঠিকই বলেছেন।
কে এমন মারা গেলেন যে, ললাকে রাস্তা আটকাল?
সুভাষ সিঙ্গির কথা আর বলবেন না সার! বিয়েটিয়ে করেনি। সমাজসেবা করে বেড়াত। কোম্পানি লাটে তুলে দিয়েছিল। এবার অবনী হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে। অবনী ওর পার্টনার স্যার! বুঝলেন তো?
ওঁদের ব্যবসা কিসের?
রকমারি অর্ডার সাপ্লাইয়ের। ধরুন, এরিয়ার মিশনারি স্কুল-কলেজ অর্ডার দিল, এত খাতা চাই, কি কালি-কলম চাই কি চেয়ার-টেবিল চাই—আবার গভমেন্ট অফিস যদি অর্ডার দিল-
কর্নেল বললেন, বুঝেছি। বাঘের দুধের অর্ডার দিলেও সাপ্লাই দেয়।
অদ্ভুত শব্দে হাসতে লাগলেন সদানন্দবাবু। ঠিক ধরেছেন। তবে ওই যে বলছিলাম, সিঙ্গি ব্যবসা লাটে তুলেছে দান-খয়রাত করে। ইদানীং বাতিক উঠেছিল বরমদেওয়ের থানে মন্দির গড়ে দেবে। অবনী মুখুজ্যে বেগতিক দেখে কলকাতায় ব্রাঞ্চ করেছে। ওর ছেলে মৃণাল দেখাশোনা করছে। এবার পাড়াতাড়ি গুটিয়ে অবনী কাটবে। ফ্যামিলি অলরেডি পাঠিয়ে দিয়েছে, জানেন?
তারাপুরের বাড়িতে অবনীবাবু এখন একা থাকেন বুঝি?
হ্যাঁ। সুভাষ সিঙ্গিও থাকত। নিজে কোনও বাড়ি করেনি।
জঙ্গলের গাঢ় ছায়ায় যেতে-যেতে কানে এল, ডাইনে দূরে মানুষ-জনের কোলাহল। কর্নেল বললেন, বরমদেওয়ের থান কি কাছাকাছি?
সদানন্দবাবু বললেন, আজ্ঞে! ডান দিকে ওই যে বটগাছ দেখছেন। তবে এবার একটু পা চালিয়ে আসুন সার! অবরোধ হটাতে পুলিশ গুলি ছুড়তে পারে।
ছুড়ুক না! আমরা দমাদ্দম পটকা ফাটাব।
সদানন্দবাবু গুলি-গুলি চোখে তাকালেন। পটকা ফাটাবেন? ওরে বাবা! টেররিস্ট ভেবে সিকিউরিটি ফোর্স ছুটে আসবে।
আপনার ওই ব্যাগে তারাকাঠির প্যাকেট দেখছি। আসন্ন দেওয়ালি উপলক্ষে বাজি, পটকা, হাওয়াই, তুবড়ি কিনতে নিশ্চয় কলকাতা গিয়েছিলেন?
আজ্ঞে। তা–
দিন না কয়েকটা পটকা। দাম দেব।
কী বলছেন সার?
কর্নেল পকেট থেকে একটা পটকা বের করে বললেন, তা হলে আমারটা ফাটাই। উনি একটা পাথরে জোরে পটকাটা ছুড়ে মারলেন। প্রচণ্ড শব্দে ফাটল এবং কানে তালা ধরে গেল।
সদানন্দবাবু অমনই প্রায় দৌড়তে শুরু করলেন। বললাম, কোনও মানে হয়? যদি সত্যি সিকিউরিটি ফোর্স ছুটে আসে?
কর্নেল একচোট হেসে বলেন, কষ্ট করে আর তারাপুর যেতে হল না। সদানন্দবাবুর কাছেই। সব হদিশ পাওয়া গেল। এবার ওঁকে সঙ্গছাড়া করার দরকার ছিল। দ্বিতীয়ত, একাগ্রচিত্ত এক বালক ব্যাধের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হল।
একটি বনচর ছেলে গুলতি আর মুঠোয় বাঁটুল নিয়ে বাঁ দিকের ঝোপ থেকে কখন বেরিয়ে এসেছে, লক্ষ করিনি। কর্নেল তাকে ইশারায় ডাকলেন। তার মুখে ক্ষোভের চিহ্ন স্পষ্ট। কর্নেল হিন্দিতে বললেন, পাখিটা উড়ে গেছে। সেজন্য দুঃখ কোরো না। বখশিশ দিচ্ছি।
তার হাতে একটা দশ টাকার নোট খুঁজে দিলেন কর্নেল। সে অবাক চোখে নোটটা দেখতে থাকল।
কর্নেল বললেন, ওটা লুকিয়ে রাখো। তুমি থাকো কোথায়?
সে আঙুল তুলে দক্ষিণ-পশ্চিম দিক দেখাল। তারপর হেঁড়া-খোঁড়া নোংরা হাফপেন্টুলের পকেটে নোটটা ঢোকাল।
এখানে কাছাকাছি কোথাও জল আছে?
সে ইশারায় আমাদের অনুসরণ করতে বলল। ঝোপঝাড়, পাথর আর উঁচু গাছের ভেতর দিয়ে কিছুদূর চলার পর একটা ছোট্ট ডোবা দেখা গেল। ডোবার জলটা গাঢ় হলুদ। কর্নেল আমাকে অবাক করে ডোবার চারদিকে ঘুরতে শুরু করলেন। কখনও ঝুঁকে বা হামাগুড়ি দিয়ে ঘুরতে-ঘুরতে একখানে থামলেন। তারপর ছেলেটিকে কাছে ডেকে বললেন, আরও বখশিশ পাবে। জলে মাছ আছে মনে হচ্ছে। পাক হাতড়ে একটা মাছ ধরতে পারলে মাছটা তোমার। পাঁকে অন্য কিছু পেলে আমার।
ছেলেটি একটু দোনামনা করছিল। কর্নেল আবার একটা দশ টাকার নোট তার হাতে খুঁজে দিলেন। তখন সে নোটটা পেন্টুলের পকেটে ভরে ফেলল এবং নিঃসঙ্কোচে পেন্টুল খুলে রেখে জলে নামল! জল তত গভীর নয়। তার কোমর অবধি ড়ুবল মাত্র। কমবয়সীদের যা স্বভাব। জল তার সরল আদিম মনকে ভূতের মতো পেয়েছিল। কর্নেল বারবার বলছিলেন, পাক হাতড়াও! পাঁকে মাছ পাবে।
