আমার হাত কাঁপছিল। কাগজটা কর্নেলকে ফেরত দিলাম। কর্নেল বললেন, তুমি গিয়ে আমেদের কাছে থাকো। বেচারার নার্ভাস হয়ে পড়া স্বাভাবিক। তুমি থাকলে ও সাহস পাবে। …
কুঁয়ারডি থানায় বসে ওসি. রামলগন সিংহের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তখন রাত প্রায় নটা। কর্নেলকে উনি চেনেন, এতে অবাক হইনি। বললেন, কেন্দ্র সন্ত্রাসবাদ দমনের জন্য নিরাপত্তাবাহিনী পাঠিয়েছে। কোনও ঘটনা ঘটলেই পাহাড়-জঙ্গলে চিরুনি-তল্লাশ চালায়। আমরা সঙ্গে থাকি। কিন্তু এ-পর্যন্ত অবস্থা যা ছিল, তা-ই। নাহ্, ভুল বলছি। ক্রমশ বাড়ছে বলাই উচিত। কিন্তু আমার ধারণা, জঙ্গিদের লক্ষ্য ছিলেন অবনী মুখার্জি। সুভাষ সিংহ বাধা দিতে গিয়েই মারা পড়েছেন। কেন বলছি, শুনুন। সারা জেলায় সুভাষবাবু ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে আদিবাসীদের জন্য উনি অনেক করেছেন। আপনি তারাপুরে গেলে সব জানতে পারবেন। তাই বলছি, জঙ্গিরা বাধ্য হয়ে ওঁকে মেরেছে। চঁচামেচি করেছিলেন কিংবা বাধা দিয়েছিলেন। এও সম্ভব, জঙ্গিদের মধ্যে চেনা মুখ ছিল। আমি তারাপুরে যখন ছিলাম, তখন আইবি-র গোপন রিপোর্টে আভাস ছিল, সুভাষবাবু নাকি জঙ্গিদের ফান্ডে টাকা দেন। কিন্তু শক্ত প্রমাণ ছাড়া ওঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে হইহই শুরু হয়ে যাবে। বিধানসভা থেকে সংসদ পর্যন্ত নড়ে উঠবে। এই দেখুন না, সুভাষবাবুর মৃত্যুর খবর পেয়ে কী ঘটে। আমার তো বুক ঢিপঢিপ করছে।
সিংহ অট্টহাসি হাসলেন। কর্নেল বললেন, ড্রাইভার কিষেনদ কোনও শব্দ বা চঁচামেচি শুনতে পায়নি। অথচ বাতাস বইছিল থানের দিক থেকে।
বলছে নাইট ডিউটি করে আজ দিনে ঘুমনোর সময় পায়নি।
কান্হো প্রপাত কোথায়?
এখান থেকে কম করে চল্লিশ কিলোমিটার দূরে, দুর্গম পাহাড়-জঙ্গল এলাকায়। তারাপুর থেকে অবশ্য বিশ-পঁচিশের মধ্যে। রিজার্ভ ফরেস্টের কোর এরিয়ার পড়ে। জন্তু-জানোয়ার আছে। আমি ভাবছি, অবনীবাবুর পক্ষ থেকে ওখানে টাকা পৌঁছে দেবে কী করে?
কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, খুব গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট তুলেছেন মিঃ সিংহ!
মিঃ সিংহ ঘড়ি দেখে বললেন, ব্ল্যাক প্যান্থার বলেছে, আমরা যেন নাক না গলাই। ঠিক আছে। আগে অবনীবাবুর ফ্যামিলির লোকেরা কী বলে জানা যাক। আমারা রিস্ক নেব না। ওরা যদি টাকা দেয়, বরং ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোকেদের মারফত পাঠানো যাবে। অবনীবাবু বহালতবিয়তে ফেরত এলে তখন ওঁর স্টেটমেন্ট নিয়ে তার ভিত্তিতে চিরুনি-তল্লাশে নামব। কর্নেলসায়েব কী বলেন?
মর্গের প্রাথমিক রিপোর্ট কখন আশা করছেন?
তারাপুর এখান থেকে চব্বিশ কিলোমিটার। কাজেই আজ রাত্রে পাওয়ার আশা নেই। তবে আপাতদৃষ্টে রাইফেলের বাঁট দিয়ে মেরেছে মনে হল। খুলি লম্বালম্বি ফেটে গেছে। আপনিও তো পরীক্ষা করলেন।
কর্নেল কিছু বলতে ঠোঁট ফাঁক করেছিলেন, বললেন না। ইকবাল আমেদ ব্যস্তভাবে বললেন, কর্নেল, পৌনে দশটা বাজে।
কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। মিঃ সিংহ একটু হেসে বললেন, সঙ্গে পুলিশভ্যান এসকর্ট করবে। পিআরও সায়েবের মাথার দাম আমরা বুঝি।
লোহাগড়ে নদীর ধারে খনিজ সম্পদ দফতরের সুদৃশ্য বাংলোয় আমরা উঠেছিলাম। একবাল আমেদ গেটে আমাদের নামিয়ে দিয়ে কোয়ার্টারে চলে গেলেন। পেছনে পুলিশভ্যান।
লনে হাঁটতে হাঁটতে কর্নেল হঠাৎ হেসে উঠলেন। জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার?
তিনটে পটকা।
তার মানে?
কর্নেল প্যান্টের পকেট থেকে সত্যি তিনটে পটকা বের করে দেখালেন। বরমদেও থানে এই তিনটে টাটকা পটকা ঘাসের মধ্যে খুঁজে পেয়েছি। মশলায় ভেজাল থাকলে বা দৈবাৎ ভিজে গেলে কিংবা ঠিকঠাক আছাড় না মারলে পটকা ফাটে না। তা ছাড়া ঘন ঘাসের ওপরও পটকাবাজি নিষ্ফল।
জঙ্গিরা পটকা ফাটাতে চাইবে কেন? ওদের তো এ-কে-৪৭ রাইফেল থাকে।
হুঁ। কালাশনিকভ! এই নামের এক সামরিক অফিসার এই দুর্ধর্ষ আগ্নেয়াস্ত্র অনেক দুঃখে মাথা খাটিয়ে তৈরি করেছিলেন। তবে এক্ষেত্রে একটা যুক্তি আছে। চঁচামেচি শুনে কিষেনদ কিংবা রাস্তা থেকে কেউ ছুটে এলে তাদের ভাগিয়ে দিতে পটকা যথেষ্ট। কালাশনিকভের গুলি খামোখা খরচ করে লাভ কী? হাতে রাইফেল দেখবে এবং পটকার শব্দ শুনবে। দুয়ে-দুয়ে চার হবে এবং লেজ তুলে পালাবে।
কর্নেল আবার হেসে উঠলেন। বললাম, কিষেনাদের ঘুমনোটা আশ্চর্য! নাইট ডিউটি বাজে কথা। জঙ্গিদের সঙ্গে ওর নিশ্চয় যোগসাজশ আছে।
অনেক ড্রাইভার সুযোগ পেলেই ঘুমোয় দেখছি। কিন্তু কথা হল, আলফা কোম্পানির দুই মালিক বরমদেও থানে আসবেন, জঙ্গিরা জানত তা হলে?
সায় দিয়ে বললাম, হ্যাঁ। কিষেনৰ্চাদের কাছেই জেনেছিল। আর দেখুন, ওরা আগে থেকেই অপহরণপত্র ছাপিয়ে রেখেছে।
কর্নেল হঠাৎ হললেন, সকালে তারাপুর যাচ্ছি কিন্তু!
আঁতকে বললাম, কর্নেল, ওরা সাধারণ খুনে নয়, জঙ্গি গেরিলা গ্রুপ। এতবড় একটা দেশের সরকার ওদের জব্দ করতে পারছে না।
এই সময় কেয়ারটেকার ভদ্রলোক এসে পড়লেন। পি আর ও সায়েব এইমাত্র ফোন করেছিলেন। ডিনার রেডি সার।
এই বাতিকগ্রস্ত বৃদ্ধের পাল্লায় পড়ে অনেক দুর্ভোগে ভুগেছি। এবার নির্ঘাত জঙ্গিদের গুলিতে প্রাণটা যাবে। ওঁর অবশ্য কিছু হবে না। ব্ল্যাক প্যান্থারদের গেরিলা যুদ্ধের কৌশল শেখাতে চাইবেন। ওটা নাকি ওঁর সামরিক জীবনের সেরা লাভ।
সকাল সাড়ে সাতটায় ব্রেকফাস্ট করে বাসস্টেশনে গেলাম। আমেদ তখনও ওঠেননি। তাঁর জন্য কর্নেল চিরকুটে বার্তা রেখে এসেছিলেন। আটটায় তারাপুরগামী বাস ছাড়ল। কুঁয়ারডি পেরিয়ে কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ দীর্ঘ জ্যাম। কন্ডাক্টর খোঁজ নিয়ে এসে ঘোষণা করল, বরমদেও থানের সামনে দশ-বিশ হাজার লোক রাস্তা আটকেছে।
