আমি থ হয়ে বসে ব্যাপারটা দেখছিলাম। কিছুক্ষণ পরে সে হাত-খানেক লম্বা কী একটা জিনিস তুলে ধরল। কর্নেল শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বলে উঠলেন, ওটা আমার! ছুড়ে দাও।
এতক্ষণে দেখলাম জিনিসটা ইঞ্চিদেড়েক মোটা একটা লোহার রড। কর্নেল রডটা কিটব্যাগে ঢুকিয়ে বললেন, কুইক জয়ন্ত, কুঁয়ারডি থানায় মার্ডার-উইপনটা জমা দিয়ে লোহাগড় ফিরতে হবে। ধরমতালের সেক্রেটারি বার্ডের ছবি না তুলে কলকাতা ফিরছি না।
বললাম, জঙ্গিরা তা হলে এই রড়টা দিয়েই—
জঙ্গিরা না। অবনী মুখুজ্যে।
অ্যাঁ? সে কী!
কর্নেল হাঁটতে-হাঁটতে বললেন, তিনটে পটকা দেখেই খটকা বেধেছিল। সদানন্দবাবুর কথাগুলো স্মরণ করো। ওইখানে সুভাষবাবু মন্দির গড়ে দিতে চেয়েছিলেন। কাজেই তাঁকে ডেকে এনে আচমকা পেছন থেকে মাথায় রডের ঘা মারা সো ইজি। জঙ্গিদের লেটারহেড? সুভাষবাবুর সঙ্গে ওদের যোগাযোগ ছিল, আই বি রিপোর্টে তার আভাস আছে। অর্ডার সাপ্লায়ার কোম্পানির পার্টনার সুভাষবাবুর পক্ষে লেটারহেড সাপ্লাই করা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু অবনীবাবুর অগোচরে এ কাজ অসম্ভব। কাজেই অবনীবাবু একটা লেটারহেড আত্মসাৎ করেছিলেন। তবে অতিবুদ্ধির গলায় দড়ি বলে কথা আছে। পটকা ফাটিয়ে কিডন্যাপিং কেকে আরও মজবুত ভিত্তিতে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন অবনীবাবু। ঘাসে পটকা ফাটেনি। কাজেই আমার খটকা …কালাশনিকভ হাতে থাকলে পটকার কথা মাথায় আসবে কেন? হ্যান্ডগ্রেনেডের অভাব নেই জঙ্গিদের। কর্নেল অট্টহাসি হাসলেন। নিজেকে নিজে কিডন্যাপ করলে ঘরের টাকা ঘরেই ফিরবে। তবে আমার ধারণা, অবনীবাবু অত ঝুঁকি নেবেন না। কাহো প্রপাত এলাকায় অবশ্যই জঙ্গিদের ঘাঁটি আছে। তার প্রমাণ ওই লেটারহেড। অবনীবাবু ধুলো-কাদা মেখে থানায় হাজির হয়ে বলবেন, পালিয়ে এসেছি।
বৃদ্ধ রহস্যভেদী সত্যি অন্তর্যামী। কুঁয়ারডি থানায় ছেড়া শার্ট এবং ধুলো-কাদামাখা অবনী মুখুজ্যে করুণ মুখে বসেছিলেন। কয়েক মিনিট পরেই অবশ্য তাঁকে হাজতে ঢোকানো হয়েছিল…।
১.০৪ মানুষখেকোর ফাঁদ
খ্যাতনামা বেসরকারি ঘুঘু অর্থাৎ গোয়েন্দা কর্নেল নীলাদ্রি সরকার ডাকলে এই রিপোর্টার জয়ন্ত চৌধুরি নরকে যেতেও রাজি। কিন্তু নরকে নয়, সেবারে ডাক এল রাজস্থান থেকে। জায়গাটার নাম মাধোপুর। জয়পুর থেকে অনেক দূরে একটা জঙ্গুলে জায়গা। কীভাবে যেতে হবে, সব পথনির্দেশ ছিল টেলিগ্রামে। তাই পৌঁছতে কোনও অসুবিধে হল না।
মাধোপুরে গিয়ে দেখলুম, আমার জন্যে একটা জিপ অপেক্ষা করছে। জিপের ড্রাইভারের কাছে জানলুম, আমার বৃদ্ধ বন্ধুটি এখন বাঘ শিকারের নেশায় মেতেছেন। জয়পুরের মহারাজার এক সংরক্ষিত বনাঞ্চল আছে মাধোপুরের মাইল পাঁচেক দূরে। এখন অবশ্য তার মালিক ভারত সরকার। সেখানে বনবিভাগের বাংলোয় কর্নেল সায়েব মহামান্য অতিথির সম্মানে বাস করেছেন। সম্প্রতি ওই এলাকায় একটি মানুষখেকো বাঘের ভীষণ উপদ্রব দেখা দিয়েছে। কর্নেলের মাথায় বাঘটা নিকেশ করার ঝোঁক চেপে গেছে বিলক্ষণ।
শুনে আমার বুক কেঁপে উঠল। আফসোস হল, খুলে জানালে আমার হেভি এক্সপ্রেস রাইফেলটা আনতুম! তারপর মনে পড়ল, কিছুদিন আগে কর্নেলকে কথায় কথায় বলেছিলুম, মানুষখেকো বাঘ মারার সুযোগ আজ অব্দি পাইনি। পেলে একবার চেষ্টা করে দেখতুম। তার জবাবে কর্নেল ঠাট্টা করে বলেছিলেন, আদতে সাধারণ বাঘ কি তুমি কখনও মেরেছ, জয়ন্ত? হাজারটা সাধারণ বাঘ যে না মেরেছে, তার পক্ষে মানুষখেকো বাঘ মারার স্বপ্ন দেখা উচিত নয়।
বুড়ো কথাগুলো মনে রেখেছিলেন বোঝা যাচ্ছে। কারণ, আমি জোর তর্কাতর্কি করেছিলাম, ওঁর বক্তব্য মেনে নিতে পারিনি। তাই কি এই ডাক? কিন্তু তাহলে আমাকে রাইফেল আনতে বলেননি কেন? এইসব ভেবে খুব রাগও হল। উনি আমাকে নিয়ে বরাবর এমন পরিহাস করেন কেন?
পৌঁছে দেখি, একটা ছোট্ট টিলার গায়ে সুন্দর বাংলোর বারান্দায় কর্নেল আর আমার অচেনা এক ভদ্রলোক বসে রয়েছেন। কর্নেল আমাকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠলেন—হ্যাল্লো ডার্লিং! কনগ্রাচুলেশনস! গুড লাক ফর ইউ!
বললুম—আগাম ওটা নিতে চাইলেন কর্নেল!
কর্নেল হেসে উঠলেন। তারপর সেই ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। ওঁর নাম রাজাধিরাজ আচরল। পুলিশ সুপার। একজন জবরদস্ত শিকারি উনি।
কর্নেলের সঙ্গে সময় পুলিশকর্তাদের যোগাযোগ ঘটে যায়-এটা অবাক লাগে আমার। ঠাট্টা করে বললুম—ম্যান ইটার পাকড়াও করতেও প্রাইভেট গোয়েন্দা আর পুলিশ দরকার হয় আজকাল! বাঃ!
মিঃ আচরল কিন্তু হো হো করে হেসে উঠলেন। বললেন-না না! জাস্ট আকস্মিক যোগাযোগ!
গল্পগুজব বন্ধ করে কর্নেল আমাকে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে নিতে বললেন। পথশ্রমের ক্লান্তি দূর করার জন্য স্নান করলুম। তারপর তিনজনে একসঙ্গে বসে লাঞ্চটা সেরে নেওয়া হল।
সেই ফাঁকে মানুষখেকো বাঘটার খবরাখবর দিলেন কর্নেল। কদিন আগে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যে হাইওয়ে গেছে, তিনজন লোক সাইকেল চেপে আসছিল একের পর এক—কেউ পাশাপাশি ছিল না। প্রথম সাইকেলটা বাঁকের দশগজ দূরে যখন, তখন হঠাৎ বাঁদিকের পাথরের পাঁচিলে একটা বাঘ উঠে আসে। ব্রেক কষবার আগেই সে রাস্তার মাঝখানে লাফিয়ে পড়ে। তার ফলে সাইকেলের সঙ্গে তার ধাক্কা লাগে। অমনি সে গর্জন করে ওঠে। এদিকে লোকটা সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে ছিটকে সরে আসে, সাইকেলটা পড়ে যায় এবং চাকা ঘুরতে থাকে। পিছনের লোক-দুটো কিছু লক্ষ্য করেনি। তাই তারাও এসে প্রথম সাইকেলটার ওপর একসঙ্গে হুমড়ি খেয়ে পড়ে এবং সামনে বাঘ দেখে লাফ দিয়ে সরে আসে। তিনটে সাইকেলের চাকা বোঁ বোঁ করে তখন ঘুরছে এবং একটা বাঘ ক্ষেপে গিয়ে থাবা মারছে একবার এটায়, একবার অন্যটায়। আর প্রচণ্ড গর্জাচ্ছে। অন্যদিকে পাথরের গায়ে সেঁটে তিনটে ভয়পাওয়া মানুষ কাঠ হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। তাদের পালানোর ক্ষমতাও নেই।
