গন্ধ পেলুম কি না জানি না, আঁতকে উঠে নাক বন্ধ করে পিছিয়ে এলুম। —দোহাই কর্নেল! এই কুকুর তাড়ানো ফরমুলা-ডগ প্রয়োগের জন্য আরও মানুষ পাবেন।
কর্নেল ছিপি এঁটে টিউবটা প্যাকেটের ভিতর চালান করলেন। বদর খাঁ নাকের ফুটোয় আঙুল ঢুকিয়ে বলল, বহৎ বদ বু নিকালতা।
গুজরদের তাঁবুতে ততক্ষণে কুকুরের ব্যাপারটা ওরা টের পেয়ে গেছে হয়তো। একদল লোক বেরিয়ে আমাদের দেখছে। বদর খাঁ চেঁচিয়ে ডাকল, হালাকু! হালাকু! জলদি ইধর আও। কলকাত্তাসে সাবলোগ তুমহারা মুলাকাত মাংতা।
একজন প্রৌঢ় তাগড়াই গড়নের লোক ভিড় থেকে আমাদের দিকে দৌড়ে এল। তার মাথায় প্রকাণ্ড পাগড়ি, পরনে ঢিলে কোর্তা আর শালোয়ার। পা অবশ্য খালি। সেলাম দিয়ে বদর খাঁ-র দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল। বদর খাঁ বলল, নবাববাহাদুর এঁদের পাঠিয়েছেন। এঁরা তোমার সঙ্গে কথা বলতে চান।
গুজর সর্দার আমাদের খুব খাতির দেখিয়ে তাঁবুতে নিয়ে গেল। তাঁবুগুলো চামড়া সেলাই করে তৈরি। কোনওটার উপর তেরপলও চাপানো হয়েছে। খোলা জায়গায় উনুন পেতে মেয়েরা রাতের রান্নায় ব্যস্ত। কেউ চাপাটি বানাচ্ছে। কেউ প্রকাণ্ড পাত্রে দুধ জাল দিচ্ছে। ভিড় হটিয়ে হালাকু চামড়ার আসন পেতে আমাদের বসাল। আশেপাশে কোথাও কুকুরের লেজের ডগটুকুও দেখতে পাচ্ছিলুম না।
কর্নেল লোকের সঙ্গে ভাব জমাতে ওস্তাদ। হালাকু সর্দারের সঙ্গে খোশগল্প জুড়ে দিয়েছেন। হালাকু ভাঙা-ভাঙা হিন্দিতে কথা বলছে। আমরা নবাববাহাদুরের মেহমান শুনে সে একেবারে ভক্তিতে গদগদ। বলল, এবার শীতকালটা কান্দায় এসে ভালই কাটল। যেখানেই ঘুরে বেড়াই, কান্দ্রার জন্য মন পড়ে থাকে আমাদের। পুরুষানুক্রমে কান্দ্রার নবাব আমাদের মা-বাপের মতো। এই যে ঘাসের জঙ্গল দেখছেন, তার মালিক ওঁরা। কোনও খাজনা কখনও দাবি করেননি। আমরা এসে তাই ভেট দিই। ছাগল ভেড়া, কখনও মাখন দুধ চর্বি—যা পারি দিই। তো নবাববাহাদুর কিছুতেই নিতে চান না। বলেন, মিলিটারিদের দিয়ে এস। ওরাই নাকি এখন এই ঘাসের জঙ্গলের মালিক। আমি বিশ্বাস করি না, হুজুর।
কর্নেল বললেন, এবার গ্রীষ্মে কোথায় যাবে, সর্দার?
হালাকু বলল, পামির এলাকায় যাব। সেখানে চীনাদের রাজত্ব। সেখান থেকে যাব কাশগড়, তারপর উত্তরে মাকরান। সেখানে হুজুর, রুশ মুল্লুক। সেখান থেকে আবার কান্দ্রায় ফিরে আসব। ওসব মুল্লুকে শীতের সময় খালি বরফ আর বরফ। জানোয়ার কী খেয়ে বাঁচবে?
কর্নেল বললেন, আমি তোমার কাছে এসেছি ওজরাকের কথা শুনতে। তোমার কাছে নাকি ওজরাকের পাঞ্জা আছে।
হালাকু চোখ বড় করে তাকাল। তার মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। দুর্বোধ্য ভাষায় কাউকে কী বলল, তারপর উঠে তার তাঁবুতে ঢুকল। একটা লোক ব্যস্তভাবে আমাদের সামনে একপাঁজা কাঠ এনে আগুন ধরাল। বেশ ঠাণ্ডা টের পাচ্ছিলুম। আগুনের কুণ্ড ঘিরে বসলুম আমরা। তারপর হালাকু বেরিয়ে এল তাঁবু থেকে।
তার হাতে সেই ওজরাকের পাঞ্জা। কর্নেলের হাত দিয়ে সে বলল, আমি খুব ভাবনায় পড়ে গেছি হুজুর। আজই ভাবছিলুম, পাঞ্জাটা যেখানে পেয়েছিলুম, ফেলে দিয়ে আসব নাকি। এটা আর কাছে রাখতে সাহস হচ্ছে না।
—কেন সর্দার?
হালাকু উদ্বিগ্ন মুখে বলল, আমার মেয়ে রিয়া দুদিন আগে ওজরাকের পাল্লায় পড়েছিল। খুব বেঁচে গেছে।
কথাটা বদর খাঁ বলেছিল। তখন অতটা গ্রাহ্য করিনি। তাই বললুম, ব্যাপারটা খুলে বলো তো সর্দার!
হালাকু বলল, পশ্চিমপাহাড়ের নিচে একটা নহর আছে। লেক থেকে নহরটা বেরিয়ে পশ্চিমপাহাড়ের নিচে দিয়ে চলে গেছে। এখন নহরে অল্প একটু জল আছে। আমরা নহরের ওপারে কখনও যাই না। রিয়া সেটা জানে। তবে ওর দোষ নেই। আমায় একটা মদ্দা ভেড়া খুব বদমাশ। পাল থেকে প্রায়ই পালিয়ে যায়। সেটা নহরের ওপরে চলে গিয়েছিল। রিয়া সেটাকে ধরে আনতে গিয়েই ওজরাকের পাল্লায় পড়েছিল।
কর্নেল বললেন, তোমার মেয়ের মুখেই ব্যাপারটা শুনতে চাই সর্দার। তাকে ডাকো।
হালাকুর ডাকে একটি কিশোরী এগিয়ে এল। ছিপছিপে গড়ন, পাকা আপেলের মতো গায়ের রং। পরনে সালোয়ার-কামিজ। চুলে লাল একটা রুমাল বাঁধা। হালাকু তাদের ভাষায় কিছু বলল।
রিয়া কাঁচুমাচু হাসছিল। কর্নেল পকেট থেকে একটা চকোলেটের প্যাকেট বের করে বললেন, নাও রিয়া! এটা তোমার জন্য এনেছি।
হালাকুর ইশারায় রিয়া সেটা নিল। তারপর ভাঙা-ভাঙা হিন্দিতে যা বলল, তা যেমন অদ্ভুত, তেমনি রোমাঞ্চকর। আমার তো বিশ্বাস করতেই বাধছিল। ঘটনাটা এই :
সেদিন বিকেলে বাধ্য হয়ে গাড়োলটার (মদ্দা ভেড়া) জন্য সে নহর (খাল) পেরিয়ে ওপারে গিয়েছিল। হঠাৎ সে দেখল কী, অবিকল তার মতো একটি মেয়ে একটা পাথরের উপর দাঁড়িয়ে আছে। একই পোশাক, একই গড়ন। ভাল করে দেখার জন্য সে এগিয়ে গেল। তারপর ভীষণ অবাক হল। মেয়েটি হুবহু তার মতো দেখতে। আয়নার ভিতর নিজের মুখ তো সে দেখেছে। রিয়া গুজর মেয়ে। ভীতু নয় সে। রেগে গিয়ে বলল, তুমি কে?
মেয়েটিও গুজর ভাষায় বলল, তুমি কে?
রিয়া বল, আমি রিয়া।
মেয়েটিও বলল, আমি রিয়া।
—মিথ্যে বোলো না। তোমার বাবার নাম কী?
রিয়া পাথর তুলে তেড়ে যেতেই মেয়েটা যেন শূন্যে ছিটকে গেল। আকাশে ভেসে সে রিয়াকে যেন ভেংচি কাটতে লাগল। রিয়া পাথর ছুড়ল। মেয়েটি অমনি যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। তখন রিয়া ভয় পেয়ে দৌড়ে পালিয়ে এল নহর পেরিয়ে।…
