কর্নেল মুখ বাড়ালেন। আমি বললুম কই জাদু, বদর খাঁ?
বদর খাঁ বলল, পশ্চিমদিকে নজর দিন, সায়েব!
আমাকে গাড়ি থেকে নামতে হল। কারণ গাড়ির মুখ উত্তরে এবং কর্নেল বসেছেন বাঁদিকে, আমি ডাইনে। নেমে গিয়ে হতবাক হয়ে পড়লুম।
ওই পার্থিব সৌন্দর্যের কোনও তুলনা নেই। পশ্চিমের পাহাড়গুলোর চুড়ো কোনওটা গির্জার মতো ছুঁচলো, কোনওটা পিরামিডের মতো তিনকোনা আর তাদের ফাঁকে গলিয়ে পিচকিরির মত রংবেরঙের আলোর দীর্ঘ দীর্ঘ ফালি উপারি সবুজ সমভূমিতে নেমে আসছে। পাহাড়গুলোর কঁধে ঘন নীল কুয়াশার আলোয়ান চাপানো যেন। কিন্তু বড় মায়াময় ওই রামধনুর মতো অথবা প্রিজমের মতো বিচ্ছুরিতবর্ণালী! এমন আশ্চর্য রঙের খেলা আর কখনও দেখিনি।
দেখতে দেখতে ওজরাকের ওপর যেন বিশ্বাস এসে গেল। ওখানে কোনও মায়াবী জাদুকর বাস করে, তা মিথ্যা নয়। তার খেয়ালি হাতের অপরূপ ওই ইন্দ্রজাল দেখে তারিফ করবে না সে কোন মূখ! আমি ভাবে গদ গদ হয়ে বললুম, অপূর্ব খাসা! কর্নেল, ওজরাককে আমার প্রণাম করতে ইচ্ছে করছে।
কর্নেল চোখে বাইনোকুলার রেখেই নামিয়ে ফেললেন।নাঃ! খালি চোখেই রঙের খেলাটা দেখা যাচ্ছে। তবে ডার্লিং। তুমি যতই বলো, এর মধ্যে কোন জাদু আমি দেখতে পাচ্ছি না। আশা করি, দার্জিলিঙের টাইগার হিল থেকে তুমি সূর্যোদয় দেখেছ!
আপত্তি করে বললুম, এটা সূর্যাস্ত। তাছাড়া কিসের সঙ্গে কিসের তুলনা! কর্নেল, শুধু রঙিন আলো হলেও কথা ছিল! আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না ওজরাকের জাদুপুরীও ক্রমশ ভেসে উঠেছে! ওই দেখুন, যেন রংবেরঙের সাতমহলা প্রাসাদ ভাসছে শূন্যে।
বদর খাঁ বিড়বিড় করে কী আওড়াচ্ছিল চোখ বুজে। এবার দুহাতে মুখ ঘষে তাকে গাড়িতে ঢুকতে দেখলুম। বলল, চলে আসুন সায়েব! বেশিক্ষণ দেখলে চোখ নষ্ট হয়ে যাবে। ওজরাক হল গিয়ে শয়তানের চেলা। শয়তানের কাছে জাদু শিখে মানুষকে ভোলায় সে। সেদিন ঠিক এমনি সময়ে হালাকুর মেয়ে ভেড়া চরাতে গিয়ে ওজরাকের পাল্লায় পড়েছিল! জোর বেঁচে পালিয়ে এসেছে।
গাড়ি আবার এগোল। কর্নেল বললেন, বদর খাঁ! হালাকু থাকে কোথায়?
বদর খাঁ বলল, লেকের দক্ষিণে এখান থেকে ছ-সাত মাইল দূরে ওদের তাঁবু।
—সেখান গাড়ি করে যাওয়া যায় না বদর খাঁ?
—লেক অব্দি গাড়ি যাবে। তারপর আধামাইল পায়দল যেতে হবে।
–নিয়ে যাবে আমাদের?
বদর খাঁ হাসল।-হজুর নবাবসায়েবের হুকুম আছে। যেখানে যেতে চাইবেন, এ বান্দা সেখানেই নিয়ে যাবে। তবে গুজরদের তাঁবুর এলাকায় সাবধানে যেতে হবে, সায়েব! ওদের কুকুরগুলো বড্ড বেতমিজ।
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, কুকুর বশ করার ব্যাপারে আমিও এক ওজরাক, বদর খাঁ!
রিয়া ও তার প্রতিবিম্ব
কান্দ্রা ও লেকের কাছে গাড়ি থামিয়ে বদর খাঁ বলল, একটু অপেক্ষা করুন আপনারা। গাড়িটা কোথাও লুকিয়ে রেখে আসি। আজকাল এ তল্লাটে খুব গাড়ি চুরি হচ্ছে।
সে একটু তফাতে উইলোঝোপের আড়ালে গাড়িটাকে এমনভাবে রেখে এল, রাস্তা থেকে ঠাহর হচ্ছিল না ওখানে কোনও গাড়ি আছে। গাড়িটার রংও অবশ্য ঘন সবুজ।
ফিরে এসে বদর খাঁ বলল, আপনাদের সঙ্গে টর্চ আছে তো? ফিরতে আঁধার হয়ে যাবে।
কর্নেল বললেন, আছে। এমনকী কুকুর-বশ করা যন্ত্রও আছে!
বদর খাঁ খুব অবাক হয়ে পা বাড়াল। অবাক হলুম আমিও। নিশ্চয় রসিকতা করছেন কর্নেল। পাইনবনের ভিতর এখনই আবছা আঁধার জমেছে। পায়ে চলা রাস্তা ধরে বনটা পেরুলে খোলামেলায় পৌঁছলুম। এবার আর রাস্তার চিহ্ন নেই। এখানে-ওখানে পাথরের বোল্ডার পড়ে আছে। ঘন ঘাসের জঙ্গল গজিয়ে রয়েছে সবখানে। তার মাঝে মাঝে কিছু গাছপালা। এটা মোটামুটি একটা সমতলভূমি বলা যায়। পশ্চিমে পাহাড়ের সেই আলোর জাদু আর চোখে পড়ছে না। সূর্য একটা তিনকোনা চূড়ার আড়ালে নেমে গেছে। তাই সারা তৃণভূমির উপর পাহাড়ের বিশাল ছায়া নেমেছে। ঘাসের জঙ্গলের ভিতর গুজরদের তাঁবু চোখে পড়ছিল। কিছুক্ষণ পরে তাদের খোঁয়াড় দেখা গেল। বেড়ায় ঘেরা বিশাল খোঁয়াড়ে অসংখ্য ভেড়া-ছাগল-দুম্বা জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কর্নেল আমাকে গাছপালা চেনাচ্ছিলেন।—ওই দেখছ—ওটা ওক। ওইটে হল বুনো আখরোট। ওগুলো পোলার। আর ওই গাছটা লক্ষ্য কর-মালবেরি। যাকে বলে তুঁতফলের গাছ।
হঠাৎ বদর খাঁ থমকে দাঁড়াল। আঁতকে ওঠা গলায় বলল, কুকুর সায়েব! কুকুর আসছে!
চমকে উঠে দেখি, খোঁয়াড়ের দিক থেকে তিনটে তাগড়াই কুকুর জিভ বের করে দৌড়ে আসছে আমাদের দিকে। আমি পকেট থেকে ঝটপট রিভলভার বের করতেই কর্নেল বললেন, আঃ! কী করছ জয়ন্ত! রিভলভার লুকিয়ে ফেলো শিগগির।
বলে উনি সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর জ্যাকেটের ভিতর পকেট থেকে একটা কাচের টিউব বের করলেন। কুকুর তিনটে যখন প্রায় হাত দশেক তফাতে এসে গেছে, তখন সেই টিউব বাড়িয়ে দিলেন সামনের দিকে এবং ছিপি খুলে ফেললেন।
সঙ্গে সঙ্গে তিনটে কুকুরই থেমে গেল। মুখ নিচু করে কেঁউ কেঁউ শব্দ করতে থাকল। কর্নেল হাসতে হাসতে একটুখানি এগিয়েছেন, আর তিনটে, কুকুরই লেজ গুটিয়ে কুঁকড়ে পিঠটানা দিল। বদর খাঁ খ্যা খ্যা করে হেসে কুকুর তিনটেকে দুয়ো দিতে থাকল।
অবাক হয়ে বললুম, ব্যাপারটা কী কর্নেল?
কর্নেল মুচকি হসে পা বাড়িয়ে বললেন, আমার সাম্প্রতিক উদ্ভাবন। এর নাম দিয়েছি ফরমুলা-ডগ। অ্যামোনিয়ার সঙ্গে উনিশরকম রাসায়নিক দ্রব্য মিশিয়ে এটা তৈরি করেছি। এর এমনই উৎকট গন্ধ যে কুকুর কেন, কেঁদো বাঘও কেঁচো হয়ে পালিয়ে যাবে। অবশ্য মানুষের উপর এখনও পরীক্ষা করিনি। এখনই করা যেতে পারে।-বলে টিউবটা আমার দিকে ঘোরালেন।
