এখন এপ্রিলে হায়দার পাস খুলে গেছে। কান্দ্রায় বসন্ত ঋতুর সমারোহ। তবে এই ভূস্বর্গ ভ্রমণে খুব কড়াকড়ি আছে সরকার থেকে। প্রতিরক্ষা দফতরের কড়া নজর পর্যটকদের দিকে। অবজারভেটরি, রেডার কেন্দ্র, স্পেস রিসার্চ ল্যাবরেটরি, বিমানবাহিনীর ব্যারাক এবং একটি বিমানক্ষেত্র—কান্দ্রা ভ্যালিতে এতসব ব্যাপার। কাজেই কড়াকড়ি থাকা স্বাভাবিক।
সম্প্রতি কান্দ্রা অবজারভেটরিতে যে টেলিস্কোপটি বসানো হয়েছে, সেটা এশিয়ার বৃহত্তম। অবজারভেটরির ডিরেক্টর ডঃ শীলভদ্র সোম কর্নেল এবং আমাকে ঘুরে-ফিরে সব দেখাচ্ছিলেন। কর্নেলের সঙ্গে ওয় পরিচয় আছে দেখে অবাক হইনি। আজকাল কর্নেলের কোনও ব্যাপারে অবাক হই না।
দেখাশোনা শেষ হলে ডঃ সোম আমাদের নিয়ে গেলেন তার অফিস ঘরে। এখান থেকে কান্দ্রা উপত্যকার বহুদূর পর্যন্ত নজরে পড়ে। কর্নেল চুরুট জ্বেলে ধোঁয়ার ভিতর থেকে বললেন, ডঃ সোম ২৫ এবং ২৬ মার্চের অবজার্ভেশন রিপোর্টটা এবার দেখতে চাই।
কর্নেল ফাইলে মনোনিবেশ করলেন। ততক্ষণে কফি আর স্ন্যাক্স এসে গেল। নবাববাড়ি লাঞ্চ সেরে আমরা বেরিয়েছি। এখন প্রায় তিনটে বাজে।
কফি খেতে খেতে রিপোর্ট পাঠ শেষ করে কর্নেল মুখ তুলে একটু হাসলেন।মাঝরাতের ঝড়টার কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল তাহলে!
ডঃ সোম বললেন, ছিল। ১০ মিনিট ৫৭ সেকেন্ডের ঝড়। সারা কান্দ্রা ভ্যালির পাওয়ার ফেল করেছিল অতক্ষণ। আমাদের অবজার্ভেটরির সব যন্ত্রপাতি নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছিল। সূক্ষ্ম কিছু যন্ত্র একেবারে অকেজো হয়ে গিয়েছিল। সেগুলো রিপ্লেস করতে হয়েছে। মেরামত করেও চালু করা যায়নি। কিন্তু তার চেয়ে সাংঘাতিক ব্যাপার, কসমিক ডাস্ট পাওয়া গেছে ছাদের ফুলগাছের পাতায় এবং খোলা ট্যাংকের জলে।
কসমিক ডাস্ট মহাজাগতিক ধূলিকণা!-কর্নেল সোজা হয়ে বললেন।
ডঃ সোম হাসতে হাসতে বললেন, যেন মহাজাগতিক ঝড়ের একটা বিক্ষিপ্ত প্রবাহ পৃথিবীর আবহমণ্ডলে ঢুকে পড়েছিল সে রাতে!
কর্নেল ব্যস্তভাবে বললেন, এখানকার রেডার স্টেশন কী বলে?
ডঃ সোম একটা ফাইল নিয়ে এলেন। চোখ বুলিয়ে দেখে বললেন, হ্যারেডারে দশ সেকেন্ডের জন্য দক্ষিণ-পশ্চিম আকাশে অজানা কোনও বিমানের সংকেত পাওয়া গিয়েছিল। তারপর সেটা রেডার-স্ক্রিন থেকে সরে যায় ডানদিকে নিচে। এই দেখুন, গতিটা ধনুকের মতো বাঁকা দেখানো হয়েছে।
কর্নেল ফাইলটা নিয়ে কিছুক্ষণ চোখে বুলিয়ে বললেন, বিমানক্ষেত্রে ওইসময় কোনও বিমান নামেনি তাহলে?
—না। ওঁরা বলেছেন, প্রায়ই চীনা বিমান ভারতীয় এলাকায় ঢুকে পড়ে এবং পালিয়ে যায়। এও কোনও উন্নতধরনের চীনা বিমান হওয়া সম্ভব। কারণ ম্যাগনেটিক ফিল্ডে প্রচণ্ড অভিঘাত ধরা পড়েছিল।
আমি বললুম, নবাব মির্জাসায়েব লেকের ধারে তাঁবু থেকে ওদিকে একটা আলো নামতে দেখেছিলেন!
ডঃ সোম চমকে উঠলেন। কর্নেল একটু হেসে বললেন, উফো! আনআইডেন্টিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্ট!
ডঃ সোম হাসতে লাগলেন।—ঠিক তাই! শুধু মির্জাসায়েব কেন, কান্দ্রা এলাকার লোকে প্রায়ই উফো দেখে। এসআরএল থেকে তদন্ত করে দেখা গেছে, কোনওটা আমাদের আবহাওয়াবেলুন, কোনওটা উল্কা, আবার কোনওটা চীনা গুপ্তচর বিমান অথবা কোনও স্পাইং ডিভাইস।
কর্নেল আবার ফাইলে চোখ রেখেছিলেন। বললেন, কান্দ্রা ভ্যালির পশ্চিম পাহাড় কি সত্যি দুর্গম, ডঃ সোম?
—ভীষণ দুর্গম। কোনও মানুষের পক্ষে ওই খাড়া গ্রানাইট দেয়াল বেয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
-প্লেনে?
—প্লেনের পক্ষে আজকাল অসম্ভব তো কিছুই নেই। কিন্তু তার ওধারে চীনের অসংখ্য ঘাঁটি আছে। তাই প্লেনে ওদিকে ঘোরাঘুরি নিরাপদ নয়।
—আপনি ওজরাকের কথা শুনেছেন, ডঃ সোম?
ডঃ সোম হাসতে হাসতে বললেন, ছেলে ভুলোমনা রূপকথা!
—মির্জাসায়েবের পরিচারকের মৃতদেহ ছাই হওয়ার ব্যাপারে কী বক্তব্য?
ডঃ সোম গম্ভীর হয়ে বললেন, নবাববাড়িতে চুরি হওয়ার কথা শুনেছি। ওসব ব্যাপার পুলিশের এক্তিয়ারে পড়ে। তবে এটুকু বলতে পারি, চুরির সঙ্গে একটা বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনাও জড়িত।
—কিন্তু সেজন্য যে প্রচণ্ড ভোল্টেজ দরকার, তা নবাববাড়ির ডোমেস্টিক লাইনে নেই।
—দেখুন কর্নেল, কোনওভাবে যদি আর্থ লাইন নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে অনেকক্ষেত্রে হেভি ভোল্টেজ দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। আবার ট্রান্সফর্মার যে সাপ্লাই লাইনে এসেছে, তার আর্থ লাইন নষ্ট হলে ট্রান্সফর্মারও জ্বলে যায়। নবাববাড়ির পিছনেই একটা ট্রান্সফর্মার আছে। সেটা জ্বলে গিয়েছিল শুনেছি। কাজেই ডেডবডি ছাই হওয়ার মধ্যে অলৌকিক কিছু থাকতে পারে না। অনেক সময় সাপ্লাই লাইনে আর্থ লাইনের গণ্ডগোলের জন্য আলো প্রচণ্ড বাড়ে ও কমে—যাকে বলে ফ্লাকচুয়েশন! একবার আমার কোয়ার্টারেই এমন হয়েছিল। ধোঁয়া বেরুতে শুরু করেছিল। বাল্ব কেটে গিয়েছিল। টি. ভি. ফ্রিজ ইত্যাদি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
কর্নেল উঠলেন।—চলি ডঃ সোম! আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। প্রয়োজনে আবার আপনাকে বিরক্ত করতে আসব।
অবশ্যই আসবেন।—ডঃ সোম করমর্দন করলেন কর্নেলের সঙ্গে তারপর আমার করমর্দন করে বললেন, জয়ন্তবাবু! আমাদের কাজকর্ম সম্পর্কে আশা করি কাগজে লিখবেন।
ডঃ সোমের কাছে বিদায় নিয়ে যখন বেরুলুম, তখন কান্দা উপত্যকায় বিকেলের গোলাপি রোদুর নেমেছে। পাহাড়ের গা কেটে রাস্তা নেমেছে ঘুরে-ঘুরে। মির্জাসায়েবের গাড়িতে আমরা এসেছিলুম। ড্রাইভারের নাম বদর খাঁ। একখানে হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে সে হিন্দিতে বলল, দেখুন সায়েব! ওজরাকের কথা জিজ্ঞেস করছিলেন—ওই দেখুন ওজরাকের দেশ! আজব জাদু দেখুন!
