কর্নেল মুখ তুললেন। ভুরু কুঁচকে বললেন, ওজরাকের পাঞ্জা!
আমি অবাক হয়ে বললুম, ওজরাক! সে আবার কে?
কান্দ্রার নবাব বললেন, ওখানকার লোকে—বিশেষ করে পশুপালক গুজর উপজাতির লোকেরা বংশপরম্পরায় বিশ্বাস করে, কান্দ্রা উপত্যকার পশ্চিমের পাহাড়ে বাস করে ওজরাক নামে এক মায়াবী জাদুকর। তার নাকি উড়ান-খাটোলা বা উড়ন্ত খাটিয়া আছে। তাতে চেপে মাঝে মাঝে ওজরাক বেড়াতে যায় নক্ষত্রের দেশে।
হাসতে হাসতে বললুম, রীতিমতো রূপকথা!
কে কানে!—মির্জাসায়েব বললেন।—ওজরাক নাকি খেয়াল বশে কখনও তার পাহাড়পুরী থেকে নেমে আসে কান্দ্রা উপত্যকায়। যখনই আসে, এই পাঞ্জা ফেলে রেখে যায়। যেন জানিয়ে যায়, আমি এসেছিলুম।
—আপনি বিশ্বাস করেন এসব কথা?
মোটেও করি না। কিন্তু ২৫ মার্চ রাত্রে যখন লেকের ধারে তাঁবুতে ছিলুম, ঝড় ওঠার সময় দূর আকাশ থেকে একটা আলো নেমে আসতে দেখেছিলুম। ভেবেছিলুম, উল্কা কিংবা কান্দ্রা অবজারভেটরির আবহাওয়া বেলুন। কে জানে কী!
—আর কারুর কাছে ওজরাকের পাঞ্জা আছে জানেন? দেখেছেন এমন পাঞ্জা?
—দেখেছি। গুজরদের সর্দার হালাকু একটা পাঞ্জা কুড়িয়ে পেয়েছিল। সেটা যত্ন করে রেখে দিয়েছে। দেখিয়েছিল আমাকে।
কর্নেল চাকতিটা খুঁটিয়ে পরীক্ষা করছিলেন। কান করে শুনি, বিড়বিড় করে বলছেন, ওজরাকের পাঞ্জা….ওজরাকের পাঞ্জা…ওজরাক…ওজরাক…
তারপর সোজা হয়ে বসলেন। মির্জাসাহেব! এগুলো হরফ নয়। প্রতীক চিহ্ন। পাঁচটা করে আঁকা-বাঁকা সাদা রেখে আসলে বজ্রচিহ্ন।
এই বলে উনি হন্তদন্ত উঠে গেলেন বুকশেলফের কাছে। একটা প্রকাণ্ড বই টেনে পাতা ওল্টাতে থাকলেন। তারপর উজ্জ্বল হাসি নিয়ে সোফায় ফিরলেন। বললেন, আমার স্মৃতিশক্তি ক্ষয়ে যাচ্ছে দ্রুত। প্রকৃত বার্ধক্যের লক্ষণ চুলদাড়ি সাদা হওয়া বা বয়স বেশি হওয়াতে নেই। যাই হোক, এই বইটা হল রিচার্ড কেলির লেখা এ শর্ট ওয়াক ইন দি কারাকোরাম অ্যান্ড হিন্দুকুশ। পর্যটক কেলি ১৮৭৯ সালে কাশ্মীর, আফগানিস্তান আর পামির অঞ্চলে কিছুদিন ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। ওই সময় তিনি স্থানীয় লোকেদের কাছে ওজরাকের পাঞ্জার কথা শোনেন। তবে তিনি জিনিসটা দেখেননি।
মির্জাসায়েব জিগ্যেস করলেন, ওজরাকের গল্পও তাহলে শুনে থাকবেন কেলি। লিখেছেন কিছু?
কর্নেল জবাব দিলেন, হ্যাঁ। কেলির মতে, ওটা স্রেফ রূপকথা।
কর্নেলের হাত থেকে পাঞ্জাটা চেয়ে নিলুম। দেখতে দেখতে বললুম, এটাকে পাঞ্জা বলার কারণ কী?
মির্জাসায়েব বললেন, পাঞ্জা এসেছে পাঞ্জ শব্দ থেকে। ফার্সি পাঞ্জ আর সংস্কৃত পঞ্চ একই শব্দ। কিন্তু পাঞ্জা বলতে বোঝায় হাতের পাঁচটা আঙুলের ছাপ। আগের দিনে বাদশারা কোনও হুকুমজারি করলে কিংবা সরকারি চিঠিপত্তর পাঠালে তাতে পাঁচটা আঙুলের টিপছাপ মেরে দিতেন। সই জাল করা যায়। কিন্তু আঙুলের ছাপ জাল করলে ধরা পড়বেই। কারণ প্রত্যেকটি মানুষের আঙুলের ছাপ আলাদা। এই কালো চাকতির পাঁচটা বজ্রচিহ্নকে কান্দ্রার লোকেরা ওজরাকের পাঁচ আঙুলের ছাপ বলে বিশ্বাস করে।
কর্নেল মন্তব্য করলেন, ওজরাকের পাঞ্জায় বজ্রচিহ্ন থাকার অর্থ দাঁড়াচ্ছে, ওজরাক বজ্রদেবতা।
আমার মাথায় চমক খেলে গেল। বললুম, কর্নেল! ওজরাক শব্দটা বজ্রের অপভ্রংশ নয় তো?
তুমি হয়তো ঠিকই বলেছ, জয়ন্ত। কর্নেল বইটা রাখতে গেলেন শেলফে। রেখে এসে ফের বললেন, ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিতদের মতে, ওইসব অঞ্চলের সব ভাষা ও উপভাষার উদ্ভব ঘটেছে একটা পুরনো ভাষা থেকে, যাকে বলা যায় ইন্দো-ইরানি মূল ভাষা। তাই ভারতীয় প্রধান ভাষা সংস্কৃতের সঙ্গে ওদের মিল দেখা যায় এত।
মির্জাসায়েব একটু চঞ্চল হয়ে উঠলেন। বললেন, ভাষাতত্ত্ব থাক, কর্নেলসায়েব! আমার নুরে আলম চুরির ব্যাপারে কী করছেন বলুন!
কর্নেল অভ্যাসমতো চোখ বুজে দাড়িতে আঙুলের চিরুনি টানছিলেন। সেই অবস্থায় বললেন, ইদানীং দেশের বিভিন্ন জাদুঘর বা প্রত্নশালা থেকে বেশ কিছু ঐতিহাসিক রত্ন এবং মূর্তি চুরির হিড়িক পড়ে গেছে। না—কোথাও ওজরাকের পাঞ্জা পড়ে থাকতে দেখা যায়নি। তবে চুরির পদ্ধতি অনেকটা একরকম। অ্যাসিটিলিন প্রায়োগ করেছে চোর। সেই সঙ্গে আরও একটা মিল এখন দেখতে পাচ্ছি। চুরি হয়েছে দুপুর রাতে এবং…
হঠাৎ নড়ে বসলেন কর্নেল। চোখ খুলে বললেন, কী আশ্চর্য!
মির্জাসায়েব বললেন, কী ব্যাপার?
ঝড় বা ঝোড়ো হাওয়া!
-তার মানে?
—প্রত্যেকটি চুরি হয়েছে গভীর রাতে এবং সেই সময় ঝড় বইছিল।
আমি বললুম, ঝড়ের সময় মওকা বুঝেই চোর এসেছিল হয়তো!
কর্নেল উঠে পায়চারি করতে করতে উত্তেজিতভাবে বললেন, শুধু ঝড় নয়, অদ্ভুত সব শব্দ। মির্জাসায়েব বলছিলেন, দারোয়ান যেন ঘুঙুরের শব্দ শুনেছে। প্রত্যেকটি চুরির রিপোর্টে এর উল্লেখ আছে। রক্ষীরা বলছে, যেন কোথায় ঝমর ঝম শব্দে ঘুঙুর বেঁধে কেউ নাচছিল।
আমি ও কান্দ্রার নবাব নিঃশব্দে দেখাদেখি করছিলুম পরস্পরের দিকে। বলার কিছু খুঁজে পাচ্ছিলাম না।
ওজরাকের ইন্দ্রজাল
কান্দ্রা উপত্যকার চারিদিকেই উঁচু সব পাহাড়। পূর্বদিকে একটা গিরিবর্ক্স আছে, যার নাম হায়দার পাস, কান্দ্রার নবাবের পূর্বপুরুষের নামে। স্থলপথে কান্দ্রায় ঢুকতে হলে হায়দার পাস হয়ে যেতে হয়। কিন্তু শীতের দু-তিনটে মাস ওই গিরিবর্ক্স বরফ জমে বন্ধ হয়ে যায়। তবে এ যুগে বিমানের দৌলতে কান্দ্রা যাতায়াতে আগের মতো বাধাবিপত্তি নেই। বারোমাসই যাতায়াত চলে শীতের সময়টা বিমানে বাকি সময় মোটর গাড়িতে।
