মির্জাসায়েব অমায়িক এবং খেয়ালি প্রকৃতির মানুষ। কর্নেলের মতোই তাগড়াই ফর্সা, চেহারা। তবে কর্নেলের মুখে সাদা দাড়ি এবং এবং মাথায় প্রশস্ত টাক, মির্জাসাহেবের মুখে শুধু বিশাল গোঁফ, মাথা ভর্তি ঝাকড়া মাকড়া চুল। বয়সে দুজনেই অবশ্য ষাটের ওধারে।
মির্জাসায়েব সোফায় বসেই ঘোষণা করলেন, আপনাদের নিতে এলুম।-বলে আমার দিকে ঘুরলেন।-হ্যাঁ, আপনাকেও। কারণ ভেবে দেখলুম, একজন সাংবাদিকেরও এসব বিষয়ে জড়িত থাকা উচিত।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, কীসব বিষয়ে বলুন তো?
-বলছি। বলে হঠাৎ মির্জাসাহেব মাথাটা জোরে নাড়া দিলেন। বললেন, আরে কী মুশকিল!
-কী হল মির্জাসাহেব?
—হঠাৎ মাথার ভিতর কী যেন–
—বেহালার বাজনা নয় তো?—বলে উঠলুম সঙ্গে সঙ্গে।
মির্জাসাহেব মাথাটা আবার ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, সর্বনাশ! বেহালার বাজনার মতো মাথার ভিতর এ কী বিশ্রী উপদ্রব শুরু হল!
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, ফিডলার ক্র্যাব। ওই একোয়ারিয়ামে বসে বেহালা বাজাচ্ছে।
তাই বলুন! -কান্দ্রার নবাব হা হা করে অট্টহাসি হাসতে লাগলেন।…।
ঘুঙুরপরা চোর!
কফিতে চুমুক দিয়ে মির্জাসাহেব গম্ভীর হয়ে বললেন, এখনও লোকে আমাকে মির্জানবাব বলে ডাকে। খাতিরও করে। কিন্তু নবাবি তো কবে ঘুচে গেছে। প্রিভিপার্স বাবদ বার্ষিক বৃত্তিও সরকার বন্ধ করে দিয়েছে। সেজন্য অবশ্য আমি মোটেই দুঃখিত নই। ধনসম্পদে আমার কোনওদিনও রুচি ছিল না। কিন্তু জিনিসটা আমার পূর্বপুরুষের সংগৃহীত সম্পদ। বাজারে নিশ্চয় ওটার অনেক টাকা দাম। দামের জন্য নয়, একটা পারিবারিক ও বংশানুক্রম পবিত্র স্মৃতির প্রতীক বলেই আমার কষ্ট হচ্ছে।
কর্নেল বললেন, জিনিসটা বলতে কোনও রত্নের কথাই হয়তো বলছেন। সেটা কি চুরি হয়ে গেছে?
কান্দ্রার নবাব নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, হ্যাঁ। খুব রহস্যময় চুরি।
–কবে চুরি গেছে?
—গত ২৫ মার্চ রাত্রে। আমি তখন কান্দ্রা লেকের ধারে তাঁবুতে ছিলুম। খবর পেয়েছিলুম হিন্দুকুশ থেকে এক ঝাঁক ভরত পাখি এসেছে। দুদিন ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছিলুম। ২৬ মার্চ সকালে খবর পেলুম নুরে আলম চুরি গেছে। নুরে আলম কথাটার মানে ব্রহ্মাণ্ডের জ্যোতি। এমন নামের কারণও ছিল। ওটা একটা অত্যাশ্চর্য রত্ন। বিস্তর জহুরিকে দেখানো হয়েছে। কেউ বলতে পারেনি ওটা কী। কালো রঙের পাথরের মতো দেখতে। অথচ আলো পড়লেই নীল লাল সাদা সবুজ হরেক রঙের রশ্মি ঠিকরে পড়ত আর সেই রশ্মিগুলো চর্কির মতো ঘুরত। একবার এক ধাতুবিজ্ঞানীকে দেখিয়েছিলুম। তিনিও চিনতে পারেননি ওটা কী ধাতু।
—হুঁ। কীভাবে চুরি গেছে?
—কান্দ্রা উপত্যকায় এই সময়টা মাঝরাতে পাহাড় থেকে একটা ঝোড়ো হাওয়া নেমে আসে। গ্রীষ্ম অব্দি এটা দেখা যায়। ২৫ মার্চ রাতে ঝড়টা যখন আসে, হঠাৎ বাড়ির সব আলো নিভে গিয়েছিল। ঝড়টা মিনিট কুড়ি ছিল। ওই সময় দারোয়ান একটা অদ্ভুত শব্দ শোনে। শব্দটা কতকটা ঘুঙুরের মতো। কেউ যেন পায়ে অসংখ্য ঘুঙুর বেঁধে ঝমঝম করে হেঁটে বেড়াচ্ছে। বাবুর্চি কিসমত খাঁ বলেছে, সে অন্যরকম শব্দ শুনেছে। শিসের শব্দের মতো। তারপর
—আগে বলুন, নুরে আলম ছিল কোথায়?
—আমার বেডরুমে দেয়ালে আঁটা আয়রনচেস্টের ভিতর। চোর সেটার একটা পাল্লা সম্ভবত গ্যাসের আগুনে—তার মানে, অ্যাসিটিলিনে গলিয়ে তরল করেছে। তারপর জিনিসটা হাতিয়েছে।
–দরজা বন্ধ ছিল বাইরে থেকে?
—নিশ্চয় ছিল। তালা গলিয়ে ফেলেছে। কিন্তু ভয়ঙ্কর ব্যাপার হল, দরজার বাইরে আমার এক পরিচারক কুদরত খায়ের লাশ পড়ে ছিল। নিশ্চয় সে টের পেয়ে ছুটে গিয়েছিল। কিন্তু তাজ্জব ব্যাপার, তার লাশ একেবারে পুড়ে ছাই! একদলা ছাই তুলে কবর দেওয়া হয়েছে।
—ছাই! কর্নেল অবাক হয়ে বললেন।পোস্টমর্টেম হয়নি?
-কীভাবে হবে? তবে একমুঠো ছাই পুলিশ দিল্লির ফরেন্সিক এক্সপার্টদের কাছে পাঠিয়েছিল, তাদের মতে, প্রচণ্ড ভোল্টের বিদ্যুৎ বয়ে গেছে কুদরত খাঁর শরীরে।
–বাজ পড়ে মারা গেলেও কিন্তু লাশ পুড়ে ছাই হয় না।
—হ্যাঁ। তাছাড়া ঘরের ভিতর বাজ ঢুকবে কীভাবে? বাজের তো ঠ্যাং গজায়নি।
আমি বললুম, শ্মশানের বৈদ্যুতিক চুল্লিতে মড়া পুড়িয়ে ছাই করা হয়। নিশ্চয় অতটা ভোল্টেজ হলে কুদরত খাঁর দেহ ছাই হত না!
মির্জানবাব কফি শেষ করে বললেন, তাহলেই বুঝুন কেমন চোর!
কর্নেল একটু হেসে বললেন, বৈদ্যুতিক চোর!
মির্জাসায়েবের মুখে অবশ্য হাসি ফুটল না। উনি জ্যাকেটের পকেটে হাত ভরে কিছু বের করেছিলেন। ভাবলুম সিগারেটের প্যাকেট বের করছেন। কিন্তু তার বদলে বের করলেন কাগজে জড়ানো একটা চাকতির মতো জিনিস। মোড়ক খুললে দেখলুম, জিনিসটা একটা কালো রঙের চাকতি। আয়তনে রুপোর টাকার চেয়ে সামান্য বড়। চাকতিটার দুপিঠেই সাদা আঁকজোক।
সেটা কর্নেলের হাতে দিয়ে কান্দ্রার নবাব বললেন, এই জিনিসটা কুদরত খায়ের লাশের কাছে। পড়েছিল। ফরেন্সিক টেস্ট করানো হয়েছে। ওঁরা বলতে পারেননি এটা কোনও ধাতু না পাথর। কোনও জৈব পদার্থও নয়। মোট কথা, এটা বিজ্ঞানীদের এ পর্যন্ত জানা কোনও পদার্থের মধ্যে পড়ে না।
কর্নেল উঠে গিয়ে তার আতস কাচ নিয়ে এলেন। তারপর পরীক্ষা করতে করতে বললেন, উঁহু—এই আঁকজোকগুলো ফার্সি নয়। কী ভাষা কে জানে।
মির্জাসায়েব বললেন, কর্নেল, এই জিনিসটাকে কান্দ্রার লোকেরা বলে ওজরাকের পাঞ্জা।
