তারপর কর্নেলের ডাক শুনতে পেলুম।জয়ন্ত কি ইদানীং বক্সিং শিখতে শুরু করেছ? আমার মনে হয়, নিজের মাথার চেয়ে এ ব্যাপারে বালি ভর্তি একটা বস্তাই উপযুক্ত জিনিস।
বোবা ধরা গলায় বললুম, বক্সিং নয়, বক্সিং নয়। মাথার ভিতর কী একটা কেলেঙ্কারি।
—অ্যাসপিরিন বড়ি খাও!
–না, না। বেহালার বাজনা। ওঃ! আমার মাথার ভিতর কেউ বেহালা বাজাচ্ছে!
কর্নেল আসতে আসতে থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। পর্দার ফাঁকে ষষ্ঠীচরণের মুণ্ডু দেখা যাচ্ছিল। সে বলে উঠল, বাবামশাইকেও ধরবে বেহালা রোগে। পেখমে আমাকে ধরল। তাপরে কাগুজে দাদাবাবুকে ধরল। প্রিতিকার না করলে আপনাকেও ধরবে। তখন বুঝবেন কী কষ্ট!
কর্নেল ঘুরে চোখ কটমটিয়ে তাকালেন ওর দিকে। ষষ্ঠী মুণ্ডু সরিয়ে নিল পর্দার আড়ালে। তারপর কর্নেল আমার দিকে ঘুরে হো হো করে হেসে উঠলেন।
ক্ষুব্ধ হয়ে বললুম, আপনি হাসছেন! পারছেন হাসতে? কোথায় ডাক্তার ডাকার ব্যবস্থা করবেন, তা নয়, মজা দেখছেন। ঠিক আছে। আমি ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি।
উঠে দাঁড়াতেই কর্নেল এগিয়ে এসে আমার কাঁধে থাবা হাঁকড়ালেন। তারপর হিড়হিড় করে টেনে একটা একোয়ারিয়ামের কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন, ওটা কী?
হকচকিয়ে গিয়েছিলুম। একোয়ারিয়ামের ভিতর একটি কালচে বাদামি রঙের জলচর জীব রয়েছে। দেখতে দেখতে বললুম, কাঁকড়া বলে মনে হচ্ছে।
—এই কাঁকড়াটির সঙ্গে তোমার এবং ষষ্ঠীর বেহালা-রোগের সম্পর্ক আছে।
—তার মানে? কর্নেল আবার অট্টহাসি হেসে বললেন, দেখতে পাচ্ছ? কাঁকড়ার সামনে একটা লম্বাটে ঠ্যাং মুখের কাছে বেঁকে তিরতির করে কাঁপছে। জলে বুজকুড়ি ওঠাও তো দেখতে পাচ্ছ।
—পাচ্ছি। কিন্তু—
—একে বলে ফিডলার ক্র্যাব। বেহালা-বাজিয়ে কাঁকড়া।
সঙ্গে সঙ্গে ঘিলু পরিষ্কার হয়ে গেল। আমিও হো হো করে হাসতে লাগলুম। পর্দার আড়ালে ষষ্ঠীরও খিক খিক হাসি শোনা গেল। ওই হতচ্ছাড়া কাঁকড়াটাই তাহলে বেহালা বাজাচ্ছে এমন সুরে!
কর্নেল একোয়ারিয়ামের দিকে ঝুঁকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললেন, লক্ষ্য করো ডার্লিং, ফিডলার কাঁকড়ার দুপাশের দুটো সাঁড়াশির মতো হাত কিন্তু একই গড়নের নয়। একটা ছোট্ট, অন্যটা বড়। এ এক সৃষ্টিছাড়া জীব। জীবজগতে যেসব প্রাণীর হাত আছে, তাদের দুটো হাতের গড়ন ও আয়তন একইরকম। শুধু ফিলডার কাঁকড়া ব্যতিক্রম। এক অদ্ভুত বৈষম্যের প্রতীক।
আমরা সোফায় এসে বসলুম। কর্নেলের ব্রেকফাস্ট দিয়ে গেল। কর্নেল আমাকে হাত লাগাতে ইশারা করলেন। বললুম, ধন্যবাদ। জব্বর ব্রেকফাস্ট সেরেই বেরিয়েছি।
খেতে খেতে কর্নেল আবার ফিডলার কাঁকড়া নিয়ে পড়লেন।—ফিডলার কাঁকড়াকে অদ্ভুত বৈষম্যের প্রতীক বলেছি। কেন বলেছি, তার ব্যাখ্যা করতে হলে পদার্থ বিজ্ঞানের ল অফ প্যারিটি বা সাদৃশ্যের নিয়ম সম্পর্কে মোটামুটি কিছু ধারণা দরকার।
বেগতিক দেখে বললুম, কী দরকার আর? বেহালা-রোগ তো সেরে গেছে।
কর্নেল গ্রাহ্য করলেন না আমার কথা। বললেন, জয়ন্ত, পদার্থবিজ্ঞানীরা দেখছেন, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে প্রকৃতি যা কিছু সৃষ্টি করেছে, সবই যেন জোড়ায়-জোড়ায় করেছে। একটা অপরটার ঠিক উল্টো। উপমা দিয়ে বলছি—যেমন কিনা, তোমার ডানহাত আর বাঁহাত। সাদৃশ্যের নিয়ম অনুসারে বলা যায়, প্রকৃতি কিছু জিনিস যেন ডানহাতের পাকে—তকলিতে পাক ঘুরিয়ে সুতো কাটার মতো আর কি, এবং কিছু জিনিস বাঁহাতের পাকে তৈরি করেছে। ইংরেজিতে একে বলে, নেচারস রাইটহ্যান্ড টুইস্ট অ্যান্ড লেফটহ্যান্ড টুইস্ট। একটা অন্যটার উল্টো—যেমন দর্পণবিম্ব। দেখা যাবে, সব অসমানুপাতিক গড়নের জিনিসের দর্পণবিম্ব একেবারে উল্টো। যেমন আয়নার সামনে দাঁড়াও। দেখবে তোমার ডানহাত বাঁহাত হয়ে গেছে এবং বাঁহাত হয়ে গেছে ডানহাত। কিন্তু সমানুপাতিক গড়নের জিনিস—ধর একটা গ্লাস, আয়নার ভিতর একই রকম দেখাবে। উল্টো দেখাবে না। মজাটা হল, মানুষের হাত বা জলের গ্লাস এসব উদাহরণ নেহাত স্থূল উপমা। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে অনেক অসমানুপাতিক আণবিক গড়নের জিনিস পরীক্ষা করে দেখা গেছে এরকম দুটো জিনিস বাইরে-বাইরে দেখতে একই রকম, অথচ আণবিক গড়নে পরস্পর উল্টো। একটা যেন অপরটার দর্পণবিম্ব। ইংরেজিতে বলা হয়, মিরর ইমেজ। কিন্তু এখানেই বিপদ। কোনও জিনিস যদি তার ওই মিরর-ইমেজের মতো জিনিসের—তার মানে উল্টোসত্তার সংস্পর্শে আসে, সঙ্গে সঙ্গে তা ধ্বংস হয়ে যাবে। ধ্বংসটা কী রকম তারাও উপমা দিই। ধর, একটা লাঠির গায়ে একটা দড়ি ডানপাকে ঘুরিয়ে জড়িয়ে রেখেছ। কিন্তু দড়িটা বাঁপাকে ঘোরালেই কী ঘটবে? দড়ি ও ছড়ি আলাদা হয়ে যাবে। এই হল নেচারস রাইটহ্যান্ড টুইস্ট আর লেফটহ্যান্ড টুইস্টের রহস্য।
কান ভো ভো করছিল। কর্নেল জলের গ্লাস তুলে নিয়ে জল খেতে গিয়ে হঠাৎ থামলে আবার শুরু করবেন ভেবে দ্রুত বললুম, বুঝেছি আপনি আসলে ম্যাটার অ্যান্টিম্যাটারের কথা বলছেন।
কর্নেল জল খেয়ে গ্লাসটা রেখেছেন, এমন সময় কলিং বেল বাজল। তারপর ষষ্ঠী এসে ভিজিটিং কার্ড দিল। কার্ডটাতে চোখ বুলিয়ে কর্নেল যেন চঞ্চল হয়ে উঠলেন। হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে গেলেন দরজার দিকে।
কর্নেলের সঙ্গে যিনি ঢুকলেন, তাকে দেখে আমিও চঞ্চল হয়ে উঠলুম। কান্দ্রার নবাব মির্জা আজমল খানের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল গত ডিসেম্বরে দিল্লিতে ওয়ার্লর্ড ওয়াইল্ড লাইফ পোকেটশন সোসাইটির সম্মেলনে। ভদ্রলোক একজন প্রখ্যাত ওরিন্থােলজিস্ট অর্থাৎ পক্ষিবিজ্ঞানী। বোম্বের সালিম আলির ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সালিমসায়েবও সেই সম্মেলনে এসেছিলেন।
