কর্নেল সংক্ষেপে আগাগোড়া সব ঘটনা বললেন। ডাঃ পট্টনায়ক আরসিএস যন্ত্রটা কোথায় পেয়েছিলেন, তাও বললেন। ডঃ দাস খুব হাসতে লাগলেন শুনে। শেষে গম্ভীর হয়ে বললেন, কিন্তু মিঃ রায়ের মামা প্রাইভেট ডিটেকটিভ ভদ্রলোকের কথা শুনে আমার ভয় হচ্ছে। গোপেশ্বর ডাকু সাংঘাতিক লোক। ওকে কিছু বিশ্বাস নেই। তবে এটুকু আশ্বাস দিতে পারি, ঝরনার ধারে রাত দশটায় ব্যাটা আসবে বলেছে তো? তখনই আমি ওকে ধরতে রোবট পাঠিয়ে দেব। রোবটের টিপুনি খেয়ে সে কবুল করবে মিঃ হালদারকে কোথায় আটকে রেখেছে। তারপর ব্যাটাকে পুলিশের কাছে জিম্মা দেবেন মিঃ রায়।
কর্নেল বললেন, একটা কথা ডঃ দাস। পাখিটাকে অমন কথা কেন শিখিয়েছিলেন?
বিজ্ঞানী মুচকি হেসে বললেন, বিংকারাম যদি আমাকে সত্যি খুন করে, তাহলে পাখিটা সাক্ষ্য দিতে পারবে, এই ভেবেই। ওকে আমি বিশ্বাস করতে পারছিলুম না যে।
আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে এবং ল্যাবরেটরি দেখে আমরা বিদায় নিলুম। এবার আমাদের উল্টো দিকে ঝরনার ধারের গোপন দরজা খুলে বের করে দিলেন ডঃ দাস। তারপর আমাকে চমকে দেওয়ার জন্য আবার হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেলেন, বুঝলুম হালদারমশাই তাহলে ঠিকই দেখেছিলেন।
বাংলোয় ফিরে আমরা আবার অবাক। হালদারমশাই জলজ্যান্ত বসে রয়েছেন। শুধু মাথায় একটা ব্যান্ডেজ। বললেন, আমার নাম কে. কে. হালদার। আমাকে আটকে রাখবে ওই পুঁচকে দুটো লোক? রেলইয়ার্ডে সাধু আর তার চেলাকে ফলো করছিলুম। হঠাৎ ওরা মালগাড়ির আড়ালে লুকিয়ে গেল। আসলে ওত পেতে বসেছিল, বুঝলেন? যেই গেছি, লাফিয়ে পড়েছে। শেষে মাথায় ডাণ্ডার বাড়ি। জ্ঞান হলে দেখি, মালগাড়ির ওয়াগনে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছি। গায়ে জোর আসতে দেরি হচ্ছিল, তাই। নইলে কখন বাঁধন কেটে বেরিয়ে আসতুম। যাক গে, এবার আপনাদের খবর বলুন, কর্নেল স্যার? হালদারমশাই মাথার ব্যান্ডেজে হাত বুলোতে থাকলেন।
কর্নেল বললেন, আপাতত খবর হল, আজ রাত দশটায় আপনার সেই সাধু ওরফে গোপেশ্বর আর চেলা ভগিয়া ঝরনার ধারে রোবটের হাতে বন্দি হবে।
হালদারমশাই বললেন, রোবট? যাঃ! খি-খি করে বেজায় হাসতে লাগলেন গোয়েন্দা কৃতান্ত হালদার।
১.২৭ ওজরাকের পাঞ্জা
কালো পাথরের মতো দেখতে জিনিসটাকে…আলো পড়লেই ঠিকরে পড়ত হরেক রশ্মি…চর্কির মতো ঘুরত রশ্মিগুলো…ধাতু বিজ্ঞানীও বলতে পারেননি ধাতুটা কী! রহস্যময় এই বস্তুটাই চুরি গেল আরও রহস্যজনকভাবে রাতদুপুরে কান্দ্রা উপত্যকায়…পাহাড় থেকে নেমে এল ঝোড়ো হাওয়া…শোনা গেল ঘুঙুরের শব্দ…নিভে গেল সব আলো! তারপর?
বেহালা রোগ
সেদিন সকালে কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের ডেরায় গিয়ে তার প্রিয় ভৃত্য ষষ্ঠীচরণকে কেমন যেন মনমরা লক্ষ্য করছিলুম। কর্নেল তখনও ছাদে ক্যাকটাস এবং অর্কিডের সেবায় মশগুল। এসব সময় অবস্থা মৌনীবাবাদের মতো! তাই নিচের ড্রইংরুমে অপেক্ষা করছিলুম। ষষ্ঠী যথারীতি কফি দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মুখটা বেজায় গম্ভীর। চেহারা উস্কোখুস্কো। চোখের তলায় যেন কালি। জিগ্যেস করেছিলুম, অসুখ-বিসুখ নাকি?
ষষ্ঠী শুধু মাথা নেড়েছিল। এরকম মাথা নাড়ার মানে হ্যাঁ বা না যে কোনওটাই হতে পারে।
কিছুক্ষণ পরে কফির পেয়ালা নিতে এল সে। তখন বললুম, তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন ষষ্ঠী?
ষষ্ঠীচরণ দাঁড়িয়ে মুখ নামিয়ে আঙুল খুঁটতে থাকল। তারপর গলার ভিতর বলল, ঠিক বুঝতে পারছি না দাদাবাবু!
—আহা! তোমার হয়েছে কী বলবে তো?
এবার ষষ্ঠী নিজের মাথাটা দুহাতে আঁকড়ে ধরে বলল, আমি হয়তো আর বাঁচব না দাদাবাবু। আমার মাথার ভিতর কী একটা হয়েছে দুদিন থেকে। বাবামশাইকে বললুম তো হেসে উড়িয়ে দিলেন। ইদিকে আমার মাথার ভিতর খালি বেহালা বাজছে!
অবাক হয়ে বললুম, বেহালা বাজছে? সে আবার কী?
আজ্ঞে হ্যাঁ। এই তো এখনও বাজছে।ষষ্ঠী করুণ মুখে বলল।মাঝে মাঝে বাজছে, আবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রথমে ভেবেছিলুম কেউ কোথাও বেহালার বাজনা শিখছে। এ বাড়ির সব ফেলাট, আশেপাশের বাড়ির সব ফেলাট, খুব খোঁজাখুঁজি করেছি। শেষে বুঝতে পেরেছি আমার খুলির ভিতর বাজছে। আমার বড় কষ্ট দাদাবাবু!
হঠাৎ চমকে উঠলুম। এ কী! আমার মাথার ভিতরও যেন বেহালা বাজছে। এতক্ষণ খেয়াল করিনি। এবার স্পষ্ট বুঝতে পারছি, অত্যন্ত ক্ষীণ সুরে ঝিঝিপোকার ডাকের মতো কো কো করে বেহালা বাজছে। ষষ্ঠী আমার মুখের অবস্থা দেখে কী বুঝল কে জানে, ফেঁস করে শ্বাস ছেড়ে কফির পাত্র নিয়ে চলে গেল।
বড় ভাবনায় পড়ে গেলুম। কলকাতায় একেক সময় একেক রকম উদ্ভুট্টে রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। এই বেহালা-রোগ নিশ্চয় সংক্রামক। ষষ্ঠীর হাতে কফি খাওয়ামাত্র আমাকে ধরেছে। দুহাতে মাথা আঁকড়ে ধরে জোরে ঝাকুনি দিলুম। মাথায় বারকয়েক গাঁট্টা মারলুম। তখন হঠাৎ অতিসূক্ষ্ম বেহালার সুরটা থেমে গেল।
কিন্তু একটু পরেই ফের শুরু হয়ে গেল মারাত্মক সেই বাজনা। কে কে কে কেঁ—অস্বস্তিকর হতচ্ছাড়া একটা সুর। আতঙ্কে আমার গলা শুকিয়ে গেল। এই সময় কোনার দিকে সিড়িতে আমার প্রাজ্ঞ বন্ধুর পায়ের শব্দ শোনা গেল। আর্তনাদের সুরে চেঁচিয়ে উঠলুম, কর্নেল! কর্নেল।
কর্নেলের পরনে গার্ডেনিংয়ের পোশাক। হাতে খুরপি এবং সাদা দাড়িতে শুকনো পাতা। আমার দিকে দৃকপাত না করে সটান বাথরুমে ঢুকলেন। আমি মরিয়া হয়ে আবার মাথায় গাঁট্টা মারতে থাকলুম। বাজনাটা যেন কর্নেল আসার পরই বেড়ে চলেছে। মনে হচ্ছে একটা অদৃশ্য বেহালার ছড় ধারালো করাতের মতো আমার ঘিলুকে ফালাফালা করছে।
