লালপাথরটা কিন্তু তত ওজনদার নয়। একটু ঠেলতেই সরে গেল। ওটা যত সরল, তত নিচের দিকে একটা গর্ত দেখা যেতে থাকল। কর্নেল বললেন, এই তো দেখছি সুড়ঙ্গের মুখ। একে একে নামা যাক। টর্চ জ্বালতে হবে মনে হচ্ছে।
প্রথমে কর্নেল, তারপর ডঃ পট্টনায়ক, তারপর আমি এবং সব শেষে প্রদীপবাবু গর্তে নামলেন। ধাপে ধাপে সিড়ি একটু নেমে যাওয়ার পরে উপরের দিকে উঠে গেছে। কেমন একটা ভ্যাপসা গন্ধ টের পাচ্ছি। টর্চের আলোয় কালো পাথরের ধাপ ক্রমশ উঠছে তো উঠছেই। আমরাও উঠছি। অনেকখানি ওঠার পর কিছুটা করিডোরের মতো সমতল জায়গা। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলুম, সামনে আলোর ছটা বেরিয়ে আসছে। কর্নেল থমকে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আবার পা বাড়ালেন। করিডোরের মতো জায়গাটা প্রায় দুমিটার চওড়া। আলোটা আসছে বাঁদিক থেকে। করিডোর বেঁকে গিয়ে আবার সিঁড়ির মুখে শেষ হয়েছে। সিঁড়ির মাথায় হলুদ একবিন্দু আলো। ঠিক আলো নয়। অদ্ভুত একটা রশ্মি যেন। কর্নেল ধাপে পা রেখেছেন, অমনি গমগমে গলায় কেউ বলে উঠল, সাবধান গোপেশ্বর! আর এক পা এগোনোর চেষ্টা কোরো না। বুঝতে পেরেছি, তুমি এতদিনে আমার ল্যাবরেটরিতে ঢোকার নকশা পেয়েছ। আমার দুর্ভাগ্য গোপেশ্বর, পাখিটা শয়তান বংকারাম চুরি করে নিয়ে পালিয়েছিল। তাছাড়া আমার আরসিএস যন্ত্রটাও চুরি করেছিল ডাকাত হতচ্ছাড়া। ওকে খুন করে তুমি সব হাতিয়েছ আমি জানতুম। কাল দুপুরে এবং আজ সকালে আমার স্পেসশিপ দু-দুবার ছিটকে বেরিয়ে গিয়েছিল। আমি জানি, তুমি আরসিএস তো হাতিয়েছ। উপরন্তু ওটা ব্যবহার করার কৌশলও জেনে গেছ। শোনো গোপেশ্বর, আমি তোমাকে ঢুকতে দেব একটা শর্তে।
কর্নেল বলে উঠলেন, বলো গঙ্গারাম!
তোমার বাঁ দিকে একটা ঘুলঘুলি দেখতে পাচ্ছ?
পাচ্ছি।
নকশা আর, আরসিএস যন্ত্রটা ওখানে দিয়ে ঢুকিয়ে দাও।
তাহলে ঢুকতে দেবে তো গঙ্গারাম?
দেব।
দেখলুম ডঃ পট্টনায়ক কর্নেলকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কর্নেল গ্রাহ্য করলেন না ওঁকে। নকশা আর সেই রিমোট কন্ট্রোল যন্ত্র ঘুলঘুলির ভিতর ফেলে দিলেন। অমনি হা-হা হাসির শব্দ এসে আমাদের কানে ধাক্কা দিল। হলদে আলোর ফুটকিটা নিভে গেল। নেপথ্য থেকে নিষ্ঠুর কথা গমগম করে ভেসে এল, গোপেশ্বর, বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি মৃত্যু। মৃত্যুর জন্য তৈরি হও।
কর্নেল চিৎকার করে বললেন, ডঃ দাস, আমি গোপেশ্বর নই। কর্নেল নীলাদ্রি সরকার! আমার সঙ্গে আছেন আপনার পুরনো বন্ধু ডঃ সীতাকান্ত পট্টনায়ক, সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরি এবং এই জঙ্গলের কনজারভেটর প্রদীপ রায়। আপনি আগে দেখুন, আমরা কারা। তারপর শাস্তি দেবেন।
ডঃ পট্টনায়কও জোরে চেঁচিয়ে বললেন, জি আর ডি! আমি পট্টনায়ক।
অন্তত এক মিনিট পরে কথা ভেসে এল, গোপেশ্বর কোথায়?
আমরা জানি না ডঃ দাস, কর্নেল বললেন। দয়া করে আমাদের ঢুকতে দিন। সব বলব।
আপনারা আসুন।
আবার হলুদ আলোর ফুটকি দেখতে পেলুম। সিঁড়ি বেয়ে আমরা উঠতে থাকলুম। শেষ ধাপের পর আবার একটা করিডোর। বাঁ দিকে একটা কালো দরজা খুলে গেল। একে একে ভিতরে ঢুকলুম। হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম। বিশাল এক ল্যাবরেটরি। একপাশে রকেটের মতো দেখতে এটা প্রকাণ্ড সাদা চোঙা ছাদ ফুঁড়ে চলে গেছে। সেখানে রেলিং ঘেরা। অদ্ভুত শব্দ হচ্ছে নানারকম। শোঁ শোঁ….ব্লপ ব্লিপ…কিটকিট….বিচিত্র সব শব্দ। কিন্তু কোনও লোক দেখতে পাচ্ছি না।
ডঃ পট্টনায়ক বললেন, জি আর ডি, কোথায় তুমি?
অমনি সামনে একটু তাকাতে চোখ-ধাঁধানো নীল আলো খেলে গেল এক সেকেন্ডের জন্য। তারপর দেখি, সেখানে লম্বা রোগা ফর্সা, একমাথা সাদা চুল, গেরুয়া আলখাল্লার মতো পোশাক পরা এক সৌম্য চেহারা প্রৌঢ় দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে মিটিমিটি হাসি। কী পট্টনায়ক, অলৌকিক কীর্তি ভাবছ নাকি? তোমাকে বলেছিলুম পট্টনায়ক, যে-কোনও পদার্থকে ভরহীন ফোটনে পরিণত করা যায় এবং তা চর্মচক্ষে অদৃশ্য মনে হবে। তুমি বলেছিলে, ফোটনে পরিণত হলে তা আলোর সমান গতিবেগ পাবে এবং তাই বিশ্বজগতে ছড়িয়ে পড়বে। ঠিক ঠিক। কিন্তু লেসার রশ্মি দিয়ে ফ্রেমের মতো ঘিরে রাখতে পারলে তা ছড়াবে না এবং ফোটনগুলোকে আবার আগের মতো ভরযুক্ত পদার্থ-কণিকায় রূপান্তরিত করা যাবে। এখন স্বচক্ষে দেখলে তো পট্টনায়ক, সেই অসম্ভব আমি সম্ভব করেছি?
দেখলুম ভাই! তোমার কোনও তুলনা হয় না।
বিজ্ঞানী গঙ্গারাম দাস কর্নেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, একসময় খবরের কাগজ পড়তুম। তখন আপনার অনেক কীর্তিকলাপ কাগজে পড়েছি। বসুন, বসুন। আপনারা আমার সম্মানিত অতিথি।
আমরা বসলুম। ডঃ দাস বিশাল টেবিলের ওধারে বসলেন। তারপর বোতাম টিপলেন। তক্ষুনি খটখট শব্দে একটা ছোট্ট মানুষের গড়নের রোবট এসে আমাদের সামনে দাঁড়াল। ডাঃ দাস বললেন, চা কফি কোল্ড ড্রিংক্স—যা খেতে চান, সেই বোতাম টিপুন। পেয়ে যাবেন।
কর্নেল কফির বোতাম টিপলেন। খট করে একটা কাগুজে পেয়ালা পড়ল রোবটের পেটের নিচের খোঁদলে। তারপর গড়গড় করে কফি বেরিয়ে পেয়ালা ভর্তি হয়ে গেল।
আমরা সবাই কফিই নিলুম। তারপর রোবটটা চলে গেল। ডঃ পট্টনায়ক বললেন, পাহাড় কেটে এই ল্যাবরেটরি বানিয়েছ দেখে অবাক লাগছে জি আর ডি! এ যে দৈত্যের কীর্তি! কী করে বানালে?
জি আর ডি বললেন, আমি তো বানাইনি, ভাই। এটা বংকারামের পূর্বপুরুষের তৈরি গোপন দুর্গ। এটার জন্যই ওর সঙ্গে ভাব করেছিলুম। ওকে মিথ্যা লোভ দেখিয়েছিলুম, দুর্গের ভিতর ওর পূর্বপুরুষের গুপ্তধন আছে। উদ্ধার করে দেব। কিন্তু ও চিরকালের বজ্জাত। যখন বুঝল আমি ল্যাবরেটরি বানাচ্ছি, তখন থেকে বদমাইশি শুরু করল। গোপেশ্বর নামে ওর এক ডাকাত-স্যাঙাত আছে। তাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করল শয়তানটা। যাকগে, গোপেশ্বর ওকে খুন করেছে। তবু আরসিএস এবং নকশাটা হাতাতে পারেনি।
