ডঃ পট্টনায়ক বললেন, হ্যাঁ–ব্লুপ্রিন্ট বলতে পারেন। নিশ্চয় গোপনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্লুপ্রিন্ট। তা না হলে পাখির পায়ে রুপোর আংটার মধ্যে রোল করে লুকিয়ে রাখা হবে কেন? এটা কিন্তু সাধারণ কাগজ নয়। গুপ্তচররা ব্যবহার করে এগুলো। এক বর্গফুট কাগজও রোল করে নখের মধ্যে লুকিয়ে রাখা যায়। এবার বোঝা গেল, পাখিটা পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। ফাঁদে আটকে আদিবাসী ছেলেরা ওকে ধরে। হালদারমশাই কিনে নিয়ে যান। তার বাড়ি থেকে পাখিটা উদ্ধার করে আনার সময় আবার হাত ফসকে পালিয়েছিল। পালাতে গিয়ে বিদ্যুতের শক খেয়ে শেষে মারা পড়ে।
কর্নেল বললেন, মাঠে পড়ে ছিল নাকি পাখিটা। ওখানে বিদ্যুতের তার গেছে দেখছি।
ডি সি বিদ্যুতের শকে ছিটকে পড়াই সম্ভব। এ সি হলে তারে আটকে থাকত।
বুঝেছি। হালদারমশাইয়ের সঙ্গে সাধু আর তার চেলা যখন ধস্তাধস্তি করছিল, তখনই পাখিটা পালিয়ে থাকবে।
হালদারমশাইয়ের সঙ্গে ধস্তাধস্তি?কর্নেল হাসলেন। বেনামী চিঠিতে বলা হয়েছে, ওঁকে ওরা আটকে রেখেছে। তার মানে ধস্তাধস্তিটা খুব সাংঘাতিকই হয়েছে। হালদারমশাই তো সহজে বন্দি হবার পাত্র নন। ওঁকে কায়দা করতে হাত ফসকে পাখির পালানোই স্বাভাবিক।
ডঃ পট্টনায়ক আবার নকশাটার উপর আতশকাচ নিয়ে ঝুঁকে পড়লেন। তারপর চাপা গলায় বললেন, কর্নেল, আমার মনে হচ্ছে, এটা কোদণ্ডগিরি পাহাড়ে জি আর ডির ল্যাবরেটরি এবং স্পেস রিসার্চ সেন্টারের ব্লুপ্রিন্ট। ওই গোপন জায়গায় যাওয়ার হদিশও এতে আছে যেন। এই চিরুনির মতো চিহ্নটা দেখুন। এটা সম্ভবত ঝরনা। আর তার উলটোদিকে এই লাল ফুটকিটা কি সেই লাল রঙের প্রকাণ্ড পাথরটাই—যেটা আমি দেখে গিয়েছিলুম জানুয়ারিতে এসে?
কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। এখনই বেরিয়ে পড়া যাক। আড়াইটে বাজাতে চলল। দিনের আলো থাকতে থাকতে বেরিয়ে পড়াই ভাল। জয়ন্ত, তুমি যাবে নাকি?
তড়াক করে উঠে বসলুম। বললুম, যাব না মানে? দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার লক্ষ-লক্ষ পাঠক হা-পিত্যেশ করে বসে আছে না?
ডঃ পট্টনায়ক বললেন, হাঁটা-পথেই যাব। অবশ্য পথ বলা ভুল। জানুয়ারিতে এসে কোদণ্ডগিরি পৌঁছতে খুব হন্যে হয়েছিলুম। একবার হাতির পালের সামনে, আর একবার চিতাবাঘের সামনেও পড়েছিলুম। আমার সঙ্গে ছিলেন অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস কমিশনের এক বিশেষজ্ঞ। তিনি তো আতঙ্কে মারা পড়ার দাখিল।
প্রদীপবাবু এসে ওঁর কথা কান খাড়া করে শুনছিলেন। বললেন, জানুয়ারিতে এসেছিলেন আপনারা? জঙ্গলে বেড়াতে নাকি?
মিঃ রায়। নিছক বেড়াতে এলে তো আপনি জানতে পারতেন। আপনার শরণাপন্ন না হয়ে উপায় ছিল না। আমরা এসেছিলুম একটা সরকারি তদন্তে। কোদণ্ডগিরি পাহাড়ে নাকি অদ্ভুত সব আলো দেখা যায়। আগুনের গোলাও দেখা যায়। আমার ধারণা ছিল, ওখানে প্রচুর প্রাকৃতিক গ্যাস আছে ভূগর্ভে। কিন্তু এসে কিছুই হদিশ করতে পারিনি। আর পাহাড়টায় চড়াও একেবারে অসম্ভব। পুরোটা গ্রানাইট শিলায় তৈরি। যাই হোক, ফেরার পথে পার্বতী নদীর ধারে বালির চড়ায় ওই রিমোট কন্ট্রোল যন্ত্রটা কুড়িয়ে পেয়েছিলুম।
প্রদীপবাবু বললেন, আগুনের গোলার কথা আমিও শুনেছিলুম।
কর্নেল বললেন, আজ সকালে দেখতে পেলেন।
প্রদীপবাবু চমকে উঠে বললেন কিন্তু ওটা তো আগুনের গোলা নয়। ছাই-রঙের একটা গোলক।
রাতে ওটা থেকে রশ্মি ঠিকরে পড়ে। তাছাড়া মহাকাশযান বা কৃত্রিম উপগ্রহ রাতের আকাশে আগুনের গোলার মতো দেখাতে পারে।
প্রদীপবাবুও আমাদের সঙ্গ ধরলেন। এতে খুশিই হলেন কর্নেল এবং ডাঃ পট্টনায়ক। প্রদীপবাবু কোদণ্ডগিরি জঙ্গলের নাড়িনক্ষত্র জানেন। রাস্তা ভুল হওয়ার চান্স থাকবে না।
পাহাড়ি জঙ্গলের সৌন্দর্য তুলনাহীন। তাছাড়া এখন বসন্তকাল। কত রকম ফুল ফুটেছে চারিদিকে। মিঠে গন্ধে মউ-মউ করছে বনপথ। পাখ-পাখালি গান ধরেছে মনের সুখে। কিন্তু এসব দিকে আমাদের কারুর মন নেই। প্রদীপবাবু সতর্কতার জন্য একটা শটগান হাতে নিয়েছেন। বুনো জন্তুর পাল্লায় পড়লে ভয় দেখিয়ে তাড়ানোর জন্যই। এ জঙ্গলে পশুপাখি হত্যা নিষিদ্ধ।
একবার হাতির চিঙ্কার কানে এল। প্রদীপবাবু বললেন, পার্বতী নদীতে দিনের শেষে খেলতে নেমেছে হাতির পাল। বাতাস ওদিক থেকে বইছে। কাজেই আমাদের গন্ধ পাবে না ওরা।একখানে টিলার উপর মহুয়া গাছে ভালুক দেখিয়ে দিলেন। বহু দূরে একবার যেন বাঘের গর্জনও শুনলুম।
পাঁচ কিলোমিটার দূরত্ব পেরুতে ঘণ্টা-দেড়েক লেগে গেল। এর কারণ রাস্তা বেশ দুর্গমই। চড়াই-উতরাই বিস্তর। ঝরনা এড়িয়ে আমরা কোদণ্ডগিরির পশ্চিমে গিয়ে দাঁড়ালুম। পাহাড়টা অন্তত হাজার-দশেক ফুট উঁচু। দূর থেকে শর লাগানো ধনুক বা পিরামিডের মতো মনে হয় বটে, কাছ থেকে সেটা বোঝা যাচ্ছিল না। শুধু মিনারের মতো খাড়া ছুঁচালো চূড়াটা চোখে পড়ছিল। পাহাড়ের নিচে বিশাল-বিশাল পাথর পড়ে আছে। অনেকটা জায়গা জুড়ে পাথর আর ঝোপ। তারপর উচু গাছের জঙ্গল। তাই এখানে বিকেলের গোলাপি রোদ ছড়িয়ে আছে।
কর্নেল ও ডঃ পট্টনায়ক সেই নকশা আঁকা চিরকুট খুলে পরামর্শ করছিলেন। হঠাৎ কর্নেল বললেন, লাল ফুটকি? হুঁ, দেখুন তো ডঃ পট্টনায়ক! ওই লাল পাথরটাই তো?
ডঃ পট্টনায়ক বললেন, হ্যাঁ, ওটাই। চলুন, দেখা যাক।
কর্নেল বললেন, সাবধান! সবাই গুঁড়ি মেরে পাথরের আড়ালে-আড়ালে এগিয়ে চলুন।
লাল পাথরটার কাছে পৌঁছে আবার দুজনে নকশা দেখে নিজেদের মধ্যে চাপা গলায় পরামর্শ করলেন। তারপর কর্নেল বললেন, সবাই হাত লাগান। দেখা যাক, পাথরটা সরানো যায় কি-না।
