সে ঘর থেকে দুটো খাটিয়া এনে দিল। আমরা বসলুম। তারপর কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন, বাঁদরটাও তোমাদের চেনা দেখছি!
বুড়া হাসতে হাসতে বলল, হুজুর কি ভুণ্ডুরামকে কিনে আনলেন ভগিয়ার কাছ থেকে?
কর্নেল বললেন, বাঁদরটা আমি ভগিয়ার কাছে কিনিনি। অন্য একজনের কাছে কিনেছি।
বুড়ো অবাক হয়ে বলল, সে কী! ভগিয়া ভুরামকে তাহলে বেচে দিয়েছিল! কার কাছে বলুন তো হুজুর?
কর্নেল বললেন, নাম জানি না। বাবু বংকারামের বাড়ির ওখানে একটা লোক—
বুড়ো কথা কেড়ে বলল, বুঝেছি। বেঁটেমতো, মাথায় টাক আছে তো? নব।
ভগিয়া কে?
নবর ভাই। ভগিয়া যে সারাদিন ভুণ্ডুরামকে নিয়েই ব্যস্ত থাকত। তাই নব বলত বটে, বাঁদরটাকে জঙ্গলে ফেলে দিয়ে আসবে, নয়তো কাউকে বেচে দেবে।
ভগিয়া এমন জাতের বাঁদর পেল কোথায়?
জঙ্গল থেকে নাকি ধরে এনেছিল। খেলা শিখিয়েছিল। যা বলত, তাই শুনত ভুণ্ডুরাম।
ভগিয়াকে এখন কোথায় পাওয়া যাবে?
বলা কঠিন। শুনেছি সে নাকি এক সাধুবাবার চেলা হয়েছে। কোথায়-কোথায় ঘোরে সাধুবাবার সঙ্গে।
এক সাধুবাবা নাকি অদৃশ্য হতে পারেন—তারই চেলা হয়নি তো ভগিয়া?
বুড়ো মুখ বেঁকিয়ে বলল, সে সাধুবাবা স্বয়ং শিব। ভগিয়া তার চেলা হবে? তাহলে পুবের সূর্য পশ্চিমে উঠবে না? হুজুর, ভগিয়ার সাধুবাবা আর কেমন হবে? ভগিয়ার মতোই হবে। কেউ কেউ বলে, সাধুটা নাকি গোপেশ্বর। পুলিশের ভয়ে সাধু সেজে লুকিয়ে বেড়াচ্ছে।
লোকগুলো হইচই করে ফিরে এল। ফঁসুড়ে ভুণ্ডুরামকে ধরে এনেছে ওরা। মরা পাখিটাকে এখনও বজ্জাতটা আঁকড়ে ধরে রয়েছে। কর্নেল বাঁদরটাকে আগের মতোই জ্যাকেটের ভিতর পকেটে চালান করলেন এবং একটা হাত চেপে রাখলেন, যাতে আর না পালাতে পারে। মরা পাখিটাকে আমি রুমালে জড়িয়ে নিলুম কর্নেলের আদেশে।
ওদের বখশিশ দিয়ে বুড়োর কাছে বিদায় নিয়ে কর্নেল হঠাৎ আমাকে চাপা গলায় ইংরেজিতে বললেন, জয়ন্ত, দূরে একটা লোককে দৌড়ে আসতে দেখছি। মনে হচ্ছে, লোকটা ভগিয়ার দাদা নব। ওই দ্যাখো, সামনে বড় রাস্তার মোড়ে একটা অটোরিকশা দাঁড়িয়ে রয়েছে। দৌড়নোর জন্য তৈরি হও। ওয়ান, টু, থ্রি-রান!
পিছনের লোকগুলো নিশ্চয় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে আছে। জীবনে এমন দৌড় কখনও দৌড়ইনি, কিংবা পঁয়ষট্টি বছরের খ্রিসমাস সান্টা ক্লজ চেহারার এই বৃদ্ধ ভদ্রলোককেও দৌড়তে দেখিনি।
অটো-রিকশোয় চেপেই কর্নেল বললেন, ডবল ভাড়া সর্দারজি! তুরন্তু চালিয়ে, ইধার টাউনশিপ হোকে সিধা।
ড্রাইভার কী বুঝল কে জানে, তক্ষুনি, স্টার্ট দিয়ে বাহনটাকে রকেটের বেগে ছুটিয়ে দিল পার্বতী নদীর ব্রিজের দিকে। ব্রিজ পেরিয়ে গিয়ে সে মুচকি হেসে বলল, ইধার গোপেশ্বর ডাকু রহতা হ্যায়! কভি ইধার মাত আইয়ে জি।
প্রদীপবাবুর বাংলোবাড়িতে পৌঁছে দেখি, সবে ডঃ সীতাকান্ত পট্টনায়ক ভুবনেশ্বর থেকে নিজেই জিপ চালিয়ে হাজির। কর্নেল পকেট থেকে ভুণ্ডুরামকে বের করলে উনি চমকে গিয়ে। বললেন, স্কুইরেল মাংকি মনে হচ্ছে? কোথায় পেলেন?
কর্নেল হালদারমশাইয়ের প্রসঙ্গ থেকে শুরু করলেন। কথা শেষ হলে পট্টনায়ক বললেন কী আশ্চর্য! কাল দুপুরে কলকাতার ফরেনসিক ল্যাবরেটরি হলে যখন আপনি আমার সঙ্গে দেখা করলেন, তখন যদি গঙ্গারামের ব্যাপারটা বলতেন, তখনই সব জানিয়ে দিতুম আপনাকে।
কর্নেল বললেন, চেনেন নাকি গঙ্গারামকে?
ভীষণ চিনি, ডঃ পট্টনায়ক উত্তেজিতভাবে বললেন। ভদ্রলোক ছিলেন বাঙ্গালোর স্পেস রিসার্চ সেন্টারের জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী। খুব খেয়ালি স্বভাবের মানুষ। হঠাৎ চাকরি ছেড়ে নিখোঁজ হয়ে যান। তাহলে দেখা যাচ্ছে, ওল্ড কোদণ্ডগিরিতে বাবু বংকারামের বাড়িতে এসে জুটেছিলেন।
বাবু বংকারামের নাকি মাসতুতো ভাই উনি।
হতে পারে, ডঃ পট্টনায়ক বললেন। কেন এখানে এসেছিলেন, তাও আঁচ করতে পারছি। জঙ্গলের ভেতর কোদণ্ডগিরি পাহাড়ে নিশ্চয় গোপনে মহাকাশ সংক্রান্ত গবেষণা করছিলেন। একটু আগে মিঃ রায়ের কাছে যা শুনলুম তাতে ওঁর সাফল্যের প্রমাণও পেয়েছি। এমন একটা রিমোট কন্ট্রোল সিস্টেম এ যাবৎ আবিষ্কৃত হয়নি।
হ্যাঁ। রিমোট কন্ট্রোল যন্ত্রটা সত্যি বিস্ময়কর।
কিন্তু এসব কাজের জন্য প্রচুর টাকা দরকার। এত টাকা কোথায় পেলেন জি আর ডি? ডঃ পট্টনায়ক একটু হেসে বললেন, হা, –ডঃ গঙ্গারাম দাস জি আর ডি নামেই বিজ্ঞানীমহলে পরিচিত ছিলেন।
কর্নেল বাঁদরটার পিঠে হাত বুলাতে বুলোতে বললেন, তাহলে কি বাবু বংকারামকে ডাকাতি করে টাকা জোগাড় করার জন্য উনিই প্ররোচিত করেছিলেন? হয়তো বাবু বংকারামকে কোনও লোভ দেখিয়েছিলেন।
প্রদীপবাবু এসে বললেন, লাঞ্চ রেডি। দেড়টা বাজতে চলল। এবার দয়া করে উঠে পড়ুন।
ছয়
খাওয়াদাওয়ার পর মরা ময়নাপাখিটা নিয়ে কর্নেল এবং ডঃ পট্টনায়ক কী-সব পরীক্ষায় বসলেন। ডঃ পট্টনায়কের সঙ্গে সবসময় একটা খুদে পোর্টেবল ল্যাবরেটরি থাকে। দেখতে সেটা একটা প্রকাণ্ড স্যুটকেসের মতো। টেবিলে সেটা খুলে বসেছেন।
ফঁসুড়ে ভুণ্ডুরাম এখন প্রদীপবাবুর জিম্মায়। ওকে বন্য প্রাণী গবেষণাগারের হেফাজতে দেওয়া হবে। রাত জেগে ট্রেন জার্নি, তার ওপর যমের দুয়ার থেকে ফেরার ধাক্কায় আমি ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়েছিলুম। শ্বাসনালির ব্যথাটা গরম জলের গাৰ্গলে অনেকটা কমেছে। সবে চোখ বুজে আসছে ভাতঘুমে, এমন সময় কর্নেল এবং ডঃ পট্টনায়কের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর শুনে ঘুমের রেশ ছিঁড়ে গেল। কর্নেল বললেন, কী আশ্চর্য! এ যে দেখছি একটা নকশা!
