হাইওয়েতে দিনশেষে যানবাহনের আনাগোনা এখন সত্যিই কম। আমরা চা খেতে-খেতে একটা সবুজ অ্যাম্বাসাডার বাঁক ঘুরে এসে গতি কমাল। তারপর চায়ের দোকানের সামনে থেমে গেল। পেছনের সিটে দুজন প্রৌঢ় ছিলেন। একজন মুখ বাড়িয়ে হিন্দিতে জিজ্ঞেস করলেন, বরমদেও থান আর কতদূর?
চাওয়ালা ভাঙা হিন্দিতে বলে দিল, সামনে ব্রিজ পেরিয়ে গিয়ে ডাইনে জঙ্গলের ভেতর বটের ডগায় লাল কাপড় উড়ছে দেখবেন।
গাড়িটা চলে গেল। আমেদ বাঁকা মুখে হাসলেন। বাইরের লোক। নইলে ঝুঁকি নিত না।
কর্নেল বললেন, বাঙালি। বাঙালির হিন্দিটা সহজে রপ্ত হয় না। তা ছাড়া বাঙালি সম্ভবত বাতিকগ্রস্ত জাত। আমাকে একটা সেরা নমুনা বলতে পারো। কাজেই অবেলায় বরমদেও নামে কোনও দেবতার থান দর্শনে যাত্রা বাঙালির পক্ষেই স্বাভাবিক। কিন্তু খটকা খটকা লাগছে। বলে উনি বাইনোকুলারে গাড়িটা দেখতে থাকলেন।
আমেদ বললেন, কিসের খটকা?
কর্নেল বাইনোকুলার নামিয়ে চায়ে চুমুক দিলেন। অপূর্ব! বলে আমাদের দিকে ঘুরলেন। গাড়ির পেছনে কাচে লেখা আছে আলফা ট্রেডিং কোম্পানি, তারাপুর।
আমেদ বললেন, তারাপুর প্রায় উনিশ-কুড়ি কিলোমিটার আপে। সেখানে অনেক বাঙালি আছে। কিন্তু খটকাটা কিসের?
ব্যবসা-বাণিজ্যে বাঙালি আজকাল পিছিয়ে পড়েছে। সিদ্ধিদাতা গণেশ যেন কোনও কারণে অপ্রসন্ন। বরমদেও কি ঠেকাতে পারবেন?
আমেদ চা শেষ না করেই উঠে দাঁড়ালেন। ঘড়ি দেখে বললেন আমাদের এখনও তিরিশ কিলোমিটার যেতে হবে। পৌনে পাঁচটা বাজে।
তাঁর তাড়ায় উঠে পড়তে হল। জিপ চালানোয় তার দক্ষতা ধরমতাল রোডে দেখছি। নদীর ব্রিজে পৌঁছে দূরে উতরাইয়ের নিচে সেই সবুজ অ্যাম্বাসাডার চোখে পড়ল। দুধারে ঘন জঙ্গল আর বড়-বড় পাথর। আমেদ সম্ভবত জঙ্গি গেরিলাদের আতঙ্কে জিপ ছোটাচ্ছিলেন। সবুজ গাড়িটার কাছে যাওয়ার আগেই কর্নেল বলে উঠলেন, রোখো, রোখখা, জাস্ট আ মিনিট।
আমেদ অগত্যা ব্রেক কষলেন। কর্নেল নেমে গিয়ে বললেন, বরমদেও নিশ্চয় ব্রহ্মদেব। সম্ভবত ব্রহ্মা, ব্রহ্মার মন্দির এ-যাবৎ একটিই আবিষ্কৃত হয়েছে। দ্বিতীয়টি আবিষ্কারের কৃতিত্ব আমারই হোক—চান্স ছাড়তে চাই না।
উনি হন্তদন্ত ডাইনের জঙ্গলে ঢুকলেন। একফালি পায়ে-চলা পথ দেখা যাচ্ছিল। সবুজ গাড়িটার মুখ এখন উলটো দিকে ঘোরানো। ড্রাইভার হেলান দিয়ে চোখ বুজে আছে। নাইট ডিউটির পর ঘুমনোর সময় পায়নি নাকি? জিপের শব্দেও চোখ খুলল না।
আমেদ নামলেন না। আমি নেমে গেলাম। ব্রহ্মামন্দির দর্শনের কৌতুহল জেগেছিল। পায়ে-চলা পথে এগিয়ে গেলাম। দুপাশে বড়-বড় পাথরও পড়ে আছে। সামনে বিশাল বটগাছের তলায় পাথরের বেদির কাছে কর্নেল বাঁ দিকে ঘাসের ওপর ঝুঁকে কিছু দেখছিলেন। এতক্ষণে সোজা হলেন। তারপর ক্যামেরা তাক করলেন। ফ্লাশগান কয়েকবার ঝিলিক দিল। কাছে গিয়ে বললাম, শুধু বেদি দেখছি! মূর্তি নেই?
কর্নেল নির্বিকার মুখে শান্তভাবে বললেন, শিগগির আলফা কোম্পানির ড্রাইভার আর আমেদকে ডাকো।
কেন?
সদ্য একটা মার্ডার হয়েছে। ওই দ্যাখো।
প্রায় ঝাঁপ দিয়ে এগিয়ে দেখি, ধুতি-পাঞ্জাবি-পরা একটা লোক বেদির নিচে বাঁ-পাশে ঘাসের ভেতর উপুড় হয়ে পড়ে আছে। মাথার পেছনে টাটকা রক্ত। রক্ত তখনও গড়িয়ে পিঠে আর ঘাসে পড়ছে। আমার মাথা ঘুরে গেল। কর্নেলের সঙ্গদোষে এ-যাবৎ অনেক খুনখারাপি দেখেছি। তাই হয়তো ভিরমি খেয়ে পড়ে গেলাম না। কর্নেল বললেন, হাঁ করে কী দেখছ? ওদের খবর দাও।
দৌড়ে গিয়ে আমেদকে বললাম, মার্ডার! মার্ডার! কর্নেল ডাকছেন!
আমেদ প্রলাপ বকতে থাকলেন, কর্নেলকে চলে আসতে বলুন, কর্নেলকে ডাকুন! সবুজ গাড়ির ড্রাইভার আমার ডাকাডাকিতে চোখ খুলে প্রথমে বলল, নেহি! কৈ টেরাক পাকাড় লিজিয়ে। তারপর আমার বিদঘুটে হিন্দিতে ঘটনা শুনে সে কী বুঝল জানি না, আস্তেসুস্থে বেরিয়ে গদাইল-করি চালে থানের পথে পা বাড়াল। আমেদ তখনও প্রলাপ বকছেন।
পরে শুনেছিলাম, আগের পিআরও-র মুক্তিপণের টাকা সরকারি লালফিতের ফাঁসে আটকে পড়ার দরুন জঙ্গিরা তাঁর মৃতদেহ ফেরত পাঠিয়েছিল।
তো আমেদকে কিছুতেই ধাতস্থ করা যাচ্ছিল না। তখন আবার থানের দিকে ছুটে গেলাম। আলফা কোম্পানির ড্রাইভার আচমকা আমাকে প্রায় ধাক্কা মেরে গাড়ির দিকে চলে এল। তারপর গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার শব্দ শুনতে পেলাম। কর্নেল অকুস্থলের কাছে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। উত্তেজিতভাবে বললাম, ড্রাইভারটা পালিয়ে গেল যে!
কর্নেল বাইনোকুলারে চোখ রেখে বললেন, পালায়নি। কুঁয়ারডি থানায় খবর দিতে গেল।
এঁর সঙ্গী ভদ্রলোক কোথায় গেলেন?
বাইনোকুলার নামিয়ে কর্নেল বললেন, যাচ্ছেতাই জঙ্গল আর পাথর। জঙ্গিদের দেখতে পাওয়া অসম্ভব।
বুক ধড়াস করে উঠল। জঙ্গি মানে?
আমেদ ঠিকই বলেছিল। বলে কর্নেল পকেট থেকে একটা ভাজকরা কাগজ দিলেন। ডেডবডির পাশেই একটুকরো পাথর চাপিয়ে রাখা ছিল এটা।
কাগজটা খুলে দেখি একটা লেটারহেড। ওপরে ছুটন্ত একটা কালো চিতাবাঘের ছবি। হিংস্র মুখটা এদিকে ঘুরে আছে। তার নিচে ইংরেজিতে ছাপানো ব্ল্যাক প্যান্থার লিবারেশন ফ্রন্ট। তারপর লাল কালিতে যে কথাগুলো ছাপানো, বাংলায় মোটামুটি তা এরকম :
নিপীড়িত মানবতার স্বার্থে একটি ছারপোকা আটক করা হয়েছে। এর মুক্তিপণ তিন লক্ষ টাকা। কাহো প্রপাতের মাথায় যে গুহা আছে, তার মধ্যে টাকা রেখে রেখে এলে এর মুক্তি। পুলিশ নাক গলালে মৃতদেহ ফেরত যাবে। ৪৮ ঘন্টা সময় দেওয়া হল।….
