এবার শিউরে উঠে দেখলুম, আমার গলায় মিহি নাইলনের সুতো জড়ানো। ব্যাপারটা বুঝতে এক সেকেন্ডও দেরি হল না। কাঁপা কাঁপা হাতে গলা থেকে সুতোটা খুলে ফেললুম।
কর্নেল বললেন, ভ্যাগ্যিস বাঁদরটাকে আগে দেখতে পেয়েছিলুম। তোমার মাথায় উপর ওই ডাল বেয়ে এগিয়ে আসছিল। ফসটা নিয়ে যেই তোমার ঘাড়ে লাফিয়ে পড়েছে, আমিও এক লাফে এগিয়ে ওকে ধরে ফেলেছি। তবে ফাঁস ধরে যে টান দিয়েছিল, তাকে দেখতে পাইনি। আন্দাজে রিভলভারের গুলি ছুড়ে তাকে ভাগিয়ে দিয়েছি। লোকটা সম্ভবত বটগাছের গুড়ির উপর কোথাও বসে ছিল। কারণ তার লাফিয়ে পড়া আর দৌড়ে যাওয়ায় ধুপধুপ শব্দ শুনতে পেয়েছি।
উঠে দাঁড়ালুম। মাথা ঝিমঝিম করছে। কুৎসিত বাঁদরটার দিকে তাকাতেও আতঙ্ক হচ্ছে। ওই ব্যাটা আমার ঘাড়ে লাফিয়ে ফাঁসটা আটকে দিয়েছিল আর ওর শয়তান মনিব নাইলনের শক্ত এই সুতোটার অন্য প্রান্ত থেকে ছিপে এ্যাচ মেরে মাছ বেঁধানোর মতো হ্যাচকা টান মেরেছিল। মানুষ মারার বিদঘুটে ফন্দি বটে। এমনি করেই তাহলে বাবু বংকারামকে দম আটকে খুন করা হয়েছিল।
সুতোটা প্রায় দশ-বারো মিটার লম্বা। ল্যাসোর কে খুদে সংস্করণ আর কি! গুটিয়ে পকেটে রাখলুম, কর্নেলের জাদুঘরে উল্লেখযোগ্য সংযোজন হিসেবে উপহার দেব এটা। সঙ্গে একটা চিত্রকুটে লেখা থাকবে : এই নিরীহ সুতোটি প্রখ্যাত সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরিকে যমের বাড়ির দরজা অব্দি টেনে নিয়ে গিয়েছিল।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, এই সেই ময়নাচোর স্কুইরেল মাংকি, ডার্লিং! হালদারমশাইয়ের সাধু, পাখি আর বাঁদরের মধ্যে বাঁদরটা হাতে এল। বাকি রইল পাখি আর সাধু। একটুর জন্য সাধু ফসকে গেছে। তবে আশা করি, আবার তার দেখা আমরা শিগগির পাব। শুধু পাখিটার জন্য ভাবনা হচ্ছে।
বললুম, আমার আর এক সেকেন্ডও এখানে থাকতে ইচ্ছে করছে না কর্নেল। তাছাড়া শ্বাসনালিতে ব্যথা করছে।
কর্নেল বললেন, ঠিক আছে। চলো, ফেরা যাক। পরে আবার এসে বাবু বংকারামের ডেরা খোঁজা যাবে। তারপর খুদে প্রাণীটাকে জ্যাকেটের ভিতরকার পকেটে ঢুকিয়ে বোতাম আঁটলেন। বাঁদরটা নড়ল না একটুও।
গ্রামের রাস্তায় ফিরে যাওয়ার সময় একটা ভিড় চোখে পড়ল। একটা কুঁড়েঘরের সামনে পুরুষ, স্ত্রীলোক, কাচ্চাবাচ্চা ভিড় করে কী যেন দেখছে। উঁকি মেরে দেখি, একটা কালো মরা পাখি পড়ে আছে মাটিতে। সেটাই সবাই ভিড় করে দেখছে। কর্নেলের দিকে তাকালুম। খুব চঞ্চল হয়ে উঠেছেন। গোয়ন্দাপ্রবর। একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার, মরা পাখি দেখার জন্যে এত ভিড় কেন?
সে বলল, সায়েব, এটা একটা ময়নাপাখি।
তা তো দেখতেই পাচ্ছি। পাখিটা মরল কী করে?
একজন বুড়ো বলল, হুজুর, পাখিটা আমার নাতনি কুড়িয়ে পেয়েছে মাঠে। তখনও ধুকছিল। এনে মুখে জল দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করল। বাঁচল না। এ পাখিটা আমরা চিনতে পেরেছি। সেজন্য এই ভিড়।
পাখিটা কার?
বাবু গঙ্গারাম দাস বলে একটা লোক ছিল, এ তারই পাখি। পাখিটা ভাল বুলি বলতে পারত, হুজুর! ওড়িয়া, হিন্দি আবার ইংরেজিতেও নাকি বুলি বলত। বাবু গঙ্গারাম দাস ছিল লেখা-পড়াজানা লোক। বড় খেয়ালি আর দিলদরিয়া ছিল তার মেজাজ। গরিব লোকদের জন্য খুব দয়া ছিল তার।
আমি চমকে উঠেছিলুম। কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন, তিনি এখন কোথায় আছেন?
বুড়ো বলল, জানি না হুজুর! বাবু গঙ্গারাম থাকত বাবু বংকারামের বাড়িতে। শুনেছি ওরা নাকি ছিল মাসতুতো ভাই। বছরখানেক আগে বাবু বংকারাম জঙ্গলে ঝরনার ধারে খুন হয়েছে। বাবু গঙ্গারাম তারপর থেকে নিপাত্তা। পুলিশ তাকে আর গোপেশ্বর নামে একটা লোককে খুনি বলে সন্দেহ করেছিল বটে, কিন্তু আমরা এ কথা বিশ্বাস করি না; অমন নিরীহ আর দয়ালু লোক গঙ্গারাম মানুষ খুন করতে পারে! খুনোখুনির কাজ গোপেশ্বর পারত বটে। সেও ছিল এক সাংঘাতিক ডাকাত। বাবু বংকারামের স্যাঙাত।
কর্নেল পাখিটার দিকে তাকিয়ে বললেন, এ পাখি যে বাবু গঙ্গারামের, তোমরা চিনলে কেমন করে?
সবাই হইচই করে উঠল জবাব দেওয়ার জন্য। সবাইকে থামিয়ে বুড়ো বলল, ওই যে দেখছেন পাখিটার একটা পায়ে রুপোর আংটা। বাবু গঙ্গারাম সবসময় পাখিটাকে কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াত। ওই আংটার সঙ্গে ছিল সরু চেনা চেনটা থাকত বাবু গঙ্গারামের গলায় জড়ানো। মনে হচ্ছে, আংটা থেকে চেন ছিঁড়ে কী ভাবে পাখিটা পালিয়ে বেড়াচ্ছিল এতদিন।
কর্নেল হাঁটু ভাঁজ করে ঝুঁকে পাখিটাকে ভাল করে দেখতে গেছেন, অমনি তার জ্যাকেটের ভিতর থেকে দুটো বোতামের মাঝখান দিয়ে বজ্জাত খুদে বাঁদরটা সুড়ুত করে পিছলে পড়ল। তারপর লোকগুলোর পায়ের ফাঁক দিয়ে গলে চোখের পলকে কুঁড়েঘরের চালে চড়ে বসল। এবার তাজ্জব হয়ে দেখলুম, বাঁদরটা মরা পাখিটাকে হাতিয়ে নিয়েছে।
সবাই হকচকিয়ে গিয়েছিল। কর্নেলও হতভম্ব। হাঁ করে তাকিয়ে আছেন। আমিও তাই, তারপর লোকগুলো চেঁচিয়ে উঠল, ভুণ্ডুরাম! ভুণ্ডুরাম!
চ্যাঁচামেচিতে হয়তো ভয় পেয়েই বাঁদরটা পাখিটা নিয়ে এক লাফে কুঁড়েঘরের পেছনের দিকে উধাও হয়ে গেল। ওর গতি আর ভঙ্গি অবিকল কাঠবেড়ালির মতো। কর্নেল বাজখাই গলায় চেঁচিয়ে বললেন, পাকড়ো। পাকড়ো! বখশিশ মিলেগা!
বখশিশের লোভে হইচই করতে করতে অনেকেই ছুটে গেল। বুড়ো কর্নেলকে আশ্বস্ত করে বলল, চুপ করে বসে থাকুন হুজুর! খাটিয়া এনে দিচ্ছি। ভুরামকে ওরা এক্ষুনি ধরে ফেলবে। ওটা তো একটা পোষা বাঁদর।
