সে কী! প্রদীপবাবু নড়ে বসলেন।
কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। কাল বেলা একটা নাগাদ কয়েক সেকেন্ডের জন্য দেখেছেন তো? বলে পা বাড়ালেন ঘরের দিকে। আমার ধারণা, আমি আপনাদের হয়তো একটা বিস্ময়কর ম্যাজিক দেখাতে পারব। অন্তত নিরানব্বই শতাংশ চান্স আছে। কর্নেল পরদা তুলে ঘরে ঢুকে গেলেন।
একটু পরে বেরিয়ে এলেন। হাতে গতকাল সকালে দেখা সেই হাড়ের টুকরো অথবা মাউথ অর্গান অথবা রিমোট কন্ট্রোল যন্ত্র নিয়ে। চেয়ারে বসে বললেন, দেখা যাক, কী ঘটে। মিঃ রায়, জয়ন্ত! তোমরা ওই ছুঁচলো পাহাড়টার দিকে লক্ষ্য রাখো। রেডি—ওয়ান, টু, থ্রি!
আমাদের চোখের সামনে সকালবেলার উজ্জ্বল রোদে পাঁচ কিলোমিটার দূরের ওই পাহাড়ের ছুঁচলো ডগা থেকে একটা গোলাকার ধূসর রঙের প্রকাণ্ড জিনিস ছিটকে গেল আকাশে। স্থির ভেসে রইল। কর্নেল বললেন, বেশিক্ষণ এই ম্যাজিক দেখানো ঠিক নয়। আরও কারুর চোখে পড়তে পারে। অতএব ম্যাজিকের খেলা সাঙ্গ হল। জয়ন্ত, এই খেলাটার নাম দিলাম, কোদণ্ডের টঙ্কার।
গোলাটা নেমে এসে যেন চূড়ায় মিশে গেল। শ্বাস ছেড়ে বললুম, PUSH PANEL A এবং PUSH PANEL B-এর জাদু। কোদণ্ডের টঙ্কার।
ঠিক বলেছে ডার্লিং! বলে কর্নেল প্রদীপবাবুর দিকে ঘুরলেন। প্রদীপবাবু হতবাক হয়ে বসে আছেন।
উনি মুখ খুলতে যাচ্ছেন, এমন সময় ওঁর মালি এসে সেলাম দিয়ে বলল, গেটের কাছে এই চিঠি লটকানো ছিল, স্যার। প্রদীপবাবু চিঠিটা খুলে পড়ে ভীষণ গম্ভীর মুখে কর্নেলকে এগিয়ে দিলেন। উঁকি মেরে দিখে, ইংরেজিতে যা লেখা আছে, তার মানে হল : তোমার আঙ্কেলকে আমরা আটকে রেখেছি। রাত দশটায় ঝরনার কাছে একা দেখা করবে। তখন কথা হবে। সাবধান, গণ্ডগোল বাধানোর মতলব করলে আঙ্কেলের মুণ্ডু উপহার পাবে।
পাঁচ
বেনামী চিঠিটা পেয়ে প্রদীপবাবু খুব মুষড়ে পড়েছিলেন। কর্নেল ওঁকে আশ্বাস দিয়ে আমাকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়েছিলেন। ডঃ সীতাকান্ত পট্টনায়ক দুপুরের আগে এসে পৌঁছতে পারবেন বলে মনে হয় না। ততক্ষণ একটু ঘোরাঘুরির ইচ্ছে হয়েছিল কর্নেলের। রাস্তায় একটা খালি অটো-রিকশো পাওয়া গিয়েছিল। পুরনো কোদণ্ডগিরিতে পৌঁছে কর্নেল হিন্দিতে রাস্তার একটা লেককে জিজ্ঞেস করলেন, বাবু বংকারাম সেনাপতির বাড়িটা কোথায়?
লোকটা অবাক হয়ে আমাদের দেখতে দেখতে বলল, বাবু বংকারাম তো মারা গেছেন গত বছর।
জানি। তার বাড়িতে তো লোকজন আছে।
লোকটা আরও অবাক হয়ে বলল, কেউ নেই। আর বাড়ি তো শুধু নামেই। চলে যান সিধে রাস্তা ধরে। জঙ্গলের ভেতরে ভাঙা দালানবাড়ি দেখতে পাবেন।
গ্রামটা এক সময় হয়তো সমৃদ্ধ ছিল। এখন প্রায় জনহীন ছন্নছাড়া বসতি। যারা বাস করছে, তাদের বোধহয় অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই। আগাছার জঙ্গল, ধ্বংসস্তুপ তার মধ্যে একটা করে কুঁড়েঘর। কিছুটা যাওয়ার পর ডান দিকে গাছপালা আর ঝোপের ভেতর একটা ভাঙা দেউড়ি দেখা গেল। লতাপাতায় ঢাকা দেউড়ির পাশ দিয়ে সাবধানে এগিয়ে একটা ফাঁকা জায়গায় পৌঁছলুম আমরা। সামনে, ডাইনে, বাঁয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা ঘরগুলোর বুকে ঘন আগাছা গজিয়ে উঠেছে। কর্নেল চারিদিক দেখতে দেখতে আনমনে বললেন, আশ্চর্য তো!
জিজ্ঞেস করলুম, আশ্চর্যটা কী?
কর্নেল একটু হাসলেন। ডাকাত হওয়ার আগে বাবু বংকারাম নিশ্চয় এই বাড়িতে বাস করতেন। কিন্তু থাকার মতো আস্ত কোনও ঘর তো দেখতে পাচ্ছি না। লক্ষ্য করে দ্যাখো জয়ন্ত, এসব ঘর অন্তত পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে ভেঙে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে।
তাই হচ্ছে বটে, কিন্তু এই ভূতের আস্তানায় আপনার হানা দেওয়ার উদ্দেশ্য খুঁজে পাচ্ছি না।
কর্নেল আমার কথার জবাব না দিয়ে পা বাড়ালেন। একটু তফাতে একটা ফোকর দেখা যাচ্ছিল। ফোকরটা লতাপাতায় প্রায় ঢাকা পড়েছে। আমি বারণ করার আগেই কর্নেল গুড়ি মেরে ঢুকে পড়লেন। অগত্যা আমি ওঁকে অনুসরণ করলুম। একটা সুড়ঙ্গ পথই বলা যায়। দিনদুপুরে আঁধার হয়ে আছে। একটু পরে সামনেটা ফাঁকা হয়ে গেল। একটা ছোট চত্বরে পৌঁছলুম আমরা। কর্নেল বললেন, এদিকটাই ছিল বাড়ির অন্দরমহল।
এখানেও একই অবস্থা। উঁচু সব ধ্বংসস্তুপ চারপাশে আগাছা আর লতাপাতার ঝালরে ঢাকা। বুনো ফুলের কড়া গন্ধ মউমউ করছে এই ধ্বংসপুরীতে। পাখপাখালির ডাকাও শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কর্নেলের এখন পাখি দেখার মন নেই। এমনকী ওঁর দাড়ি ঘেঁসে প্রজাপতিও আনাগোনা করছে, যেন দেখতেও পাচ্ছেন না। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে ওপাশ থেকে একটা বটগাছের ডালপালা ঝুঁকে এসেছে আমার মাথার উপর। হঠাৎ উপর থেকে কী-একটা জিনিস ধুপ করে আমার ঘাড়ে পড়ল। আঁতকে উঠে লাফ দিতেই গলায় হ্যাচকা টান এবং সঙ্গে সঙ্গে দম আটকে এল। গোঁ গোঁ করতে করতে পড়ে গেলুম ঘাসের উপর।
তারপর কানে এল গুলির শব্দ। তারপর মাথার কাছে কর্নেলের ডাক শুনতে পেলুম, জয়ন্ত! জয়ন্ত!
আস্তে আস্তে উঠে বসলুম। তাকিয়ে দেখি, কর্নেলের হাতে কতকটা কাঠবেড়ালির মতো দেখতে একস্টা খুদে বাঁদর। পিটপিট করে তাকাচ্ছে বাঁদরটা। কর্নেল তাঁর কাধটা শক্ত করে ধরে রেখেছেন। তাই বাঁদরটার নড়াচড়ার সাধ্য নেই। আমাকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে দেখে কর্নেল বললেন, জোর বেঁচে গেছ ডার্লিং! আর একটু দেরি হলে বাবু বংকারামের অবস্থা হত তোমার। যাই হোক, গলার ফাসটা এবার খুলে ফেলল।
