প্রদীপবাবু দম নিয়ে ফের বললেন, তার কিছুদিন পরে সেই ঝরনার ধারে বাবু বংকারামের ডেডবড়ি পাওয়া গেল।
কর্নেল নড়েচড়ে বসলেন। বললেন, ডেডবডি?
হ্যাঁ। গলায় একটা মিহি নাইলনের দড়ির ফাঁস অটকানো। জিভ বেরিয়ে রয়েছে। সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, দড়িটা অন্তত সাত-আট মিটার লম্বা। কেউ যেন অতটা দূর থেকে হ্যাচকা টানে শ্বাস রুদ্ধ করে ওঁকে মেরে ফেলেছে।
আমি বললুম, আত্মহত্যা নয় তো?
প্রদীপবাবু জোর গলায় বললেন, কক্ষনো নয়। অমন মিহি দড়ি—প্রায় সুতোই বলতে পারেন, তা দিয়ে আত্মহত্যা করা যাবে কীভাবে? গাছের ডালে বেঁধে ঝুলে পড়লেই তো ছিঁড়ে যাবে। তাছাড়া জায়গাটা ফাঁকা। ঝোপঝাড় অবশ্য আছে প্রচুর। কিন্তু কাছাকাছি দশ-বারো বর্গমিটারের মধ্যে কোনও উঁচু গাছই নেই।
কর্নেল বললেন, রাইফেলটা?
ওঁর রাইফেলটার কথা বলছেন কি? নাঃ, ওটা পাওয়া যায়নি। যে ওঁকে ফাঁস আটকে মেরেছিল, সম্ভবত সেই নিয়ে পালিয়েছিল। পুলিশের সন্দেহ, কাজটা গোপেশ্বর নামে ওঁর এক স্যাঙাতের। সে-ও সাংঘাতিক লোক।
কর্নেল দাড়ি চুলকে বললেন, তাহলে দেখা যাচ্ছে, পাখিটার কথা যদি সত্যি হয়, গঙ্গারামকে বংকারাম খুন করেছিল এবং শেষে বংকারামকেও কেউ খুন করল।
আমি বললুম, গঙ্গারামের অনুগত গোপেশ্বর প্রতিশোধ নিয়ে থাকবে।
প্রদীপবাবু হাসতে হাসতে বললেন, মামাবাবু যদি পাখিটার কথা বুঝতে ভুল না করতেন, তাহলে বাবু বংকারামের হত্যা-রহস্য নিয়ে উঠে-পড়ে লাগতেন।
কর্নেল বললেন, আপাতত আপনার মামাবাবু গঙ্গারামের হত্যারহস্য নিয়ে উঠে পড়ে লেগেছেন। দেখা যাক, কত দূর এগোতে পারেন। তবে এটুকু বলতে পারি, শেষ পর্যন্ত বংকারামের হত্যারহস্যেই জড়িয়ে পড়বেন হালদারমশাই—বিশেষ করে সাধু, পাখি, আর বাঁদরের নাগাল যখন পেয়ে গেছেন।
সাধু, পাখি আর বাঁদর? সে আবার কী?
কর্নেল সংক্ষেপে ঘটনাটা বললেন। শোনার পর প্রদীপবাবু খুব অবাক হয়ে গেলেন। বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, –সাধুর ব্যাপারটা কিন্তু সত্যি আশ্চর্য, জানেন? ইদানীং সারা এলাকা জুড়ে খালি ওই নিয়ে আলোচনা। যাকে জিজ্ঞেস করবেন, সে-ই বলবে, সে স্বচক্ষে দেখেছে এক সাধুবাবা হঠাৎ তার সামনে দেখা দিয়েই নাকি অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন।
কর্নেল বললেন, আপনার মামাবাবুও নাকি দেখেছেন স্বচক্ষে!
হ্যাঁ–মামাবাবু নাকি জঙ্গলের ভেতর সেই ঝরনার কাছে দেখেছেন। আর লোকেরা দেখেছে রাস্তাঘাটে, বাড়ির দরজায়, কিংবা নিরিবিলি গাছতলায়। এমনকী, আমার রাঁধুনি হলধর ঠাকুর দেখেছে কিচেনের জানালার বাইরে। ডাকব নাকি ওকে? প্রদীপবাবু হাসতে লাগলেন।
না, থাক, কর্নেল বললেন। ব্যাপারটা সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?
প্রদীপবাবু একটু ভেবে নিয়ে বললেন, সমস্যা হচ্ছে, মামাবাবুকে অবিশ্বাস করতে বাধছে। নইলে নিছক গুজব বলেই উড়িয়ে দিতে পারতুম। মামাবাবু অবশ্য ভুল দেখতে পারেন, তাও ঠিক। তবে ঝরনার ওখানে পাহাড়ের ওপর এক সাধুকে নাকি আমাদের গার্ডরা কয়েকবার দেখেছিল। অদৃশ্য হতে দেখেনি যদিও। কিন্তু–
কর্নেল বললেন, কিন্তু?
প্রদীপবাবু একটু হাসলেন। ওই ঝরনা সম্পর্কে এখানে খুব ভয়ঙ্কর সব গল্প আছে। জায়গাটা নাকি ভূতের বাথান। রাতবিরেতে আলো-টালো দেখা যায়। হ্যাঁ, আলো আমি নিজেও দেখেছি কয়েকবার। কিন্তু কাল দিনদুপুরে একটা ব্যাপার দেখে খুব অবাক হয়ে গেছি।
কর্নেল সোজা হয়ে বসে বললেন, বলুন।
কালকের ব্যাপারটা খুবই আশ্চর্য, জানেন? প্রদীপবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন। তখন প্রায় একটা বাজে। সবে খাওয়া-দাওয়া করে এই বারান্দায় এসে বসেছি, হঠাৎ দেখি কী— বলে উনি হাত বাড়িয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে আঙুল নির্দেশ করলেন। ওই যে ছুঁচলো অদ্ভুত গড়নের পাহাড়টা দেখতে পাচ্ছেন—নিচের দিকটা কতকটা পিরামিডের মতো আর মাথাটা গির্জার চূড়া বা মিনারের মতো উঠে গেছে?
দেখতে দেখতে বললুম, কী আশ্চর্য! আমি তো ওটা পাহাড়ের ওপর বাদশাহি আমলের কোনও মসজিদের মিনার বলে ভাবছিলুম। আগ্রার কাছে ঠিক এমনি একটি স্থাপত্য দেখেছি।
প্রদীপবাবু বললেন, না। ওটা একটা প্রাকৃতিক স্থাপত্যই বলতে পারেন। লক্ষ্য করে দেখুন, পাহাড়টা যেন বাণ-লাগানো বিশাল এটা ধনুক। কোদণ্ড মানে ধনুক। স্বয়ং শিবের ধনুক। আর গিরি হল পাহাড়। ওই পাহাড়টারই নাম তাই কোদণ্ডগিরি। তাই থেকে এলাকা এবং জনপদটার নামও হয়েছে কোদণ্ডগিরি। তা গতকাল বেলা একটা নাগাদ হঠাৎ দেখি কী, ওই ছুঁচলো চুড়ো থেকে একটা গোলমত প্রকাণ্ড জিনিস আকাশে ছিটকে গেল। ছাইরঙা মস্ত বড় একটা গোলা যেন। মাত্র কয়েক সেকেন্ড সেটা ভেসে রইল আকাশে। তারপর নেমে এল চুড়ার মাথায়। তারপর আর দেখতে পেলুম না। ভাবলুম চোখের ভুল নাকি!
কর্নেল নিস্পলক চোখে তাকিয়ে ছিলেন। বললেন, একটা বাজে তখন?
হ্যাঁ! প্রায় একটা।
জিনিসটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য দেখেছিলেন! আজ্ঞে হ্যাঁ।
ছাইরঙের গোলাকার জিনিস?
হ্যাঁ, প্রকাণ্ড। এখান থেকে ওই পাহাড়টার দূরত্ব প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। ঝরনাটা আছে ঠিক তার নিচেই।
মিঃ রায়, আপনি নিশ্চয় চন্দ্র-অভিযানের লুনার মডিউলের ছবি দেখেছেন, কিংবা আমাদের দেশ মহাকাশে যেসব কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়েছে, তাদেরও ছবি দেখেছেন?
প্রদীপবাবু চোখ বড় করে বললেন, মাই গুডনেস! আপনি–
কর্নেল একটু হেসে বললেন, আপনি সম্ভবত ওই ধরনেরই কোনও জিনিস দেখে থাকবেন। এমনও হতে পারে, জিনিসটা আধুনিক কোনও আকাশযান। তথাকথিত উড়ন্ত চাকি বা ফ্লাইং সোরের মডেলে তৈরি।
