দুলাল নড়ে উঠল। আমি টেপ করে রেখেছি। শুনবেন? বলে দৌড়ে সে ঘরে গিয়ে ঢুকল। তারপর একটা টেপরেকর্ডার নিয়ে এল।
কৃতান্ত হালদার খি-খি করে হেসে বললেন, ওর জন্মদিনে আমার ছোটবোন—মানে ওর মাসি প্রেজেন্ট করেছে। দেখছেন কাণ্ড? পাখির কথা টেপ করে বসে আছে।
টেপ চালিয়ে দিল দুলাল। প্রথমে কিছুক্ষণ কাক আর চড়ুইদের ডাক শোনা গেল। তারপর শোনা গেল দুলালের গলা। নাও বিগিন মিঃ ব্ল্যাকি! বিগিন!..ও নো নো! প্লিজ মিঃ ব্ল্যাকি! তারপর শিসের শব্দ। ময়নাপাখির গায়ের রং কালো। ঠোঁট টুকটুকে হলুদ। দুলাল ওকে মিঃ ব্ল্যাকি নাম দিয়েছিল তাহলে! একটু পরেই ব্ল্যাকির কথা শোনা গেল : মাই নেম ইজ গঙ্গারাম। আই অ্যাম কিড্ড বাই গঙ্গারাম। একবার নয়। বার পাঁচ-ছয় একই কথা।
কর্নেল বললেন, আরেকবার টেপটা চালাও তো দুলাল।
দুলাল টেপটা উলটো দিকে ঘুরিয়ে নিল রিভার্স বোম টিপে। তারপর প্লে বোতামটা টিপল।
আবার সেইসব শব্দ। দুলালের কথা। তারপর পাখির গলা।
কর্নেল চোখ বুজে শুনছিলেন। দুলাল টেপ বন্ধ করে বলল, আবার চালাব কর্নেলদাদু?
কর্নেল একটু হেসে বললেন, না। হালদারমশাই, আপনি ভুল শুনেছেন।
ভুল? হালদারমশাই বললেন। সে কী! গঙ্গারামই তো বলল। তাই না জয়ন্তবাবু?
সায় দিয়ে বললুম, তাই তো মনে হল।
কর্নেল বললেন, পাখিটা বলছে, মাই নেম ইজ গঙ্গারাম। আই অ্যাম কি বাই বংকারাম।
বংকারাম! এমন নাম আবার হয় নাকি? গঙ্গারাম নাম শুনেছি বটে।
হয় ডার্লিং! কর্নেল একটু হাসলেন। কোদণ্ডগিরি তো ওড়িশায়। ওড়িশায় বংকাবিহারী, বংকারাম এসব নাম খুব কমন।
হালদারমশাই উত্তেজিতভাবে বললেন, তাহলে তো আর দেরি করা উচিত নয়, স্যার! এখনই
কোদণ্ডগিরি রওনা দিতে হয়।
একটু পরে হালদারমশাইয়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লুম আমরা। বেলা প্রায় বারোটা বাজে। আমার সাদা ফিয়াট গাড়িটা আস্তেসুস্থে চালিয়ে আনছিলুম। দুদিন থেকে গণ্ডগোল করছে গাড়িটা। যখন-তখন অদ্ভুত শব্দ করতে করতে স্টার্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একটু ঠেলে দিলে আবার স্টার্ট নিচ্ছে অবশ্য। ওবেলা গ্যারেজে না দিলেই নয়।
আজ হালদারমশাইয়ের বাড়ি আসার সময় কোনও গণ্ডগোল করেনি। কিন্তু ফেরার পথে সুন্দরীমোহন অ্যাভেনিউতে পৌঁছেই ঘড়ঘড় করতে করতে থেমে গেল। একটু হেসে বললুম, কর্নেল। ঠেলতে হবে।
কর্নেল গুম হয়ে বসে ছিলেন। চোখ বন্ধ এবং দাড়িতে আঙুলের চিরুনি। বুঝতে পারছিলুম, গোয়েন্দাপ্রবর গঙ্গারাম বনাম বংকারাম নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন। আমার কথায় চোখ খুলে বেজায় চমকানো গলায় বললেন, কী বললে?
ঠেলতে হবে। বলে দরজা খুলে সবে নেমেছি, অবাক হয়ে দেখলুম কর্নেলও হন্তদন্ত নামলেন বটে, কিন্তু নেমেই প্রকাণ্ড শরীর নিয়ে হঠাৎ দৌড়তে শুরু করেছেন। হকচকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম। তারপর দেখি উনি সামনের বাসস্টপে সদ্য-এসে-দাঁড়ানো একটা বাসের পাদানিতে উঠে পড়লেন। তারপর বাসটা ছেড়ে গেল।
এতকাল ধরে ওঁর বিস্তর উদ্ভুটে আচরণ দেখে আসছি। কিন্তু এমনটি কখনও দেখিনি। রাগ করার মানে হয় না, বিশেষ করে এমন একটা ক্ষেত্রে। ফুটপাথের বাসিন্দা একদঙ্গল ছেলে আমার অবস্থা দেখে দৌড়ে এল। তাদের কিছু বলতে হল না। তারা গাড়িটা ঠেলতে শুরু করল। গাড়ি স্টার্ট নিলে তাদের বখশিশ দিয়ে নিজের ডেরায় ফিরে চললুম।
ছুটির দিন আজ। কাগজের আপিসে যাওয়ার তাড়া নেই। খেয়েদেয়ে অভ্যাসমতো ভাতঘুম দিয়ে যখন উঠে পড়লুম, তখন প্রায় পাঁচটা বাজে। মার্চের মাঝামাঝি বেশ গরম পড়েছে। লোডশেডিং না হয়ে গেলে ছটা অব্দি বিছানায় পড়ে থাকতুম।
ব্যালকনিতে বসে তারিয়ে-তারিয়ে চা খাচ্ছি, আমার রাঁধুনি-কাম-কাজের ছেলে ফটিক এসে বলল, সেই দাড়িওলা সায়েব এসেছেন দাদাবাবু!
তারপর কর্নেলের গলা শুনতে পেলুম ডার্লিং, আশা করি এ বুড়োর ওপর থেকে রাগটা এতক্ষণে পড়ে গেছে। হুঁ, মুখের অবস্থা দেখে বুঝতে পারছি, প্রিয় ভাতঘুমখানা চমৎকারই হয়েছে। রাগের পক্ষে নিরেট একখানা ঘুমই যথেষ্ট। যাই হোক, ঝটপট তৈরি হয়ে নাও। কোদণ্ডগিরি এক্সপ্রেস ট্রেন সওয়া ছটায় ছাড়বে হাওড়া থেকে। ভাগ্যিস মিঃ রাঘবনকে ফোনে পেয়েছিলুম। আস্ত একখানা কুপের ব্যবস্থা করা গেছে। কর্নেল আমার কাঁধে থাবা হাঁকড়ালেন। উঠে পড়ো, উঠে পড়ো! হালদারমশাই এতক্ষণে স্টেশনে পৌঁছে হাপিত্যেশ করছেন আমাদের জন্য।
কিছুক্ষণ পরে ট্যাক্সিতে যেতে যেতে ভাবলুম, তখন অমন করে হঠাৎ আমাকে ফেলে পালিয়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইব। কিন্তু গোয়েন্দাপ্রবর তখনকার মতো চোখ বুজে দাড়িতে আঙুলের চিরুনি চালাচ্ছেন এবং বলা যায় না, তখনকার মতোই যদি হঠাৎ রোকে বলে ট্যাক্সি থামিয়ে
আবার বেমক্কা অদৃশ্য হয়ে যান। ওঁকে বিশ্বাস নেই। অতএব চেপে গেলুম।
দশ নম্বর প্ল্যাটফর্মের গেটে কৃতান্ত হালদার দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমাদের দেখে উত্তেজিতভাবে চাপা গলায় বললেন, পাখি বাঁদর সাধু! সব একত্র, সব!
কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, একবার শরীরী, একবার অশরীরী? এই আছে, এই নেই!
হাত প্রচণ্ড নেড়ে হালদারমশাই ফিসফিস করে বললেন, আপন্ গড। একটু আগে এক সাধু আমার দিকে চোখ কটমট করে তাকাতে তাকাতে প্ল্যাটফর্মে ঢুকল। তার কাঁধের ঝোলায় স্পষ্ট দেখলুম একটুকু একটা বাঁদরের মুণ্ডু উঁকি মেরে আছে।
বললুম, আর পাখি?
কর্নেলের পিছন-পিছন হালদারমশাই প্ল্যাটফর্মে ঢুকে তেমনি ফিসফিসিয়ে বললেন, পাখিটা নির্ঘাত ঝোলার ভিতর আছে। এটা অঙ্কের ব্যাপার, বুঝলেন না? সাধু আর বাঁদর যেখানে, পাখি সেখানে থাকতে বাধ্য। আর জানেন? সাধু একা নয়, তার সঙ্গে একজন চেলাও আছে দেখলুম।
