কোদণ্ডগিরি এক্সপ্রেস দাঁড়িয়ে ছিল প্ল্যাটফর্মে। আমাদের কুপেটা পিছনে গার্ডের কামরার লাগোয়া। সামনে একটা গুডস কম্পার্টমেন্ট। ছোট্ট কুপে মাত্র তিনটে বাংক। জিনিসপত্র রেখে আমি ও কর্নেল বসে পড়লুম! হালদারমশাই সাধুবাবাকে খুঁজতে গেলেন। গাড়ি ছাড়ার এখনও মিনিট-দশেক দেরি আছে। ভাবলুম, ট্রেন ছাড়লে তবে কর্নেলের অমন করে ছুটে গিয়ে বাসে ওঠার ব্যাপারটা তুলব। কর্নেল আর যাই করুন চলন্ত ট্রেন থেকে ঝাঁপ দেবেন না নিশ্চয়।
কর্নেল চুরুটের বাক্স বের করে পছন্দসই একটা চুরুট বেছে নিলেন। তারপর লাইটার জ্বেলে চুরুটটা ধরিয়ে একরাশ ধোঁয়ার মধ্যে হঠাৎ বললেন, ডঃ সীতাকান্ত পট্টনায়কের কথা তোমার মনে থাকা উচিত, ডার্লিং।
একটু অবাক হয়ে বললুম, খুব মনে আছে। ফরেনসিক এক্সপার্ট সেই ওড়িয়া ভদ্রলোক তো?
শুধু ফরেনসিক এক্সপার্ট নন উনি, বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখাতেও ওঁর অগাধ জ্ঞান। যেমন ধরো, আণবিক জীববিজ্ঞান জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান। এমনকী, সম্প্রতি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর ওঁর একটা গবেষণাপত্র বিদেশে খুব হইচই সৃষ্টি করেছে। এমন অল-রাউন্ডার জিনিয়াস সচরাচর দেখা যায় না—বিশেষ করে যুগটা যখন স্পেশালিস্টদেরই, তখন এতগুলো বিদ্যায় যিনি সমান স্পেশালিস্ট তাঁকে এতদিন কেন নোবেল প্রাইজ দেওয়া হয়নি, জানি না।
কর্নেলের বক্তব্যের উদ্দেশ্য বুঝতে না পেরে বললুম, দেবেখন। কিন্তু হঠাৎ ডঃ পট্টনায়কের কথা কেন?
কর্নেল হাসলেন। সম্প্রতি ডঃ পট্টনায়ক কলকাতা এসেছেন। সুন্দরীমোহন অ্যাভেনিউতে ফরেনসিক ল্যাবরেটরি এবং ডিটেকটিভ ট্রেনিং সেন্টারটা তুমি দেখে থাকবে, জয়ন্ত। আজ রবিবার বারোটায় ওঁর সেখানে একটা লেকচার দেওয়ার কথা ছিল।
কী কাণ্ড! হাসতে হাসতে বললুম। তাই হঠাৎ অমন করে দৌড়ে গেলেন—
আমার কথা কেড়ে কর্নেল বললেন, তুমি যেই বললে ঠেলতে হবে অমনি প্রাচীন গ্রিক বিজ্ঞানী আর্কিমেডিসের মতো আমার মাথা খুলে গিয়েছিল। সেই ইউরেকা ব্যাপারটা ঘটে গিয়েছিল আর কি! তক্ষুনি ফরেনসিক ল্যাবরেটরির হলে পৌঁছে ডঃ পট্টনায়কের কানে কানে বললুম, রহস্য ফাঁস করেছি ডঃ পট্টনায়ক! PUSHPA শব্দটা আসলে PUSH PANEL A অর্থাৎ এ-মার্কা প্যানেলটা ঠেলতে হবে। খামোখা পুষ্প বা ফুল নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিলুম।
কিন্তু জিনিসটা কী?
জিনিসটা আজ সকালে তুমি আমার হাতে দেখেছ, ডার্লিং!
ভ্যাট! ওটা তো একটুকরো হাড় বলে মনে হচ্ছিল, কিংবা পাথুরে ফসিল!
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, মোটেও না জয়ন্ত। ছোট্ট মাউথ অর্গানের মতো জিনিসটা আসলে একটা রিমোট কন্ট্রোল যন্ত্র। দুটো প্যানেলে ভাগ করা, এ এবং বি। এ-কে ঠেলে দিতেই ওটা চালু হয়ে গেল। কিন্তু আমার বা ডঃ পট্টনায়কের তো জানা নেই মূল কোন যন্ত্রকে এটা চালিত করে দূর থেকে। তাই সঙ্গে সঙ্গে বি প্যানেলটা ঠেলে নিষ্ক্রিয় করে দিলুম। হ্যাঁ তোমাকে বলা উচিত, এই অদ্ভুত যন্ত্রটা মাস দুই আগে পট্টনায়কই কুড়িয়ে পেয়েছিলেন পার্বতী নদীর বালির চড়ায়। বালিতে প্রায় পুরোটা ঢাকা অবস্থায় ছিল। কিন্তু সিলিকন ধাতুর পাতে মোড়া। তাই ময়লা হয়ে গেলেও নষ্ট হয়ে যায়নি।
পার্বতী নদীর নাম তো কখনও শুনিনি! সেটা আবার কোথায়?
কোদণ্ডগিরি এলাকায়।
কী? আমি নড়ে বসলুম এবং ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম!
কর্নেল চুরুটের ধোঁয়ার মধ্যে বললেন, সুতরাং হালদারমশাই আসার আগেই কোদণ্ডগিরি যাত্রার জন্য তৈরি হচ্ছিলুম ভেতর-ভেতর। যথাসময়ে জানতে পারতে। আশা করি, কাল সকালের মধ্যে ডঃ পট্টনায়কও প্লেনে ভুবনেশ্বর পৌঁছে যাবেন। কোদণ্ডগিরি টাউনশিপে আমাদের সাক্ষাৎ হবে। তারপর কাজে নামব আমরা।
এই সময় হালদারমশাই হাঁফাতে হাঁফাতে এসে পড়লেন। চাপা গলায় বললেন, সাধু, পাখি, বাঁদর-সব একত্র। সামনে দুটো কম্পার্টমেন্টের পরেরটায় উঠেছে। কর্নেলস্যার! রহস্য একেবারে জমজমাট।
তিন
হালদারমশাই বলেছিলেন, ট্রেন জার্নিতে তার নাকি আদপে ঘুমই হয় না। অথচ সারা পথ দেখলুম, দিব্যি নাক ডাকিয়ে ওপরের বাংকে ঘুমোচ্ছেন। ভোর সাড়ে-ছটায় কোদণ্ডগিরি স্টেশনে যখন ট্রেন ঢুকছে, তখন উনি ঘুমে কাঠ। ওঁকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেওয়ামাত্র তড়াক করে উঠে বসলেন এবং বললেন, খড়গপুর এল মনে হচ্ছে।
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, না হালদারমশাই, কোদণ্ডগিরি এসে গেছি। নিন, উঠে পড়ুন।
হালদারমশাই আঁ বলে দমাস করে বাংক থেকে লাফ দিলেন। ট্রেন তখনও থেমে যায়নি। সে অবস্থায় দরজা খুলে প্ল্যাটফর্মে আর একটা ঝাঁপ দিলেন। আছাড়ও খেলেন দেখলুম। তারপর আর ওঁকে দেখতে পেলুম না। বুঝলুম সাধু, পাখি ও বাঁদরের খোঁজেই উধাও হলেন।
সত্যিই উধাও। প্ল্যাটফর্মে বিস্তর তেঁড়াছুঁড়ি করেও আর ওঁর পাত্তা পাওয়া গেল না। অগত্যা ওঁর বোঁচকা আমাকেই বইতে হল। কর্নেলকে কিন্তু একটুও উদ্বিগ্ন মনে হল না। নির্বিকার মুখে বললেন, চলো জয়ন্ত, আমাদের এখন প্রায় বারো কিলোমিটার পাড়ি জমাতে হবে। হালদারমশাইয়েরই ভাগ্নেবাড়ি। কাজেই যথাসময়ে উনি পৌঁছে যাবেন।
একটা অটো-রিকশো ভাড়া করে আমরা রওনা দিলুম। আমার কিন্তু ব্যাপারটা মোটেও ভাল ঠেকছিল না। হালদারমশাই কোনও বিপদে পড়েননি তো? কর্নেল সেটা আঁচ করে মৃদু হেসে বললেন, ভেবো না জয়ন্ত! হালদারমশাই সারা জীবন পুলিশে চাকরি করেছেন। তত নিরীহ মানুষ নন।
