হালদারমশাই বললেন, আর পাখিটাও পালটা শিস দিচ্ছিল! মজাটা বুঝুন একবার।
কর্নেল একটু হাসলেন। সুতরাং রহস্য ঘনীভূত হল বলা যায়।
আমি বললুম, হালদারমশাই, এর সঙ্গে সেই অদৃশ্য হতে পারা অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন সাধুর ব্যাপারটার কোনও যোগাযোগ নেই তো?
হালদারমশাই এদিকে-ওদিকে তাকিয়ে নিয়ে চাপা স্বরে বললেন, আছে বলেই তো কর্নেলস্যারের কাছে আসা। ট্রেনে পাখিটাকে লুকিয়ে আনছিলুম। নইলে রেলবাবুরা আপত্তি করতেন। তো মাঝরাত্তিরে হঠাৎ চোখ খুলে দেখি, এক সাধু আমার বাংকের কাছে এসে উঁকিঝুঁকি মারছে। তড়াক করে উঠে বসেছি। আর অবাক কাণ্ড, সাধু অদৃশ্য। বেমালুম হাওয়া।
কর্নেল বললেন, আশা করি, স্বপ্ন দেখছিলেন না?
কখনও না। ট্রেন জার্নিতে আদপে আমার ঘুম হয় না।
আবার ফোন বাজল। কর্নেল ফোন তুলে সাড়া দিয়েই কৃতান্ত হালদারকে দিলেন। হালদারমশাই আগের মতো চড়া গলায় বললেন, দুলাল?…কী? লোম? সাদা ললাম? বলিস কী?…যাচ্ছি। এখনই যাচ্ছি।
ফোন ছেড়ে উত্তেজিতভাবে হালদারমশাই বললেন, কর্নেল, এক্ষুনি আমার সঙ্গে চলুন দয়া করে। খাঁচায় আর বারান্দা জুড়ে একগাদা সাদা লোম দেখতে পেয়েছে দুলাল। কী সাংঘাতিক রহস্য বুঝুন।
দুই
এই লোমরহস্য আমার তত সাংঘাতিক মনে হচ্ছে না হালদারমশাই, কর্নেল সাদা লোমগুলো পরীক্ষা করতে করতে বললেন। এগুলো নিছক বাঁদরের লোম। তবে সাধারণ বাঁদর নয়, খুদে বাঁদর। স্কুইরেল মাংকি বলে যাদের।
কৃতান্ত হালদার অবাক হয়ে বললেন, স্কুইরেল মানে তো কাঠবেড়ালি।
হ্যাঁ। কাঠবেড়ালির সঙ্গে অনেকটা মিল আছে বটে। বাঁদরটা দশ-বারো ইঞ্চি লম্বা। দিব্যি পকেটে রাখা যায়।
কিন্তু এখানে কোত্থেকে এল অমন উদ্ভুট্টে জীব? কিছু যে বোঝা যাচ্ছে না স্যার!
কর্নেল গ্রিল-দেওয়া বারান্দায় একটু ঘোরাঘুরি করে এদিকে-ওদিক দেখে নিয়ে বললেন, পাখিটার কিছু পালক পড়ে আছে দেখেও বুঝতে পারছেন না?
আমার বুদ্ধিসুদ্ধি গুলিয়ে গেছে, কর্নেল! বারান্দায় একটা চেয়ারে হতাশভাবে বসে পড়লেন হালদারমশাই। ডাক্তার পরের রোগ ধরে চিকিৎসা করেন। কিন্তু নিজের রোগ হলে অন্য ডাক্তার ডাকেন। কেন ডাকেন, হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি। উরেব্বাস! বিস্তর রহস্য ঘেঁটেছি, এবার আমাকেই রহস্য-রোগ এসে জাপটে ধরেছে।
কর্নেল হাসলেন। স্কুইরেল মাংকির লোম আর ময়নাপাখির পালক পড়ে থাকাটা মুল রহস্যরোগ নয়, হালদারমশাই! নেহাত উপসর্গ।
কখন থেকে মুখ খোলার জন্য উসখুস করছিলুম। এবার বললুম, ব্যাপারটা ধরতে পেরেছি মনে হচ্ছে।
কর্নেল বললেন, বলো ডার্লিং!
কেউ একটা ট্রেন্ড খুদে বাঁদর পাঠিয়ে পাখিটা খাঁচা থেকে হাতিয়ে নিয়েছে। মিথ্যা করে বাইরের দরজায় কলিং বেল টিপেছে। দুলাল দেখতে গেছে কে ডাকছে, আর এদিকে তার বাঁদর গ্রিলের ভেতর দিকে ঢুকে খাঁচা খুলে পাখিটা ধরেছে। পাখি আর বাঁদরে একটু ধস্তাধস্তি হওয়া স্বাভাবিক। তাই এসব লোম আর পালক।
কৃতান্ত হালদার লাফিয়ে এসে আমাকে জাড়িয়ে ধরলেন। শাবাশ জয়ন্তবাবু! শাবাশ! দেখছেন? এই সামান্য ব্যাপারটা কিছুতেই আমার মাথায় আসছিল না।
কর্নেল ততক্ষণে বাইরে চলে গেছেন। বাড়িটা একতলা এবং পুরনো পূর্ব শহরতলি এলাকার নিরিবিলি পরিবেশে অবস্থিত। আশেপাশে পোড় জঙ্গলে জমি, একটা পুকুর আর প্রচুর গাছপালাও রয়েছে। কিছু নতুন বাড়ি তৈরি হচ্ছে এখানে-ওখানে। তার ওপরে একটা বিস্তীর্ণ মুসলিম গোরস্থান। এমন জায়গায় শুধু চোর কেন, ভূতপেরেতদেরও দিনদুপুরে হানা দেওয়া স্বাভাবিক।
হালদারমশাইয়ের ভাগ্নে শ্রীমান দুলালের বয়স পনেরো-ষােলোর বেশি নয়। সবে স্কুল-ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছে। এখনও রেজাল্ট বেরোয়নি। মামার মতোই লম্বাটে ছিপছিপে গড়ন। মুখচোরা ছেলে বলে মনে হচ্ছিল। এই কাণ্ডের পর বেচারা ভীষণ মুষড়ে পড়েছে। দেয়ালে হেলান দিয়ে প্যাটপ্যাট করে তাকাচ্ছে খালি। আমার কথা শোনার পর সে বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ। বাইরের দরজা খুলে কাউকে দেখতে না পেয়ে যখন রাস্তা দেখছি, পাখিটার চঁচামেচি কানে এসেছিল যেন। এতক্ষণে মনে পড়ল।
ভাগ্নেকে ভেংচি কেটে হালদারমশাই বললেন, আঁতক্ষণে মনে পড়ল! স্কুলে তুই স্ট্যান্ড করিস হাতি করিস! মুখস্থ বিদ্যের শিরোমণি! রিয়্যাল লাইফে তুই স্ট্যান্ড করতে পারবি ভেবেছিস? সে-গুড়ে বালি।
দুলালকে কাছে টেনে নিয়ে বললুম, আহা! মিছিমিছি ওকে বকবেন না হালদারমশাই! আপনি বাড়িতে একা থাকলেও একই ব্যাপার ঘটত না কি?
বুঝতে পেরে হালদারমশাই ধাতস্থ হলেন। গোঁফ চুলকে বললেন, কিন্তু মাই নেম ইজ গঙ্গারাম। আই অ্যাম কিল্ড বাই গঙ্গারাম। ব্যাপারটা কী বলুন তো? পাখিটা এমন উদ্ভুট্টে কথা শিখল কী করে? ধরে নিচ্ছি, কেউ শিখিয়েছে। কিন্তু গঙ্গারাম গঙ্গারামকে খুন করে কীভাবে? সুইসাইড মনে হয় না আপনার?
বললুম, হ্যাঁ, সুইসাইড ধরে নিলে একটা অর্থ দাঁড়ায়।
কর্নেল বাইরে থেকে ঘুরে এসে বললেন, এখানে আর কোনও সূত্র মিলবে না, হালদারমশাই! কোদণ্ডগিরিতে গেলে কিছু সূত্র মিলতেও পারে। পাখিটা যখন সেখানেই পেয়েছিলেন!
হালদারমশাই বললেন, তা না হয় যাওয়া গেল। কিন্তু গঙ্গারাম ইজ কিল্ড বাই গঙ্গারাম ব্যাপারটা যে আত্মহত্যা, তাতে জয়ন্তবাবু আর আমি একমত হয়েছি কর্নেল স্যার!
কর্নেল আনমনে বললেন, পাখির কথা ঠিকমতো বুঝতেও ভুল হতে পারে। আমি একবার শুনতে পেলে হয়তো বুঝতে পারতুম, ঠিক কী বলছে।
