বিব্রত হালদারমশাই জিভ কেটে বললেন, ছি, ছি! এ কী বলছেন স্যার! এই জয়ন্তবাবুকে জিজ্ঞেস করুন, ওঁদের দৈনিক সত্যসেবকে এ-খবর বেরিয়েছে কি না।
চ্যাটার্জি বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, দেখেছিলুম বটে।
শর্মা আমার দিকে চোখের ঝিলিক তুলে বললেন, বাঃ! তাহলে জয়ন্তকে ম্যানেজ করে ফেলেছেন! সত্যি, আপনার কোনও তুলনা হয় না হালদারমশাই!
আমি ঝটপট বললুম, কখনও না। খবরটা নিউজ এজেন্সি থেকে পাওয়া। তাছাড়া হালদারমশাইও ব্যাপারটা যে দেখে এসেছেন, এ আমি এইমাত্র শুনছি।
ব্রিগেডিয়ার সিং দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, নিউজ এজেন্সির যে রিপোর্টার এই খবর জোগাড় করেছে, তার সঙ্গে হালদারমশাইয়ের যোগাযোগ ঘটেছিল কি না আমরা অবশ্য জানি না।
হালদারমশাই কী বলতে যাচ্ছিলেন, চ্যাটার্জি ঘড়ি দেখে লাফিয়ে উঠেলেন। মাই গুডনেস! সাড়ে দশটা বাজে। করছি কী আমি? সিপি-র সঙ্গে জরুরি কনফারেন্স! মিঃ শর্মা, মিঃ মণ্ডল, কী ব্যাপার? আপনাদের তাড়া দেখছি না যে!
দুজনেই তাই তো বলে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর তিন পুলিশ-জাঁদরেল কর্নেলের উদ্দেশে বাই হেঁকে বেরিয়ে গেলেন। ব্রিগেডিয়ার সিংও হাই তুলে উঠে দাঁড়ালেন। তিনিও কর্নেলের কাছে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।
ষষ্ঠী ডাইনিং ঘরের দরজায় পর্দা ফাঁক করে উঁকি দিচ্ছিল। বলল, যা বাব্বা! আবার যে কোফি করলুম একগাদা। খাবে কে এত?
কর্নেল হাড়ের মতো জিনিসটা আর আতশকাচ রেখে বললেন, কোফি করেছিস?
আজ্ঞে বাবামশাই।
কর্নেল হালদারমশায়ের উদ্দেশে বললেন, কী হালদারমশাই, সাধুকে তো অদৃশ্য হতে দেখেছেন। কিন্তু কখনও কোফি খেয়েছেন কি? এ বস্তু একমাত্র ষষ্ঠীই বানাতে পারে।
ষষ্ঠী ট্রে নিয়ে আসছিল। জিভ কেটে বলল, কঁফি! কঁফি!
ঠিক আছে। কঁফিই খাওয়া যাক। কর্নেল উঠে আমাদের কাছে এসে বসলেন।
কর্নেলের এ পরিহাসে মন নেই হালদারমশাইয়ের। ফেঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললেন, কীরকম অপমানিত হলুম দেখুন কর্নেল! আপনার মতো বহুদর্শী জ্ঞানী লোক আমার কথাটা উড়িয়ে দিতে পারছেন না। আর এই সব পুঁচকে ছোকরা অফিসার—আমার ছেলের বয়সী সব!
দুঃখ করবেন না হালদারমশাই, কর্নেল সান্ত্বনা দিয়ে বললেন। তারপর নিজের হাতে কফি ঢেলে প্রচুর দুধ মিশিয়ে পেয়ালা এগিয়ে দিলেন তার দিকে। বাস্তব কিছু-কিছু ঘটনা অনেককে প্রচণ্ড ধাক্কা দেয়। জানেন তো, টুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন?
বললুম, কোদণ্ডগিরির সাধুর ব্যাপারটা আপনি বাস্তব ঘটনা বলছেন নাকি?
কর্নেল আমার প্রশ্নের জবাব দিলেন না। হালদারমশাই সড়াক শব্দে গরম কফি টেনে ব্যস্তভাবে গিলতে গিলতে বললেন, বাস্তব মানে? স্বচক্ষে দেখে এসেছি আমি। মাত্র একটা ঝরনার
এধার-ওধার। ওধারে পাথরের উপর সাধুবাবা, এধারে পাথরের আড়ালে আমি।
দিনে, না রাত্তিরে?
রাত্তিরে। তবে জ্যোৎস্না ছিল। পরিষ্কার ঝলমলে আলো। তাছাড়া শুধু ওখানে নয়, পরে ট্রেনেও।
ফোন বাজলে ওঁর কথায় বাধা পড়ল। কর্নেল হাত বাড়িয়ে ফোন তুলে সাড়া দিলেন। তারপর বললেন, কে? কে কে হালদার? হুঁ, আছেন। ধরুন, দিচ্ছি।
হালদারমশাই খপ করে ফোন কেড়ে নিয়ে চড়া গলায় বললেন, দুলাল নাকি?…কী? পালিয়ে গেছে? হতভাগা বাঁদর ছেলে! তোকে পইপই করে বলা আছে…না, না। কোনও কথা শুনতে চাইনে তোর। যেমন করে পারিস, খুঁজে ধরে নিয়ে আয়। নইলে…হ্যাঁ, হ্যাঁ। আশেপাশে… কাছাকাছি… যত্ত সব!
শব্দ করে ফোন রেখে হালদারমশাই গোঁজ হয়ে বসলেন কর্নেল মৃদু স্বরে বললেন, পাখি নাকি?
হুঁঃ!
কথা-বলা পাখি?
হুঁঃ!
বুঝতে পারছিলুম, হালদারমশাই রেগে আগুন হয়ে আছেন এবং আনমনে হুঃ দিচ্ছেন শুধু। এবার কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, কথা-বলা পাখিটা কি কোদণ্ডগিরির জঙ্গল থেকে এনেছিলেন। হালদারমশাই?
কৃতান্ত হালদার তড়াক করে ঘুরে বললেন, আরে, ওটার ব্যাপারেই তো আসা আপনার কাছে। এখন দেখুন তো কী করি! আমার ভাগ্নে দুলালকে নজর রাখতে বলে এসেছিলুম। পর-পর দুরাত্তির বাড়িতে চোর আসছে। অদ্ভুত ব্যাপার, চোর জানালার ধারে দাঁড়িয়ে শিস দেয়। তখন পাখিটাও শিস দেয়। বড় রহস্যময় ব্যাপার নয়, কর্নেল?
রহস্যময় বলেই মনে হচ্ছে। তা পাখিটা পালাল কীভাবে?
দুলাল বলল, বাইরে কে ডাকছিল। গিয়ে দ্যাখে, কেউ না। তারপর ফিরে এসে দ্যাখে, বারান্দার খাঁচা খোলা। অথচ দেখুন, বারান্দায় গ্রিল আছে।
বাড়িতে আর কোনও লোক নেই?
আজ্ঞে না। হালদারমশাই নস্যির কৌটো বের করে অনেকটা নস্যি নাকে খুঁজে হাঁ করে রইলেন। কিন্তু হাঁচি এল না।
কর্নেল বললেন, পাখিটা কি কাকাতুয়া, না ময়না?
ময়না, হালদারমশাই করুণ মুখে বললেন। ওটার ব্যাপারেই আপনার সঙ্গে কনসাল্ট করতে আসা কর্নেলস্যার! আপনি ঠিকই ধরেছেন। কোদণ্ডগিরির জঙ্গলে একটা আদিবাসী ছেলে ফাঁদ পেতে পাখিটা ধরেছিল। কথা বলতে পারে দেখে কিনে নিয়েছিলুম।
তাহলে নিশ্চয় কারুর পোষা পাখি। উড়ে গিয়ে জঙ্গলে বেড়াচ্ছিল।
ঠিক বলেছেন। কিন্তু সেটা কোনও রহস্য নয়। রহস্য হল পাখিটার বুলি। প্রথমে বুঝতে পারিনি। পরে বুঝলুম, বলছে : মাই নেম ইজ গঙ্গারাম। আই অ্যাম কিচ্ছু বাই গঙ্গারাম। গঙ্গারাম কেন গঙ্গারামকে কিল করবে, এটা একটা রহস্য নয় স্যার?
অবশ্যই। কর্নেল পর্যায়ক্রমে টাক এবং সাদা দাড়িতে ঘন ঘন হাত বুলোতে থাকলেন।
বুঝলুম, রহস্যটা মনে ধরেছে আমার বৃদ্ধ বন্ধুর। তাতে আরও একটু জোগান দেওয়ার ইচ্ছেয় বললুম, রাত্তিরে চোর এসে শিস দিচ্ছিল বললেন হালদারমশাই!
