ব্রিগেডিয়ার ইকবাল সিং বললেন, তা বলতে পারব না। যা দেখেছি, তাই বলছি। সন্ন্যাসীর বোঁচকার ভেতর পাওয়া গিয়েছিল একগাদা কোকেন, মারিজুয়ানা, এলএসডি, কয়েকরকম নার্কোটিক্স।
ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চের রঘুবীর শর্মা তাকে সমর্থন করে বললেন, চ্যাটার্জিসায়েব! সত্যি বলতে কী, সাধু বলুন, সন্ন্যাসী বলুন, ফকির বলুন, কেউ সংসারত্যাগী নন।
চ্যাটার্জি বললেন, কেন নন?
শর্মা হাসলেন। মশাই, কোনও মানুষের পক্ষে কি সত্যিই সংসার ত্যাগ করা সম্ভব? একটু ভেবে দেখলেই ব্যাপারটা বুঝনেন। ওঁরা আসলে নিজেদের ব্যক্তিগত সংসার ত্যাগ করেছেন, তার মানে পরিবার বা আত্মীয়স্বজনকে ছেড়েছেন। কিন্তু তার বদলে অন্যান্য মানুষকে নিয়েই তাদের চলতে হয়। আমাদের মতোই তাদের ট্রেনে-বাসে চাপতে হয়।
ব্রিগেডিয়ার সিং দাড়ি চুলকে মন্তব্য করলেন, প্লেনেও।
হ্যাঁ, প্লেনেও, শর্মা জোর দিয়ে বললেন। তাছাড়া তাদের পেটে খেতেও হয়। না খেলে তো বাঁচা যায় না।
মণ্ডল বললেন, শুনেছি, কোনও-কোনও সাধু নাকি স্রেফ বাতাস খেয়ে থাকেন।
কর্নেল এক কোণায় বসে আপনমনে আতশকাচ দিয়ে এক টুকরো হাড়ের মতো দেখখে কী একটা জিনিস পরীক্ষা করছিলেন। মুখ তুলে ফোড়ন কাটালেন, সাপকে বায়ুভুক বলা হত প্রাচীনকালে। কথাটা ভুল।
ভুল তো বটেই, শর্মা দাপটের সঙ্গে বললেন। শুধু বাতাস খেয়ে কোনও প্রাণীর পক্ষে বাঁচা সম্ভব নয়। কাজেই যা বলছিলুম, নিছক খাদ্যের জন্যও সাধু-সন্ন্যাসী-ফকিরদের সংসারের নাগালে। থাকতেই হয়।
চ্যাটার্জি বললেন, কী বলছেন! হিমালয়ের দুর্গম স্থানে কত সাধু থাকেন।
ইকবাল সিং হাসতে-হাসতে বললেন, আপনার কথায় লজিক নেই। যদি দুর্গম স্থানে সত্যি কেউ থাকেন, তাঁকে দেখল কে? তাছাড়া হিমালয় বাস্তবিক তত দুর্গম নয়। প্রাচীন যুগ থেকেই মানুষের পা তার সবখানেই পড়েছে। আমি দেখেছি, হিমালয়ে যত সাধু থাকেন, সকলের ডেরা কোনও-না-কোনও তীর্থে অথবা তীর্থপথের ধারে। তীর্থপথের আনাচে-কানাচেও কাউকে থাকতে দেখেছি। শর্মাসায়েব ঠিকই বলেছেন। সাধু-সন্ন্যাসীদের সংসারত্যাগী বলা হয় বটে, কিন্তু সংসারী মানুষদের ছাড়া তাদের চলে না। অবশ্য বলতে পারেন, ছোট সংসার ছেড়ে বড় সংসারে ঢোকেন তারা।
মণ্ডল বললেন, তা না হয় মেনে নিচ্ছি। কিন্তু সাধুদের অলৌকিক ক্ষমতা সম্পর্কে আপনার কী বক্তব্য।
মানুষের সমস্ত ক্ষমতা লৌকিক শর্মা বললেন, সাধুরা কেউ কেউ ম্যাজিক দেখান আসলে।
ইকবাল সিং তাকে সমর্থন করে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, চ্যাটার্জি বলে উঠলেন, ম্যাজিক কী বলছেন মশাই! কোনারকের ওখানে এক সাধুকে এক হাত উঁচুতে, স্রেফ শূন্যে বসে ধ্যানস্থ দেখেছি।
শর্মা এবং সিং হো-হো করে হেসে উঠলেন। মণ্ডল বললেন, বলেন কী! হঠযোগীরা এমন করেন শুনেছি।
চ্যাটার্জি বললেন, নিজের চোখকে তো মশাই অবিশ্বাস করতে পারব না, সে আপনারা যাই। বলুন। সমুদ্রের ধারে পরিষ্কার জ্যোৎস্না ছিল। সাধুবাবা মিনিট-দুয়েক ওইভাবে শূন্যে থাকার পর মাটিতে নামলেন।
একটু তফাতে আমার পাশে বসে ছিলেন প্রাইভেট গোয়েন্দা কৃতান্তকুমার হালদার। কে কে। খাদার নামে ইদানীং পরিচিত। ঢ্যাঙা গড়নের মানুষ। পেল্লায় গোঁফ। পুলিশের সিআই ছিলেন মফস্বলে। রিটায়ার করে প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলেছেন গণেশ অ্যাভেনিউতে, তিনতলা একটা বাড়ির ছাদে অ্যাসবেস্টসের চাল চাপানো একটা ছোট্ট ঘর। রাস্তা থেকে সাইন বোর্ডটা চোখে পড়ে : হালদার ডিটেকটিভ এজেন্সি। তলায় ইংরেজিতে লেখা : রহস্যের ধাঁধায় পড়লে, চলে আসুন।
হালদারমশাই আজ কর্নেলের আড্ডায় কেন এসেছেন জানি না। কর্নেলের কাছে বোধ করি কোনও ব্যাপারে পরামর্শ নিতেই এসে থাকবেন। হোমরা-চোমরাদের কথার মধ্যে এতক্ষণ নাক গলাতে ভরসা পাচ্ছিলেন না হয়তো। কিছুক্ষণ থেকে ওঁকে উসখুস করতে এবং ঘন ঘন নস্যি নিতে দেখছিলুম। বাথরুমে বারবার হাঁচতে যাচ্ছিলেন, সে অবশ্য হলফ করে বলতে পারি। এবার আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। বললেন, যদি কিছু মনে না করেন স্যার–
ব্রিগেডিয়ার সিং বললে, না, না! বলুন কী বলতে চান।
হালদারমশাই বললেন, চ্যাটার্জির্সায়েব তো শূন্যে সাধুবাবাকে ধ্যান করতে দেখেছেন। আমি সম্প্রতি কোদণ্ডগিরির জঙ্গলে গিয়েছিলুম বেড়াতে। সেখানে আমার এক ভাগ্নে ফরেস্ট অফিসার। খুব তেজি আর সাহসী
শর্মা বিরক্ত হয়ে বললেন, আহা! কী দেখেছেন, তাই বলুন।
হালদারমশাই মুখে বিস্ময় ফুটিয়ে বললেন, স্বচক্ষে দেখে এলুম স্যার, এক সাধুবাবা বেমালুম অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন, আবার দৃশ্য হচ্ছেন। এক্ষুনি অদৃশ্য হচ্ছেন, আর তক্ষুনি দৃশ্য হচ্ছেন। এই অশরীরী, এই শরীরী। একবার দেখছি নেই, একবার দেখছি আছেন।
বলার ভঙ্গিতেই ঘরে অট্টহাসির ঘুম পড়ে গেল। তারপর শর্মা ভুরু কুঁচকে বললেন, আপনাকে চেনা-চেনা লাগছে যেন? আপনি?
অধমের নাম কে কে হালদার, হালদারমশাই কঁচুমাচু মুখে বললেন। তবে চিনবেন বইকী স্যার! আপনিই তো আমার প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সির লাইসেন্সের দরখাস্তে কাউন্টারসাইন করেছিলেন। নইলে লাইসেন্স পাওয়া কঠিন হত।
শর্মা হাসতে হাসতে বললেন, তাই বলুন! আপনিই সেই গোয়েন্দা হালদার? বুঝেছি। এবার এইসব গুলতাপ্পি ঝেড়ে মক্কেলের সংখ্যা বৃদ্ধির মতলব করেছেন বুঝি?
