কর্নেল চুরুট ধরালেন। আমি বললাম, এবার মনে হচ্ছে, আপনার ঘরে কেউ আপনার দাদার চোরাই জিনিস বা তা বিক্রি করা টাকা খুঁজতেই ঢোকে।
প্রাণনাথবাবু প্রায় আর্তনাদ করলেন, তেমন কিছু এ ঘরে নেই।
কর্নেল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। বললেন, আপনার দাদা বলেছিলেন টাইম ইজ মানি। তাই না?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
টাইমের সঙ্গে ঘড়ির সম্পর্ক আছে। আপনি ঘড়িটা সারাতে দিচ্ছেন না কেন?
সারাতে অনেক টাকা লাগবে। অত টাকা পাব কোথায়?
আমি নিজের খরচে সারিয়ে দেব। আমার ধারণা, ঘড়িটা চালু হলে আপনার ঘরে আর ভূতের উপদ্রব হবে না। ওই অচল ঘড়িই আপনার ঘরে ভূত ডেকে আনছে।
প্রাণনাথবাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন।
কর্নেল চেয়ার টেনে নিয়ে দেওয়ালঘড়ির তলায় গেলেন। তারপর চেয়ারে উঠে প্রকাণ্ড ঘড়িটা নামিয়ে আনলেন। বললেন, দিনসাতেক পরে আমার কাছ থেকে এটা ফেরত দিয়ে আসবেন। কোনও বড় কোম্পানিতে এটা সারাতে দেব।
ইলিয়ট রোডে তিনতলার অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে কর্নেল ঘড়িটা খুলতে শুরু করলেন। বললাম, সব ছেড়ে এই ঘড়ি নিয়ে পড়লেন কেন?
কর্নেল হাসলেন, কারণ টাইম ইজ মানি।
কর্নেল! আমার ভয় হচ্ছে এই অচল ঘড়ি আপনার মগজও অচল করে দিয়েছে।
ডায়ালের কাচ খুলে আতস কাচ রেখে কী দেখতে দেখতে কর্নেল বললেন, এবার স্পষ্ট পড়া যাচ্ছে। প্রেজেন্টেড টু মিঃ জয়গোবিন্দ রায় ফর হিজ সিনসিয়ার সার্ভিস অ্যান্ড অনেস্টি, অন দা অকেশন অব কুমারবাহাদুর প্রমথনারায়ণ চৌধুরিস সেভেনটি ফার্স্ট বার্থ অ্যানিভার্সারি…
চমকে উঠলাম। কর্নেল! এটা তো তা হলে সৈদাবাদ রাজবাড়ির উপহার। এই উপহার হরনাথের হাতে গেল কী করে?
ডার্লিং! হরনাথই জয়গোবিন্দ। হরনাথের সুটকেসের ভেতর কয়েকটা পুরনো নেমকার্ড খুঁজে পেয়েছি। এই দ্যাখো, হরনাথ নাম ভঁড়িয়ে রাজবাড়িতে কেয়ারটেকারের চাকরি জুটিয়েছিল।
বুঝেছি। কিন্তু জড়োয়া নেকলেসটা গেল কোথায়?
ভুলে যাচ্ছ জয়ন্ত! মৃত্যুর সময় হরনাথ বলেছিল, পানু! টাইম ইজ মানি। কথাটা মনে রাখিস। পানুবাবু সূত্রটা বুঝতে পারেননি। নেকলেস চুরি যায় রাত সাড়ে বারোটায়। এই ঘড়ির কাল তাই সাড়ে বারোটায় রেখেছিল হরনাথ। আর নেকলেসটা— বলে কর্নেল ডায়াল খুলে ফেললেন এবং ভেতর থেকে একটা লাল ভেলভেটে মোড়া প্যাকেট বের করলেন। প্যাকেট খুলতেই দেখা গেল ঝলমলে হিরে-মুক্তোবসানো সোনার ঝালর দেওয়া একটা জড়োয়া নেকলেস। কর্নেল মিটিমিটি হেসে ফের বললেন, টাইম ইজ মানি! তবে হরনাথ কীভাবে নেকলেসটা চুরি করেছিল, এখন বুঝতে পারছি। এই দ্যাখো, পিঠের দিকে নেকলেসটার ক্লিপ ঠিকভাবে আঁটা নেই। সহজেই খোলা যায় কিংবা নিজে থেকেও খুলে পড়তে পারে। বিয়ের পার্টিতে নতুন বউমা নিশ্চয়। ঘুমে ঢুলছিলেন। সেই সময় নেকলেস খসে পড়ে থাকবে। কেয়ারটেকার উপহারসামগ্রীর দায়িত্বে ছিল। সে সুযোগটা ছাড়েনি। ক্লিয়ার?
সায় দিয়ে বললাম, অল ক্লিয়ার। টাইম ইজ মানি, এটাও ক্লিয়ার।
১.০৩ ব্ল্যাক প্যান্থার রহস্য
সেবার অক্টোবরে ধরমতাল হ্রদ দেখে লোহাগড় ফেরার পথে বিকেল হয়ে গেল।
ওটা আসলে প্রাগৈতিহাসিক যুগে মৃত একটা আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ। হাজার-হাজার বছর ধরে বর্ষার জল জমে বিশাল হ্রদ হয়েছে। মধ্যিখানে ক্ষুদে দ্বীপের মতো কয়েকটা জঙ্গুলে জলটুঙি।
আমার বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদ বন্ধু বাইনোকুলারে কোনও জলটুঙির শীর্ষে কবে নাকি সেক্রেটারি বার্ড আবিষ্কার করে গিয়েছিলেন। এবারকার অভিযান তার ছবি তুলতে। দুঃখের বিষয়, সেবার তার ক্যামেরায় টেলিলেন্স ছিল না। এবার তাই টেলিলেন্স এনেছিলেন।
সেক্রেটারি বার্ডকে বাংলায় কেরানি পাখি বলা হয়। কারণ সারসজাতীয় এই পাখিকে দেখলে মনে হয় কানে কলম গোঁজা আছে। কিন্তু ধুরন্ধর প্রকৃতিবিদের চেয়ে পাখিটা আরও ধুরন্ধর। কয়েক ঘন্টা ছুটোছুটি, বাইনোকুলারে খোঁজাখুঁজি এবং ক্যামেরার টেলিলেন্স তাক করা ব্যর্থ হল। কতবার টুপি খসে গিয়ে ওঁর টাক চকমক করল। সাদা সান্তাক্লজ দাড়িতে মাকড়সা জালসমেত আটকে গেল। অবশেষে লোহাগড় খনিজ সম্পদ দফতরের পাবলিক রিলেশন অফিসার (পি আর ও) ইকবাল আমেদ তাড়া দিলেন, কর্নেল, এবার ফেরা যাক। এলাকার পরিস্থিতি ভাল নয়। কয়েকটা জঙ্গি গেরিলা গ্রুপ মাথাচাড়া দিয়েছে। হাইওয়েতে প্রায়ই হামলা চালায় ওরা। আমার আগের পি. আর, ও—
তাঁকে থামিয়ে কর্নেল তুম্বোমুখে বললেন, শুনেছি। তবে আলো কমে আসছে। চলো, ফেরা যাক।
আমাদের জিপে প্রায় তিন কিলোমিটার সঙ্কীর্ণ বিচ্ছিরিরকমের উতরাই পথ দিয়ে নেমে হাইওয়েতে পৌঁছলাম। সেই সময় হঠাৎ কর্নেল বললেন, আমেদ, চা খাব।
আমেদ জিপ থামিয়ে বললেন, এখানে চা খাবেন কী! পাবেন কোথায়?
প্রকৃতিবিদ জিপ থেকে নেমে অমায়িক হাসলেন। পাহাড়ি রাস্তার ধারে নিরিবিলি চায়ের আড্ডায় একটু বসলে ক্লান্তি দূর হয়। চলে এসো!
পাশেই শালপাতার ছাউনি-দেওয়া একটা চায়ের দোকান চোখে পড়ল। চাওয়ালার চেহারা আদিবাসীর। একা বসে ঝিমোচ্ছিল সে। আমাদের দেখে ব্যস্তভাবে উনুনে লকড়ি গুঁজে দিল। গাছের ডাল দিয়ে তৈরি বেঞ্চে আমরা বসলাম। উদ্বিগ্ন আর বিরক্ত মুখে তরুণ পি. আর, ও ঘনঘন ঘড়ি দেখছিলেন। কর্নেল চাওয়ালার সঙ্গে গল্প জুড়ে দিলেন। ওঁর গল্প মানে পাখি, প্রজাপতি, অর্কিডের খোঁজখবর। তবে চাওয়ালা হাইওয়ের ওধারে পাহাড় দেখিয়ে শুধু একটা শম্বর হরিণের খবর দিচ্ছিল, যার শিং নাকি গোনা যায় না।
