আমাকেও। বলে কর্নেল চুরুট ধরালেন। একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে ফের বললেন, আপনার ঘরের ভূতুড়ে ঘটনার কথা কি ম্যানেজার প্রভাতবাবু কিংবা আর কাউকে বলেছেন?
প্রভাতবাবুকে বলেছিলাম।
উনি কী বলেছিলেন?
উনি হেসে উড়িয়ে দিলেন। বললেন, আপনার দাদাও ঠিক একই কথা বলতেন।
প্রাণনাথবাবু এবার চাপা গলায় বললেন, ওই মেসবাড়িতে যাওয়ার পরদিন মেসের একজন বোর্ডার ননীবাবু আমাকে বলেছিলেন, ওই ঘরে নাকি ভূত আছে। বহুবছর আগে কে নাকি আত্মহত্যা করেছিল।
ঠিক আছে। টাইম ইজ মানি। আমরা আজ বিকেল পাঁচটা নাগাদ আপনার বাসায় যাব। তবে আপনি যেন কথাটা গোপন রাখবেন। আমরা আপনার কোম্পানির অফিসার হিসেবে যাব।
প্রাণনাথবাবু আশ্বস্ত হয়ে বেরিয়ে গেলেন। কর্নেল অভ্যাসমতো টাকে হাত বুলিয়ে বললেন, কী বুঝলে জয়ন্ত?।
ম্যানেজার ওঁকে তাড়াতে চাইছেন। কারণ নতুন বোর্ডার ঢোকাতে পারলে বেশি ভাড়া এবং সেলামিও পাবেন।
তাড়াতে চাইলে হরনাথবাবুর মৃত্যুর পর ওঁকে একই ভাড়ায় থাকতে দিলেন কেন?
তা হলে কোনও বোর্ডার—ধরুন, এই ননীবাবু ঘরটা পাওয়ার জন্য ওঁর পেছনে লেগেছেন।
কর্নেল হাসলেন। টাইম ইজ মানি। কথাটা গুরুত্বপূর্ণ ডার্লিং!
বিরক্ত হয়ে বললাম, কথাটা দেখছি সত্যিই ভূতের মতো আপনাকে পেয়ে বসেছে।
হ্যাঁ। ওটাই আসলে ভূত। সেই ভূতের উপদ্রব ঘটেছে প্রাণনাথবাবুর ডেরায়। বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। নিচের ফ্ল্যাটের লিন্ডার দাদা গোর্সকে দিয়ে ষষ্ঠীর ওষুধগুলো আনিয়ে নিই। তুমি বোসো। দুজনে আজ রান্নাবান্না করব। তারপর বিকেলে নকুড় মিস্ত্রি লেনে যাব।
দোতলা মেসবাড়িটা খুঁজে বের করতে অসুবিধে হয়নি। ঘিঞ্জি গলির বাঁকের মুখে একটা ছোট্ট পার্ক দেখা যাচ্ছিল। প্রাণনাথবাবু নিচে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। বাড়ির একতলায় দোকানপাট। দোতলায় মেস। শেষপ্রান্তে প্রাণনাথবাবুর ডেরা। তার লাগোয়া ম্যনেজারের ঘর। সেই ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় প্রাণনাথবাবু ম্যানেজার প্রভাতবাবুকে জানিয়ে গেলেন, ওঁর কোম্পানির অফিসাররা ইমপর্ট্যান্ট কাজে এসেছেন। প্রভাতবাবু চেয়ারে বসেই করজোড়ে নমস্কার করলেন। ভদ্রলোক রোগা এবং বেঁটে। মুখে অমায়িক ভাব। তালা খুলে প্রাণনাথবাবু বললেন, আপনারা দয়া করে একটু বসুন। আমি চায়ের ব্যবস্থা করে আসি।
টাইম ইজ মানি! বলে কর্নেল দেওয়ালঘড়িটার দিকে এগিয়ে গেলেন। তারপর নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইলেন। ঘড়ির কাঁটা বারোটা তিরিশে থেমে আছে।
বললাম, একেই বলে বারোটা বেজে যাওয়া।
কর্নেল আমার রসিকতায় কান দিলেন না। একটা চেয়ার টেনে নিয়ে গিয়ে তার ওপর উঠে আতস কাচ বের করলেন। একটু পরে বললেন, ডায়ালে কিছু কথা লেখা ছিল। ঘষে ফেলা হয়েছে। তবে ঘড়িটা বিলিতি এবং খুব দামি। হরনাথ কিংবা তার পূর্বপুরুষকে কেউ হয়তো উপহার দিয়েছিল।
চেয়ার থেকে নেমে কর্নেল চেয়ারটা আগের জায়গায় রেখে কাঠের আলমারিটার কাছে গেলেন। উঁকি মেরে পেছন দিক দেখে আপন মনে বললেন, সত্যিই এটা নাড়ানো হয়েছে। ডান দিকের দুটো পায়া ইঞ্চিটাক সরে এসেছে।
এইসময় প্রাণনাথবাবু ফিরে এলেন। তাঁর হাতে চায়ের দুটো কাপপ্লেট। বললেন, আগে চা খেয়ে নিন আপনারা। তারপর সব দেখাচ্ছি।
কর্নেল বললেন, আপনি এই আলমারিটা খুলুন।
খুলছি। ওতে দাদার জামাকাপড় আর বইপত্তর ছাড়া কিছু নেই।
প্রাণনাথবাবু কাঠের আলমারিটা খুলে দিলেন। কর্নেল আলমারির ভেতর যেন তল্লাশ শুরু করলেন, আপনার দাদার সেই সুটকেসটা দেখতে চাই।
চামড়ার সুটকেসেও কিছু জামাকাপড় আর-একটা ফাইল পাওয়া গেল। ফাইলের কাগজপত্র দেখে কর্নেল বললেন, আপনার দাদা দেখছি শেয়ার মার্কেট ব্রোকার ছিলেন!
তাই বুঝি? আমি কিন্তু দাদার কোনও কাগজপত্র এখনও খুঁটিয়ে দেখিনি।
আপনি ম্যানেজার প্রভাতবাবুকে ডাকুন। ওঁর সঙ্গে দু-একটা কথা বলতে চাই।
প্রাণনাথবাবু অবাক হয়ে বললেন, ওঁকে ডাকা কি ঠিক হবে?
আপনি ওঁকে ডাকুন।
কর্নেলের কণ্ঠস্বরে দৃঢ়তা ছিল। প্রাণনাথবাবু বেরিয়ে গেলেন। কিন্তু উনি বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওঁকে পাশ কাটিয়ে প্রভাতবাবুর আবির্ভাব হল। প্রাণনাথও ফিরে এলেন। আমার সন্দেহ হল, প্রভাতবাবু দরজার পাশেই হয়তো আড়ি পেতে দাঁড়িয়েছিলেন। কর্নেল বললেন, আসুন প্রভাতবাবু, আপনার সঙ্গে কিছু কথা আছে।
প্রভাতবাবু মিটিমিটি হেসে বললেন, আমি বুঝতে পেরেছি, আপনারা লালবাজার থেকে এসেছেন। তবে সার, বড্ড দেরি করে এসেছেন। মরার আগে হরনাথ চোরাই জিনিস হাফিজ করে গেছে।
কর্নেল বললেন, চোরাই জিনিস। তার মানে?
মানে আপনারা ভালোই জানেন। তবে আমি সার ওসব সাতে-পাঁচে ছিলাম না। হরনাথ আমাকে বলত বটে, খদ্দের দেখে দাও। সিকিভাগ তোমার। আমি ওকে পাত্তা দিইনি।
কিন্তু জিনিসটা কী?
খুলে কিছু বলেনি হরনাথ। কাজেই জিনিসটা কী আমি জানি না। শুধু এইটুকু জানি, জিনিসের দাম ছিল বড্ড বেশি। হরনাথ আভাস দিয়েছিল লাখের ওপরে দাম। আমার মালিক ভদ্রলোক, যাঁর এই মেসবাড়ি, তিনি কোটিপতি লোক। হরনাথ গোপনে তার কাছেও গিয়েছিল। কিন্তু তিনিও কিনতে সাহস পাননি। আমাকে বলেছিলেন, ওই লোকটাকে তাড়াও। কিন্তু তাড়াব কী করে? এ পাড়ার সব গুণ্ডা, বদমাশ ছিল হরনাথের হাতে।
প্রাণনাথ ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, এসব কী বলছ প্রভাতদা! আমার দাদা–
প্রভাতবাবু তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, খাল কেটে কুমির এনেছ। এখন তুমিই ঠেলা সামলাও পানু! আমাকে এসব ব্যাপারে জড়িয়ো না। বলে উনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। প্রাণনাথবাবু ধপাস করে বিছানায় বসে বলেন, আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না। আমার দাদা বাউন্ডুলে ছন্নছাড়া ছিলেন বটে, কিন্তু ওঁকে চোর অপবাদ কেউ কস্মিনকালে দেয়নি। আর দামি চোরাই জিনিস যদি ওঁর কাছে থাকবে, আমি তার খোঁজ পাব না? যদি বেচে দিয়েও থাকেন, সেই টাকাই বা গেল কোথায়?
