এবার অবাক হয়ে গেলুম। মূর্তিটা স্ত্রীলোকের।
ওই পোড়ো বাড়িতে সাপের ভয় তুচ্ছ করে কোনও স্ত্রীলোক দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, এটা বেশ অস্বাভাবিক ব্যাপার। মহাবীরকে ডাকলুম। মহাবীর আমার কথা শুনে ওদিকে তাকাল। তারপর দুহাতে চোখ ঢেকে ভয় পাওয়া গলায় বলে উঠল, স্যার, স্যার! ওই সেই লছমী ডাকুনী!
শোনামাত্র আমার মাথায় জেদ চাপল। দ্রুত ঘরে ঢুকে ব্যাগ থেকে আমার পয়েন্ট ৩৮ ক্ষুদে রিভলভারটায় গুলি ভরে বেরিয়ে এলুম। কিন্তু তখন আর মুর্তিটা নেই।
মহাবীর বলল, কোথায় যাচ্ছেন স্যার?
আসছি। বলে গেট পেরিয়ে রাস্তা থেকে বাঁদিকে নেমে বড় বড় পাথর আর ঝোপঝাড় পেরিয়ে সেই টিলার কাছে পৌঁছলুম। এবার ভয় জাগল। সাপের ভয়। সাবধানে নজর রেখে টিলায় উঠতে শুরু করলুম।
বাড়িটা কোনওক্রমে টিকে আছে। আগাছার জঙ্গলে ঘিরে ফেলেছে তাকে। ফাঁকা জায়গা দিয়ে এগিয়ে প্রাঙ্গণে ঠুকলুম। তারপর মনে হল, বাড়িতে যেন মানুষ থাকার গন্ধ পাচ্ছি। এটা বুঝিয়ে বলা কঠিন, ষষ্ঠীর মতো একটা ইনটুইশন হতে পারে—কোনও স্পষ্ট চিহ্ন না থাকলেও মনে হচ্ছিল, এখানে মানুষ বাস করে।
ঘরগুলোর কপাটে মরচেধরা তালা আটকানো রয়েছে। বারান্দার শেষেপ্রান্তে সিঁড়ি। সিঁড়ি বেয়ে ছাদে চলে গেলুম। কেউ কোথাও নেই।
হঠাৎ চোখে পড়ল একটা কালো ক্লিপ। চুল আঁটার মেয়েলি ক্লিপ। ক্লিপে চুল লেগে রয়েছে। শুকে সস্তা গন্ধতেলও টের পেলুম।
বাড়িটার আনাচে কানাচে তন্নতন্ন খুঁজেও সেই স্ত্রীলোকটিকে দেখতে পেলুম না। উঠানে দাঁড়িয়ে ভাবছি, দরজার তালা ভেঙে দেখব নাকি ভেতরে কী আছে, হঠাৎ আমার বাঁ-দিকে কয়েক গজ তফাতে আগাছার মধ্যে কী পড়ে আছে দেখতে পেলুম।
ঘাসে পা ফেলতে ভয় করছিল। শঙ্খচূড় থাকলে অবশ্য পায়ের শব্দে অনেক আগে ফণা তুলবে। লড়াই করার সময় পাব, অন্য বিষাক্ত সাপ থাকলে মুশকিল। গায়ে পা না পড়া পর্যন্ত অনেক বিষাক্ত সাপও ফেঁস করে না।
যা দেখলুম, আমার শরীরে রক্ত চলাচল থেমে গেল যেন।
একটি দেহাতী যুবতী চিত হয়ে পড়ে রয়েছে। তার গলা, কপাল ও বুকের ক্ষতচিহ্নে টাটকা রক্ত দলা বেঁধে রয়েছে। কাপড় রক্তে মাখামাখি। নিস্পন্দ মৃতদেহ ছাড়া কিছু নয়। মুখটা অবশ্য তত বিকৃত নয়।
মাত্র কয়েক সেকেন্ড দেখে আর তাকাতে পারছিলুম না। এমন খুন-খারাপি দেখিনি, এমন নয়। কিন্তু একটু আগে এ বাড়ির ছাদে যাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি, সেই যে এইমাত্র খুন। হয়েছে–আমি হয়তো যখন নদীর ব্রিজে ছিলুম তখনই—একথা ভেবেই আমার কষ্ট হচ্ছিল। তার আর্তনাদ কেন শুনতে পাইনি, সেটাই আশ্চর্য!
এখন দরকার খবর দেওয়া। সাপের কথা ভুলে হনহন করে এগিয়ে গেলুম। ভাঙা ফটক পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে যাচ্ছি, কর্নেলের টুপি দেখলুম ঝোপের আড়ালে। বুড়ো হাসিমুখে চাপা গলায় বললেন, জয়ন্ত যে!
রুদ্ধশ্বাসে বললাম, শিগগির আসুন! ওখানে একটা খুন হয়েছে।
বুড়ো একটুও চমকালেন না। বললেন, তাই নাকি? চলো তো দেখি।
ভেতরে যেতে যেতে ব্যাপারটা বললুম। কর্নেল কোনও মন্তব্য করলেন না। কিন্তু প্রাঙ্গণে সেই ঝোপের মধ্যে গিয়েই আমি আবার থ। লাশটা নেই।
বললুম, সর্বনাশ! এখানেই তো ছিল! গেল কোথায়?
কর্নেল হাঁটু দুমড়ে ঘাসের ভেতর থেকে কী একটা তুলে নিলেন। চমকে উঠে দেখি, রক্তের দলা ঘাঁটছেন আঙুলে। ছ্যা ছ্যা। ঘেন্না হচ্ছে না একটুও?
তিন
সম্ভাব্য ছয় নম্বর
বলে পারলুম না আর। কর্নেল! করছেন কী! ওই নোংরা রক্ত ঘাঁটছেন কেন?
কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে আঙুল দুটো আগাছার পাতায় মুছতে মুছতে বললেন, জিনিসটা ততকিছু নোংরা নয়, ডার্লিং!
তারপর এগিয়ে গেলেন বারান্দর কোনায় সিড়ির দিকে। সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে গেলেন। পেছন পেছন গেলুম। কর্নেল বাইনোকুলার চোখে রেখে এদিকে-ওদিকে কী খুঁজছিলেন। একটু পরে একদিকে স্থির হয়ে দাঁড়ালেন! ডাকলেন, জয়ন্ত! ওই দেখো তোমার শ্রীমতী মৃতদেহ স্নান করছেন। অর্থাৎ তেল-সিঁদুর ধুয়ে ফেলছেন।
বাইনোকুলারটা নিয়ে চোখে রেখে দেখি, হ্যাঁ—সেই দেহাতী যুবতীই বটে! নদীর বাঁকে মস্ত পাথরের আড়ালে ডোবামতো জায়গায় রগড়ে রং ধুচ্ছে।
বললুম, ব্যাপারটা কী বলুন তো?
কর্নেল একটু হেসে বললেন, ব্যাপারটা যৎকিঞ্চিৎ। ওখানে একজন পুরুষ মানুষও রয়েছে, যদি তুমি খুঁজে তাকে বের করতে পারো। সে আছে গাছের তলায় বসে।
দেখতে পেয়েছি কর্নেল! উত্তেজিতভাবে বললুম!
চিনতে পারছ তাকে?
আশ্চর্য! ওকে মহাবীর ড্রাইভার বলে মনে হচ্ছে।
দ্যাটস রাইট, ডার্লিং! এবারে চলে এস। কেটে পড়া যাক। সাবধান, আমরা এবার উল্টো দিকে বড় ব্রিজ পেরিয়ে বাংলোয় ফিরব।
কিছুক্ষণ পরে দুর্গম জায়গায় অশেষ কষ্ট করে হেঁটে হাইওয়ের বড় ব্রিজে পৌঁছলুম দুজনে। তারপর বললুম, আপনি ওখানে জুটলেন কীভাবে?
কর্নেল চুরুট জ্বেলে ধোঁয়া ছেড়ে হাসতে হাসতে বললেন, আজ সকাল থেকে টোপ খেলানো হচ্ছে। অর্থাৎ বাংলোর উল্টোদিকে নদীর পারে রঘুনন্দনজির ওই পোড়ড়া বাড়ির ছাদে আমাদের লছমীর প্রেতাত্মা দর্শনের ব্যবস্থা করে দিচ্ছিল কেউ। প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েই আমার নজরে পড়েছিল! কিন্তু আমল দিইনি। তখন সঙ্গে দূরদর্শন যন্ত্রটা ছিল না। ফিরে এসে, তখনও তুমি ঘুমিয়ে আছ, বস্তুটা চোখে রেখে দেখলুম-হ্যাঁ, যা ভেবেছি তাই। তখন ঘুরপথে বেরিয়ে পড়লুম। এগোতে যাচ্ছি, হঠাৎ দেখি, তুমি আসছ। বুঝতে পারলুম কেন আসছ অমন হন্তদন্ত হয়ে। তবে তুমি আমার সঙ্গী এবং কলকাতার লোক। ভূত বিশ্বাস করবে না এবং অনর্থ ঘটাবে জেনে মহাবীরের বউ…
