অবাক হয়ে বললুম, মহাবীরের বউ? বলেন কী!
হ্যাঁ জয়ন্ত!
কাল মোহনজির বাড়িতে মেয়েটাকে দেখছি আমরা।
তাই বলুন! কিন্তু হঠাৎ অমন লাশ হয়ে পড়েছিল কেন?
তোমাকে ধোঁকা দিতে। মুখোমুখি হতে যাচ্ছিলে প্রায়। হঠাৎ বুদ্ধি খাটিয়ে ও লাশ হয়ে পড়ে রইল। তুমি ধাঁধায় পড়ে গেলে। পুলিশকে খবর দিতে ছুটবে, এ তো জানা কথা! সেই ফাঁকে নিরাপদে পালানোর সুযোগ করে নিল।
তাহলে মহাবীরের বউ লছমীর ভূত সেজে ডাকাতি করে বেড়াচ্ছে?
হুম্। বলে কর্নেল একরাশ ধোঁয়া ছাড়লেন! তারপর ফের বললেন, তখন বললুম না? আমায় মোহনজি তুরুপের তাস করতে ডেকে এনেছেন!
ঠিক বুঝলুম না।
বুঝবে সময়মতো। এস আপাতত আমরা কিছুক্ষণ প্রকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করি।…
দুপুরে আজ মোহনজির বাড়ি খাওয়ার নিমন্ত্রণ ছিল। বাংলো থেকে নিয়ে যেতে এলেন মোহনজি নিজে। মহাবীরকে আর দেখতে পাইনি ত্রিসীমানায়! মোহনজিকে সকালের ঘটনা জানাতে নিষেধ করেছিলেন কর্নেল। বলেছিলেন, যা বলার আমি বলব। তাই চুপ করে থাকলুম।
মোহনজি বললেন, দেরি হয়ে গেল কর্নেল সাব! অনুগ্রহ করে এবার আসুন।
কিন্তু কর্নেল গোমড়ামুখে বললেন, ক্ষমা চাচ্ছি মোহনজি! রাত থেকে প্রচণ্ড পেটের অসুখে ভুগছি। কিছু মুখে দেওয়ার উপায় নেই! জয়ন্তকে নিয়ে যান!
মোহনজি অবাক হয়ে বললেন, সে কী! এতসব আয়োজন করেছি।
কর্নেল আরও গম্ভীর হয়ে বললেন, উপায় নেই মোহনজি! আমি মহাবীরকে বলে পাঠাব। ভেবেছিলাম, খুঁজে পেলাম না।
মেহনজি ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, এটা কেমন কথা! আমি কত আশা করে…
বাধা দিয়ে কর্নেল একটু হেসে বললেন, আপনার আশা না মেটাতে পারায় আমি দুঃখিত। আর মোহনজি, আমার এই এক বেয়াড়া স্বভাব—আমায় কেউ প্রতারণা করছে জানতে পারলে তার ছায়া আমি মাড়াইনে।
মোহনপ্রসাদ চমকে উঠলেন। আমি আপনাকে প্রতারণা করেছি! কী বলছেন?
হ্যাঁ। কর্নেল দৃঢ় স্বরে বললেন। আপনার ড্রাইভার মহাবীরের বউকে আপনি লছমীর ভূত সাজিয়ে এত কাণ্ড করেছেন। আবার সেই রহস্য ফাঁস করতে আমাকে ডেকে এসেছেন। উদ্দেশ্যটা কী?
মোহনপ্রসাদ চেঁচিয়ে উঠলেন, ঝুট। বিলকুল ঝুট! এ আপনি কী বলছেন?
কর্নেল অন্যদিকে ঘুরে বললেন, যা বলার আমি বলেছি। এখন আপনি আসতে পারেন।
মোহনপ্রসাদ রাঙা মুখে গটগট করে বেরিয়ে গেলেন। বাইরে ওঁর জিপের অওয়াজ শোনা গেল। তারপর আমি বললুম, ওঁকে খামোকা রাগিয়ে দিলেন কেন কর্নেল?
কর্নেল বললেন, সাবধান করার জন্য। জানিয়ে দিলুম, ওঁর চালাকি ধরে ফেলেছি। আশাকরি তুমি আগাথা ক্রিস্টির এ বি সি মার্ডার পড়েছে। খুনির উদ্দেশ্য সি-কে খুন করা। পুলিশকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করার জন্য সে এ এবং বি-কে খুন করেছিল।
কিন্তু এক্ষেত্রে পাঁচটি কেস তো ডাকাতি। খুন নয়!
কর্নেল হাসলেন।… প্রথম দুটো কেস মোহনপ্রসাদের পাম্প এবং বাড়িতে হামলার। ওটা ওঁর সাজানো গল্প। বাকি তিনটে ঠিক। কিন্তু দুটোর উদ্দেশ্য লছমীর ভূতের কথা প্রচার করা। বাকি তিনটে সেই প্রচারের ভিত্তি মজবুত করতে। আমার ধারণা এবার ছনম্বর কেস আমার উপস্থিতিতে করার প্ল্যান ছিল মোহনজির। যেহেতু উনি আমাকে এনেছেন এই রহস্যের পর্দা তুলতে এবং সে কথা পুলিশকে জানিয়েও দিয়েছেন, সেইহেতু এই পরিকল্পিত এবং সম্ভাব্য ছনম্বর কেসেও তার প্রতি এতটুকু নজর পড়ার কথা নয় পুলিশের।
সেজন্য আপনি তুরুপের তাস কথাটা বারবার বলছিলেন?
ঠিক ধরেছ ডার্লিং। ছনম্বর কেসে কী ঘটতে পারে ভেবেছিলেন?
একটা বড় কিছু। কর্নেল চিন্তিতমুখে বললেন। ষষ্ঠীর ইনটুইশন খুব খাটি। কিন্তু সেই বড়টা কী মাথায় আসছে না। তবে সেটা থেকে মোহনপ্রসাদ যাতে নিবৃত্ত হন, তাই মুখের ওপর জানিয়ে দিলুম সব কথা। আশাকরি আর উনি এগোবেন না।
বলে কর্নেল পায়চারি শুরু করলেন। বিড়বিড় করে বলতে শুনলুম, কী হতে পারত ছনম্বর ঘটনাটা? কী সেটা?
তারপর ঘুরে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, জয়ন্ত! মনে হচ্ছে, এ বি সি মার্ডারের অন্তিম লক্ষ্যের মতো ওঁর যে নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ওঁর জীবনে। পূর্বপ্রতিহিংসা চরিতার্থ করা—নাকি কোনও আর্থিক লাভালাভের ব্যাপার?
হাসতে হাসতে বললুম, যা ঘটেনি এবং আশা করি আর ঘটবে না—আপনি যেহেতু ওঁর কীর্তিকলাপ জেনে গেছেন, তা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ কী? এদিকে আমদের খিদেও পেয়ে গিয়েছে। চলুন, কোনও হোটেলের দিকে পা বাড়াই।
কর্নেল বললেন, হুঁ, ছনম্বর ঘটনা আমি আটকে দিয়েছি। কিন্তু জানতে ইচ্ছে করছে, কী ঘটতে যাচ্ছিল! সম্ভবত সেটা শুধু ডাকাতি নয়, খুন-খারাপি। হ্যাঁ, লছমীর ভূতের হাতে একটি মৃত্যু।
করুণ মুখে বললুম, কর্নেল! আপনার সত্যি খিদে পেয়েছে।
বৃদ্ধ গোয়েন্দাপ্রবর বিচলিত হয়ে উঠলেন সঙ্গে সঙ্গে। হ্যাঁ, চলো, চলো।…
প্রতাপগড় থেকে ফেরার দিন পনেরো পরে কর্নেল একদিন ফোন করলেন। জয়ন্ত, প্রতাপগড়ের এমএলএ রঘুনন্দন সিংয়ের ডেডবডি পাওয়া গেছে নদীর ধারে। লছমীর ভূতের হাতেই খুন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি, স্রেফ খুন। শর্মাজি ট্রাংককলে জানালেন এইমাত্র। রঘুনন্দনের কাছে ঢিট হয়ে মোহনজি রাজনীতি ছেড়েছিলেন। অবশ্য আমি শর্মাজিকে লছমীর ভূত রহস্য ফাঁস করে না এলে মোহনজিকে সন্দেহ করতেন না ওঁরা। যাই হোক, মোহনজিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। লছমী আর মহাবীর তো আমরা চলে আসার পরই গা-ঢাকা দিয়েছিল। এখনও পুলিশ তাদের খুঁজছে। তাহলে দেখলে তো? ছনম্বর শিকার কে ছিল? ষষ্ঠীচরণের মাইনে বাড়িয়ে দিলুম, জয়ন্ত। সময় করে চলে এসো।…
১.২২ ভূত্রাক্ষস
কিরিবুরু পাহাড়ি উপত্যকায় একসময় ঘন জঙ্গল ছিল। সেই জঙ্গলে শিকার করার জন্য রামগড়ের রাজা একটা টিলার মাথায় হান্টিং লজ বা শিকার ভবন তৈরি করেছিলেন। মাঝে-মাঝে শিকারে গিয়ে সেখানে তিনি থাকতেন। বাড়িটা কাঠের এবং ওপরে টালির চাল। তার লাগোয়া একটা উঁচু মঞ্চও তৈরি করেছিলেন। মঞ্চে উঠে দূরবীনে চোখ রেখে জন্তুজানোয়ার দেখতেন।
