শুধু তাই নয়, যে রাতে মোহনজির বাড়িতে লছমীর ভূত হামলা করে, সে রাতেও সে খাটিয়া পেতে বারান্দায় শুয়েছিল। ঝমঝম করে বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টির মধ্যে লছমীর আবির্ভাব হয়। মহাবীর কিরে কেটে বলেছে, সেই রক্তাক্ত মড়া হয়ে মছমী বাড়ি ঢুকেছিল। মোহনজির রাইফেল আছে। মাঝে মাঝে কাঠ আনতে জঙ্গলে যান বলে রাইফেল কিনেছেন। তো লছমীর দিকে পরপর চারটে গুলি ছোঁড়েন তবু লছমীর গায়ে আঁচড় লাগেনি। কিন্তু বাড়িসুষ্ঠু লোক জেগে গেছে। হইহল্লা করেছে। তাই শেষপর্যন্ত অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে যায়।
পরদিন সকালে আমরা ব্রেকফাস্ট করতে বসেছি, কর্নেল সবে প্রাতঃভ্রমণ সেরে এসেছেন, এমন সময় আমাদের পরিচিত পুলিশ অফিসার শর্মাজি এসে হাজির হলেন।
শর্মাজি হাসতে হাসতে বললেন, মোহনপ্রসাদ আমাদের ওপর আস্থা রাখতে পারেননি। তাই আপনাকে টেনে এনে এনেছেন। তাতে অবশ্য আমি খুশিই।
কর্নেল যেন অপ্রস্তুত হওয়ার ভান করে বললেন, না, না মিঃ শর্মা! আপনি তো বিলক্ষণ জানেন, প্রতাপগড় আমার কত প্রিয় জায়গা! ;
শর্মা চোখ নামিয়ে বললেন, লুকিয়ে লাভ নেই কর্নেল। স্বয়ং মোহনজি কথাটা আমাকে জানিয়ে এসেছেন। ওঁকে তো জানেন বড্ড খামখেয়ালী মানুষ, তবে একথা ঠিক, ইদানীং পরপর পাঁচটা এ ধরনের ডাকাতি হয়েছে প্রতাপগড়ে। পাঁচটাই লছমীর ভূতের কীর্তি বলে ভিকটিমরা স্টেটমেন্ট দিয়েছে। সময় রাত নটা থেকে দশটা, শুধু—একটি কেসে সন্ধেবেলা। আমার ধরণা, কেউ লছমী সেজে এসব করছে। কিন্তু কোনও সূত্র আমরা খুঁজে পাচ্ছিনে।
কর্নেল বললেন, দুটো কেস তো মোহনজির। বাকি তিনটে কোথায়—কোথায়, কীভাবে ঘটল, বলবেন কি মিঃ শর্মা?
শর্মাজি বললেন, তিনটেই নেহাত পেটি কেস। একটি স্লাম এরিয়ায়। এক বুড়ির ওপর হামলা করে তার অল্পসল্প টাকাকড়ি ছিনিয়ে নেয়। বুড়ি-বাড়ি ঝিয়ের কাজ করে পয়সা জমিয়েছিল। আর একটা এই রাস্তার ধারে চায়ের দোকানে! লোকজন বিশেষ ছিল না তখন! রাত প্রায় দশটা। চা-ওলা ঝাঁপ ফেলতে যাচ্ছে, লছমীর ভূত হাজির।… বাকি কেসটা রাহাজানির মতো। এক দেহাতী ছোট ব্যবসায়ী সাইকেলে চেপে সন্ধেবেলা ফিরে যাচ্ছিল। হাইওয়েতে হঠাৎ তার সামনে লছমীর ভূত এসে দাঁড়ায়। মজার কথা, দেহাতী লোকটির যে গ্রামে বাড়ি, লছমী সে-গাঁয়েরই মেয়ে। লোকটি ভয়ে ভির্মি খায়। জ্ঞান হলে দেখে টাকাকড়ি সব খোয়া গেছে।
আরও কিছুক্ষণ একথা নিয়ে আলোচনার পর শর্মাজি চলে গেলেন। যাওয়ার সময় বলে গেলেন, আপনাকে মোহনজি এনেছেন বলে অবশ্যই আমি এতটুকু ক্ষুব্ধ হইনি কর্নেল। বরং আপনার সাহায্য আমিও চাই। প্রতাপগড়ে কয়েকটা কেসে আপনার সাহয্যের জন্য পুলিশ এখনও কৃতজ্ঞ। নতুন অফিসাররা আপনার কথা জানেন না। আমি জানিয়ে দেব বরং।
শর্মাজি চলে গেলে কর্নেল বললেন, মোহনপ্রসাদ পুলিশের কানে আমার আসার খবর তুলতে গেলেন কেন? অদ্ভুত লোক তো!
বললুম, আপনার প্রতি মোহনজির প্রবল আস্থা। তাই আপনাকে নিয়ে পুলিশের কাছে বাজি ধরেছেন।
অর্থাৎ আমি ওঁর তুরুপের তাস। বলে কর্নেল কী যেন ভাবতে থাকলেন।
বারান্দায় গিয়ে বসলুম। নিচে নদী। তার ওপারে একটা টিলার মাথায় লাল রঙের একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছিল। বাড়িটা আগে এসেও দেখেছি এবং কেন কে জানে, কেমন রহস্যের গন্ধ টের পেয়েছি। বাড়ির একতলাটা দেখতে কতকটা দুর্গের মতো। বহুকালের পুরনো দেওয়ালের ফাটলে আগাছা গজিয়ে রয়েছে। বাড়িটা নিশ্চয় হানাবাড়ি।
মহাবীর লনের ওপাশে মালির সঙ্গে কথা বলছিল। তাকে ডেকে জিগ্যেস করলুম, ওই বাড়িটায় কে থাকে? কার বাড়ি বলতে পারো?
মহাবীর বলল, বাড়িটা স্যার প্রতাপগড়ের এমএলএ রঘুনন্দনজির। ওঁর বাবা এক সায়েবের কাছে কিনেছিলেন শুনেছি। তাই কেউ কাছে যেতেও ভয় পায়।
মহবীরের সঙ্গে প্রতাপগড়ের হালচাল নিয়ে কথা বলছি, কর্নেল বেরিয়ে এসে বললেন, জয়ন্ত! আমি একটু বেরুচ্ছি। তুমি বরং মহাবীরকে নিয়ে জিপে করে ঘুরে এস কোথাও।
মহাবীর বলল, আপনাকে পৌঁছে দিই স্যার, যেখানে যাবেন। তারপর ছোট সায়েবকে নিয়ে বেরুব।
কর্নেল বললেন, না না। দরকার হবে না। আমি বেশিদূর যাব না।
কর্নেল আমাকে ফেলে যাওয়ার মনে অভিমান জেগেছিল। কিন্তু ওঁর সঙ্গে বেরুনোর ঝক্কি কী, মনে পড়ায় শেষ পর্যন্ত খুশিই হলুম। কোথায় কোথায় টো টো ঘুরবেন কে জানে! তার চেয়ে চুপচাপ প্রকৃতি দেখা আনন্দজনক।
মহাবীর বলল, যাবেন নাকি স্যার কোথাও ঘুরতে?
বললুম, বরং এক কাজ করা যাক। চলো, এই পোড়োবাড়িটা দেখে আসি। আঁতকে উঠল মহাবীর। না স্যার। ভুলেও ওখানে পা বাড়াবেন না। তাছাড়া জিপ যাওয়ার রাস্তা নেই ওদিকে। বরং চলুন, ওয়াটার ড্যাম দেখিয়ে আনি।
দেখেছি তোমাদের ওয়াটার ড্যাম। তুমি যাও মহাবীর, গল্প করো গে মালীর সঙ্গে। আমি পায়দল ঘুরে আসি।
আমার কথা শুনে মহাবীর টের পেল আমি রাগ করেছি। সে কঁচুমাচু মুখে বলল, আমার কথা বিশ্বাস করুন স্যার। ওখানে শঙ্খচূড় সাপের আড্ডা। মালীকে জিগ্যেস করুন!
মালি শুনছিল। সায় দিয়ে বলল, হ্যাঁ স্যার। বড় সাপ ওখানে।
এরপর আর ওই হানাবাড়িতে যাওয়ার সাহস হল না। অগত্যা ঘরে গিয়ে জানলার ধারে একটা বই নিয়ে বসলুম। যা একটু পরে খোলা জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি, হানাবাড়িটা নদীর ওপারে দেখা যাচ্ছে। আর তার ছাদে কে যেন দড়িয়ে আছে। বাড়ির ছাদের ওপর একটা প্রকাণ্ড গাছ ঝুঁকে পড়ায় তার ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তিটা ভাল করে ঠাহর হচ্ছিল না। কর্নেলের বাইনোকুলারটা খুঁজলুম। সঙ্গে নিয়ে গেছেন যথারীতি। অগত্যা বারান্দায় গিয়ে ভাল করে দেখার চেষ্টা করলুম।
