অর্থাৎ লছমী সেজে ডাকাতি করে বেড়াচ্ছে?
হ্যাঁ, আবার কী?
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, ষষ্ঠীর ইনটুইশন অন্য কথা বলেছে। লছমীর পেত্নী ডাকাতি করে বেড়াচ্ছে?
না। ওই খবরের কিছু গোলমেলে ব্যাপার সে ধরিয়ে দিয়েছে। কর্নেল মুখে সেই হাসি রেখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। মুখে রহস্যের ভঙ্গি—যা দেখে আমি বরাবর উত্তেজনা অনুভব করি। বললুম সংস্কৃত শ্লোকে আছে—সংসর্গজা দেশগুণাঃ ভবন্তি। তা ষষ্ঠীচরণ আপনার মতো ধুরন্ধর গোয়েন্দার সংসর্গে থেকে বুঝি পাতিগোয়েন্দা হয়ে উঠেছে? দেখুন কর্নেল, খবরের কাগজের প্রত্যেকটা খবরে গোলমাল থাকবেই থাকবে। সেটাই নিয়ম। কারণ খবর যিনি পাঠান এবং যিনি তা অনুবাদ করেন..
বাধা দিয়ে কর্নেল বললেন, জয়ন্ত, জয়ন্ত! আমার কথাটা আগে শোনো।
বলুন।
বরং এক কাজ করা যাক, ষষ্ঠীচরণের মুখেই তার ধারণার কথা শোনা ভাল।
বলে কর্নেল ডাকলেন, ষষ্ঠী! ও ষষ্ঠী এদিকে একবার আসবে কি?
ষষ্ঠীচরণ যেন ওৎ পেতেই ছিল। পর্দা তুলে গম্ভীর মুখে বললল, বলুন স্যার!
কর্নেল বললেন, পেত্নীর খবরের কী যে খটকা আছে বলছি লে তখন?
অভিমান দেখিয়ে ষষ্ঠী বলল, আছে। শুনলেন না তো!
এবার বলো, শুনব। তোমার কাগজের দাদাবাবুও শুনবেন। ষষ্ঠী ফিক করে হাসল সঙ্গে সঙ্গে। বলল, মজাটা দেখুন। প্রতাপগড় তো স্যারের সঙ্গে কতবার আমি গেছি। কাগজের দাদাবাবুও গেছেন। টাউনের শেষে বড় রাস্তার ধারে পেট্রল পাম্প। কেমন তো? রাত নটায় সেই পাম্পে সতেরো হাজার নগদ টাকা মজুত রেখেছে মালিক! বিশ্বাস হয় বলুন? বললুম, চুরি-ডাকাতির পর ললাকে পুলিশকে বাড়িয়েই বলে।
বলুক না! কিন্তু একই লোকের ওপর পেত্নী দুবার হামলা করল? সতেরো হাজার টাকা এবং গুলি গায়ে লাগেনি—দুটোতে খটকা বাধছে কাগজের দাদাবাবু!
কিসের খটকা বুঝলুম না ষষ্ঠী?
ষষ্ঠী ক্ষুব্ধভাবে বলল, বেশি লেখাপড়া জানিনে কাগজের দাদাবাবু! কিন্তু আমার মনে খটকা বেধেছে। মনে হচ্ছে, বড় কিছু ঘটবে, এগুলো তারই গোড়াপত্তন। তাছাড়া ডাকাতি শুধু একজনই করল? দলবল সঙ্গে নেই, একা? আর তার চেয়ে বড় কথা, পেত্নী-ডাকাত? দেখবেন, নির্ঘাৎ বড় কিছু ঘটবেই।
ষষ্ঠীর হাবভাবে হাসি পাচ্ছিল। কিন্তু বেচারাকে দুঃখ দেওয়া ঠিক নয় ভেবে মুখে চিন্তার ভাব ফুটিয়ে বলুলম তুমি যা আঁচ করছ, সত্যি হতে পারে বৈকি।
আমার কথা শুনে সে কর্নেলের দিকে খুব আশা নিয়ে তাকাল। কর্নেল সেটা টের পেয়ে বললেন, ক্যাকটাসটা নিয়ে ব্যস্ত না থাকলে ব্যাপারটা দেখে আসা যেত। তাছাড়া এ শরৎকালে প্রতাপগড়ের তুলনা হয় না। প্রকৃতি তাকে এ সময়টা দারুণ সাজিয়ে তোলে, না? হুম্ জয়ন্ত, রথদেখা কলা-বেচার সম্পূর্ণ সুযোগ ছিল! ষষ্ঠী হতাশভাবে ঘর থেকে পেয়ালা দুটো নিয়ে বেরিয়ে গেল।
আমি ষষ্ঠীর কথাটা তখনও ভাবছিলুম। লোকটার কপালে দুর্ভোগ আছে বোঝা যাচ্ছে। ওকে গোয়েন্দারোগে ধরেছে এবং সব তাতেই ওর খটকা লাগতে শুরু করেছে। প্রতাপগড়ের কে ভদ্রলোকের পেট্রল পাম্পে ও বাড়িতে দুবার ভূত সেজে কেউ ডাকাতি করেছে, তাই নিয়ে ও রীতিমতো একটা গোয়েন্দা-থিসিস খাড়া করে ফেলেছে।
বললুম, কর্নেল! আপনার এই অনুচরটিকে সামলান! এর ভবিষ্যৎ ভেবে শিউরে উঠছি।
কিন্তু কর্নেল আমার কথার জবাব দিলেন না। চেয়ারে তখনকার মতো বসে হেডফোন জাতীয় যন্ত্রটা পরতে ব্যস্ত রয়েছেন।
গতিক দেখে আমি উঠে দাঁড়ালুম। বললুম, আসি কর্নেল।
তবু কর্নেলের কোনও সাড়া না পেয়ে বেরিয়ে গেলুম। ওঁর এমন অদ্ভুত আচরণ এতদিনে গা সওয়া হয়ে গেছে। আজকাল আর একটুও গায়ে মাখিনে।
সেদিন কাগজের অফিসে আমার বিরতির দিন। দুপুরে ঘুমিয়ে গেছি খেয়েদেয়ে, একসময় ফোন বাজল। কানে তুলতেই চেনা কণ্ঠস্বর ভেসে এল।—ডার্লিং জয়ন্ত! তুমি কি ঘুমোচ্ছিলে? দিনদুপুরে ঘুমই বাঙালির পতনের কারণ। তো শোন কাল ভোরে সাড়ে পাঁচটায় আমরা প্রতাপগড় রওনা হচ্ছি। তৈরি থেকো!
চমকে উঠেছিলুম। ডাক এসেছে নাকি সেখান থেকে?
হুম। ঠিকই ধরেছ।
পুলিশের ডাক বুঝি?
কখনও না, কখনো না। মোহনপ্রসাদ সিং—মানে যাঁর পাম্পে লছমীরানির ভূত হামলা করেছিল, তিনিই আমাকে ডেকেছেন।
বলেন কী! যে কেউ ডাকলেই আজকাল বুঝি আপনি চাকরের মতো…
না, না। মোহনজি আমার সুপরিচিত জয়ন্ত। একবার ওঁর আতিথ্যে কাটিয়ে এসেছিলুম। অমায়িক সজ্জন মানুষ। সকালে তুমি চলে যাওয়ার পর উনি ট্রাঙ্ককল করেছিলেন।
তাহলে ষষ্ঠীচরণের গোয়েন্দাগিরি আর ঠেকানো গেল না।
না। হাসতে হাসতে কর্নেল বললেন, ঠিক আছে। তৈরি থেকো…
দুই
রক্তাক্ত মৃতদেহ
মোহনপ্রসাদ সিং প্রতাপগড়ে সেসময়ে নাকি দামি মানুষ ছিলেন। কারণ, তখন উনি রাজনীতি করতেন। পরে রাজনীতি ছেড়ে বাণিজ্যে মন দেন। খুব একটা বড় ব্যবসায়ী হতে পারেননি। একটা পেট্রল পাম্প, একটা ট্রাক এবং একটা জিপগাড়ি, আর একটা কাঠগোলার মালিক হয়েছেন। মাইল পাঁচেক দুরে প্রতাপগড় রিজার্ভ ফরেস্ট। মরসুমে সেখানে সরকার বন এলাকায় গাছ বিক্রি করে। টেন্ডার ডাকা হয়। মোহনজি তদ্বির করে টেন্ডার জোগাড় করেন। তবে চোরাই কাঠ চালানকারীরাও কম নেই তল্লাটে। যারা কাঠগোলার ব্যবসা করে, তার তাদের মা-বাবা।
মোহনজির বাড়িতে থাকাটা ঠিক মনে করেনি কর্নেল। আমরা উঠেছি সেচ-দফতরের বাংলোয়। মোহনজি তার জিপটা আমাদের সেবায় দিয়েছেন। ড্রাইভারের নাম মহাবীর। গাঁট্টাগোট্টা চেহারা। লছমী ডাকুরানির অসংখ্য গল্প সে জানে। কীভাবে লছমী নদীর ধারে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে মারা পড়েছিল, তা সে স্বচক্ষে দেখেছে। লছমীর রক্তাক্ত লাশের একটা ভয়ংকর বিবরণ তার কাছে শুনেছি আমরা। তাছাড়া মোহনজির পাম্পে ডাকাতির সময় সে ওখানে উপস্থিত ছিল। সেই রক্তাক্ত লাশকে জীবিত মানুষের মতো হানা দিতে দেখে আঁতকে সে পালিয়ে গিয়েছিল!
