কাগজের খবর
অক্টোবর মাসের এক অত্যুজ্জ্বল রবিবারের সকালে কর্নেল নীলাদ্রি সরকারে ফ্ল্যাটে আড্ডা দিতে গিয়ে দেখি, বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদ একপ্রকার কিম্ভুত আকৃতির ক্যাকটাসের সামনে চোখ বুজে ধ্যানস্থ রয়েছেন এবং তার কানে হেডফোন চাপানো। হেডফোনের তার গিয়ে ক্যাকটাসটার গায়ে বেঁধানো একটা আলপিনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকেছিলুম, বুড়োকে একটু চমকে দেওয়ার আশায়। কিন্তু উল্টে আমাকেই ভীষণ চমকে উঠতে হল, যখন উনি হঠাৎ ঠকঠক করে কেমন অদ্ভুত ভঙ্গিতে কাঁপতে শুরু করলেন।
আমি ভাবলুম, ইলেকট্রিক শক খেয়েছেন কর্নেল। তাই শশব্যস্তে কাছে গিয়ে প্রথমে দেয়ালের সুইচবোর্ডের সঙ্গে হেডফোনের সংযোগ খুঁজলুম। না দেখতে পেয়ে ধারণা হল, হয়তো ওই উদ্ভুট্টে উদ্ভিদটা থেকেই কোনও মারাত্মক বিদ্যুৎশক্তি নির্গত হয়ে ওঁকে মুহুর্মুহু শকে জর্জরিত করছে।
অতএব তক্ষুণি ক্যাকটাসের গা থেকে পিনটা উপড়ে ফেললুম।
অমনি কর্নেল আহা হা করে বাজখাই গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন এবং আমাকে দেখতে পেয়ে করুণ স্বরে বললেন, করলে কী জয়ন্ত! আমার বাইশ ঘন্টার রক্ত জল করা পরিশ্রম বরবাদ করে ফেললে?
আমি তো অপ্রস্তুত। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বললুম, আমি ভেবেছি আপনার ইলেকট্রিক শক লেগেছে।
কর্নেল হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর হেডফোনের মতো যন্ত্রটা মাথা থেকে খুলে বললেন, তুমি কী ক্ষতি যে করলে জয়ন্ত, তোমায় বোঝাতে পারব না। এই যে যন্ত্রটা দেখছ, এটা উদ্ভিদবিজ্ঞানী স্যার জগদীশ বসুর গবেষণার ওপর ভিত্তি করে এক রুশবিজ্ঞানী সম্প্রতি তৈরি করেছেন। উদ্ভিদের যে ভাষা আছে, তা এই যন্ত্রের মাধ্যমে বোঝা যায় এবং সে যা বলছে, তার জবাবও তার ভাষায় দেওয়া যায়।
অবাক হয়ে বললুম, আপনি ম্যালেরিয়ায় পাওয়া লোকের মত ঠকঠক করে কাঁপছিলেন—তা কি ওই হতচ্ছাড়া ক্যাকটাসটার সঙ্গে বাতচিত?
ঠিকই ধরেছ। বলে ঘুঘুমশাই কোণের দিকে আরামকেদারায় গিয়ে বসলেন। তারপর চুরুট ধরালেন।
পাশের ডিভানে বলে বললুম, না জেনে দোষ করার জন্য ক্ষমা চাইছি।
কর্নেল সন্দেহে হাসলেন। জয়ন্ত! তোমায় একটা বই দেব। দি সিক্রেটস অফ প্ল্যান্ট লাইফ। পড়লে বুঝতে পারবে, উদ্ভিদ কীভাবে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চায়। যাক্ গে, বসো। কফি-টফি খাও! ষষ্ঠীকে বলি।
বলে তিনি ষষ্ঠীচরণকে হাঁক দেওয়ার জন্যে ঠোঁট ফাঁক করার সঙ্গে সঙ্গে ষষ্ঠীচরণ ট্রে হাতে ঘরে ঢুকল। একগাল হেসে বলল, কাগজের দাদাবাবু! প্রতাপগড়ের পেত্নীর খবরটা কি সত্যি গো?
ষষ্ঠী ইদানিং আমায় কাগজের দাদাবাবু বলে সম্ভাষণ করে। তবে দুঃখের বিষয় কাগজের লোক বলেই কাগজের খবরে আমার রুচি নেই। ময়রা কি সন্দেশ খেতে ভালবাসে? তাই বললুম, ষষ্ঠী! পেত্নীর খবরের চেয়ে তোমার কর্তামশাইয়ের যে কীর্তি এইমাত্রার দেখলুম, সেটাই আজকের বড় খবর।
ষষ্ঠীচরণ বেজার মুখে চলে গেল। কর্নেল কফির পেয়ালা তুলে চুমুক দিয়ে বললে, হুম! ষষ্ঠীকে অবহেলা কোরো না ডার্লিং। আজকাল আমি বিবিধ বিষয়ে ওর পরামর্শ নিই। জয়ন্ত, ইনটুইশান বলে একটা ব্যাপার আছে—যা প্রকৃতি অনেক মানুষকে দিয়েছেন এবং এতে শিক্ষিত অশিক্ষিত ভেদাভেদ রাখেননি। তাছাড়া তুমি তো জানো, প্রখ্যাত নাট্যকার ইবসেন নাটক লিখে আগে তার পরিচারিকাকে শোনাতেন।
বললুম, আপনার ভাষণের লক্ষ্য কী কর্নেল? প্রতাপগড়ের পেত্নী?
কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, ষষ্ঠীর মধ্যে প্রকৃতিদত্ত সেই সূক্ষ্মবোধ আছে জয়ন্ত। আজ ওই খবরটার দিকে সে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছে বারবার। আমি ক্যাকটাস নিয়ে ব্যস্ত থাকায় মন দিতে পারিনি। তবে আমার ধারণা, খবরটা নিশ্চয় সামান্য খবর নয়।
পাশে টেবিলের ওপর সেদিনের কয়েকটা কাগজ ছিল। আমাদের কাগজ দৈনিক সত্যসেবককে আমি তত গুরুত্ব দিই না। তাই অন্য একটি বাংলা দৈনিক তুলে নিলুম। প্রথম পাতার নিচের দিকে খবরটা দেখতে পেলুম।
ডাকুরানি লছমীর প্রেতাত্মা?
প্রতাপগড়, ১২ অক্টোবর—সম্প্রতি এ অঞ্চলে অদ্ভুত ধরনের কয়েকটি ডাকাতির খবর পাওয়া গেছে। শেষ ডাকাতি ঘটেছে একটি পেট্রল পাম্পে। গতকাল এই পাহাড়ী শহরের প্রান্তে রাত নটার সময় ডাকুরানি লছমী আচমকা হাজির হয়। তাকে দেখামাত্র পাম্পের কর্মচারীরা হতবাক হয়ে যায়। কারণ লছমী গতমাসে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছে এবং অসংখ্য মানুষ তার মৃতদেহ দেখেছে। অবিকল সেই রক্তাক্ত মৃতদেহ জীবিত, মানুষের মতো পেট্রল পাম্পে উপস্থিত হয়েছে এবং তার হাতে যথারীতি রিভলভারও রয়েছে দেখে কর্মচারীরা আতঙ্কে কেউ মুছিত হয়ে পড়ে, কেউ দিশেহারা হয়ে পালিয়ে যায়। পাম্পের মালিক পুলিশকে জানিয়েছেন, তার ক্যাশে তখন সতেরো হাজার টাকা ছিল। সে টাকা আর পাওয়া যায়নি। পুলিশের ধারণা, কেউ লছমী সেজে একাজ করে বেড়াচ্ছে। ইতিপূর্বে ঠিক এমনি ঘটনা আরও কয়েকটি ঘটেছে।
উল্লেখ করা যায়, এই পেট্রল পাম্পের মালিকের বাড়িতেও কদিন আগে মৃতা লছমী একইভাবে হানা দেয়। তখন তিনি তার রাইফেল থেকে গুলি চালান। আশ্চর্য, লছমীর গায়ে একটা গুলিও লাগেনি। পুলিশ অবশ্য এ ঘটনার ব্যখ্যা দিয়ে বলেছে যে গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছিল।
কাগজটা মুড়ে রেখে দিলুম। কর্নেল বললেন, তোমার ইনটুইশন কি জয়ন্ত?
পুলিশ যা বলেছে।
