সেই পাখির বাসার মত, নিরন্তর ঝড়-বাদলায় খড়কুটো সংগ্রহ করা—বাসা তৈরি করা। ডিম ফুটলে ছানাপোনার আহার সংগ্রহ করা। তারপর তাদের উড়ে যাওয়া। পাখির কোনো নিঃসঙ্গ বেদনা থাকে না। মানুষের কেন যে থাকে।
তখনই মনে হল কে ডাকে, দাদু, আমি!
কে!
আমি চিনতে পারছ না, তোমার ছোটো আমি।
ছোটো আমি বলে কী বলতে চায়! কেউ যেন দৌড়ে বড়ো উঠোন পার হয়ে যাচ্ছে। ঠাকুরদা লাঠি নিয়ে বের হচ্ছেন। তাঁর সেই ছোটো আমি সঙ্গে। সকালবেলায় ঠাকুরদা গোপাট ধরে হাঁটেন। তারা কভাই। কখনও ঠাকুরদা গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকেন। তারা ছুটে বেড়ায়। চোখে দেখতে পান না—অথচ অভ্যাস এতকালের, কোথায় কী গাছ, কোন বৃক্ষলতা বড়ো হয়ে উঠেছে টের পান। কী জমজমাট! উত্তরের ঘরে ঠাকুরদা, ঠাকুমা, দক্ষিণের ঘরে বৈঠকখানা, পূবের ঘরে বড় জেঠি, পশ্চিমের ঘরে সোনা জেঠি, কামরাঙা গাছের নীচের ঘরে ছোটো কাকি থাকেন—বড়োরা মিলে সারাদিন ঠাকুরদার চারপাশে উত্তেজনা ছড়িয়ে রাখে। দাদুর শেষ জীবনটা ছিল ভারি বর্ণাঢ্য। মৃত্যুর সময় ঘোড়ায় চড়ে এসেছিল অবিনাশ কবিরাজ, উত্তর-দক্ষিণে যত আত্মীয়স্বজন সবার বাড়ি বাড়ি লোক গেল, খবর দিল কর্তার সময়কাল উপস্থিত। শেষ দেখা দেখে আসুন। ঠাকুরদা নিজেও বুঝেছিলেন, সাদা বিছানায় সাদা চাদরে শুয়ে। সবাই আসছে—দাদু বলছেন, কে?
আমি হেমন্ত।
কে তুমি?
আমি নন্দ।
তরমুজের জমি, চাষ আবাদ সব ঠিকঠাক আছে তো!
আছে কর্তা। বিলের জমি হাতছাড়া শুনলাম।
মামলায় সাক্ষী পেলাম না কর্তা।
দাদুর মুখে সরল হাসি। যে বোঝে সে বোঝে।
এক অন্ধকার থেকে অন্য কোনো অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার আগে ডানা ঝাপটানো। ঘোড়ার পায়ের শব্দ কোথাও। কবিরাজ এসে দেখেছিল, বাড়িতে অতিথি অভ্যাগতে ভর্তি। বড়ো জেঠিমা, সোনা জেঠিমা হেঁশেলে। সিংবাড়ির অন্নদা কুয়ো থেকে কেবল জল তুলছে। দাদুর ইহলোক ত্যাগের আগেকার ছবিটা কেমন ঝুলে থাকল কিছুক্ষণ চোখের উপর। হরিনাম সংকীর্তন, নাপিতবাড়ির হরকুমার খোলে চাঁটি মারছে। করতাল বাজাচ্ছিল গৌর সরকার। দাদু সাদা চাদর গায়ে সব শুন ছিলেন, আর মাঝে মাঝে বলছিলেন, সবার খাওয়া হল! যেন কত সোজা একটা রাস্তায় রওনা হয়েছেন। বরবেশে কোথাও যাত্রা! সবার খাওয়া হলেই পালকিতে চড়ে বসা। দুই পুরুষ আগেকার এমন মৃত্যুর ছবি এই শেষ রাতে জানালায় দাঁড়িয়ে তিনি মনে করতে পারছিলেন। সঙ্গে অভ্যাসবশে কাজ করে যাওয়া। সব ঘড়িগুলোতেই আগে দম দিতেন। এখন একটাতে এসে ঠেকেছে। হাতে নিয়ে দুবার চাবি ঘোরালেন, তারপরই মনে হল, হাতটা তাঁর অসাড় লাগছে। ঘড়ি মিলিয়ে এ-বাড়িতে আজ আর কারো স্নান আহার করার দরকার নেই। নীল রঙের বাসে তুলে দেবার জন্য কারো হাত ধরে আজ হাঁটতে হবে না। অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন। চাবি দিতে ভুলে গেলেন। ঘড়িটা হাফ দম খেয়ে বিছানায় পড়ে থাকল।
সারারাত জল পড়ার শব্দ আজ তিনি শুনতে পেয়েছেন। যেন বাপ্পা রোজকার মতো দাদুকে রাগিয়ে দেবার জন্য চৌবাচ্চার কল খুলে রেখেছে। তিনি ছুটে গেছেন। না কেউ কল খুলে রাখেনি। কেউ অন্যমনস্কভাবে, কুলটা বন্ধ করতে ভুলে যায়নি। তাঁর নজর এত তীক্ষ্ণ হয়ে গেছিল শেষ দিকটাতে কিংবা শ্রবণশক্তি, যে কোথাও বিন্দুমাত্র দাগ ধরলে দেয়ালে, ঘুনপোকা বাসা করলে ঠিক টের পেতেন। বউমা বউমা, দেখ এসে দেখ, কার আঙুলের ছাপ।
কার আবার হবে! আপনার নাতির।
এবাড়িতে সবাই জেনে গেছিল, বাপ্পার সাতখুন মাপ। সবাই নিজের দোষ বাপ্পার উপর চাপিয়ে রেহাই পাবার চেষ্টা করত।
লক্ষ্মণের কাজ।
লক্ষ্মণ বাড়ির কাজের লোক। সকালে আসে। রান্নাবান্না করে দিয়ে চলে যায়। বউমা লক্ষ্মণের উপর চোটপাট হবে ভয়ে কত সহজে মিছে কথা বলত, না না, লক্ষ্মণ জানে দেয়ালে হাত দিলে ছাপ ধরে যায়। সে করবে কেন। আসলে বউমা ভয় পায় চোটপাটের ঠেলায় লক্ষ্মণ না আবার পালায়। এরা মিছে কথা আজকাল কত সহজে বলতে পারে। আসলে বাড়িটার চেয়ে লক্ষ্মণ তাদের কাছে বেশি মূল্যবান।
মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে ছোটো সহজে এজন্য চলেও যেতে পারল। এই ছোটো একবার দেরি করে ফেরায় কী হাউহাউ কান্না। তখন ছোটো কলেজে পড়ে। বড়ো নির্ভরশীল ছিল তারা পরস্পরের। ধরে ধরে বড়ো হওয়া অথবা বলা যায় কালাতিপাত করা। দায় কারো না। নিজেরই। এই দায় বহন করতে পারার মধ্যে একটা গৌরববোধ কাজ করত। আমি এবং আমার, আমি এবং আমার পুত্র, আমি এবং আমার পুত্রকন্যা, কেউ বি-এ বি-টি, কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার—আমি এবং আমার অস্তিত্ব এম-এ বি-টি পাশ। তার সঙ্গে বাড়িঘর। উপর নীচ মিলিয়ে ছটা শোবার ঘর। টাইল বসানো, ফ্লোরেসেন্ট বাতি, দেয়ালে প্লাস্টিক কালার। সোফাসেট, বাতিদানকারুকার্য করা জীবনপ্রবাহ। জানালায় ভেলভেটের পর্দা দক্ষিণের বাতাসে দোলে। সিঁড়ি সাড়ে তিন ফুট। চার ফুট করার ইচ্ছে ছিল। কাজকর্মের বাড়িতে সরু সিঁড়ি অসুবিধার সৃষ্টি করে। তিনতলায় ঘর করার দরকার নেই। উপরে সামিয়ানা টাঙিয়ে এক লপ্তে দুশো জন খাওয়ানো যাবে। সবটাই আমার, আমার অস্তিত্বের শিকার। ওরা এখন বাপ্পাকে দিয়ে এম-এ বি-টি হতে চায়। এম-এ বি-টি পাস সোজা কথা না। প্রধানশিক্ষক নীলরতন বস। কাঁধে পাটভাঙা চাদর, করিডরে হাঁটার সময় দৃপ্ত ভঙ্গি। জেলা বোর্ডের প্রেসিডেন্ট। কত কিছু অস্তিত্বের শিকার—এখন শুধু সামনে ফাঁকা মাঠ। একটা ঘড়িতে তাঁর চাবি দেবার কথা। তাও দিতে গিয়ে হাত অসাড়।
