মনে হল ঘড়িটা থেমে গেছে। তিনি শেষ রাতের আলোতে বুঝতে পারছেন না। তবে ঘড়ির বুকে শব্দ হয়—শব্দটা থেমে গেছে। আলো জ্বেলে বুঝলেন, ঘড়িটার স্বভাব ইদানীং বেয়াড়া রকমের। চাবি দিয়ে কিছুক্ষণ কানের কাছে না ঝাঁকালে বাবুর কাঁটা নড়ে না। হাফ দম দিয়ে ফেলে রাখলে ঘড়ি শুনবে কেন! ঘড়িটা আরও বেয়াড়া হয়ে উঠছে।
তিনি বললেন, বেটা তুইও শোধ তুলছিস।
ঘড়িটার কাঁটা দুবার নড়ল। আলো জ্বালা বলে মাকড়সার ঠ্যাংয়ের মতো মনে হচ্ছে। কতকাল দম দিয়ে ঠিক রেখেছেন। অয়েলিং করেছেন কতবার। আবার তেল-গ্রিজ খেতে চায়। ঘড়িটা নিজেও কবার খুলে কারিগরি করেছেন। ঘড়িটা নিয়ে আবার কেন জানি তাঁর বসতে ইচ্ছে হল। কারণটা তিনি ঠিকই জানেন, কিছু নিয়ে পড়ে থাকা অভ্যাস মানুষের। এককালে, প্রকৃতি, তার উদাস মাঠ, বিদ্যালয়, এককালে বাবা-মার গ্রাসাচ্ছাদন, ভাই-বোনেদের বড়ো করা—সোজা কথায় কালি করার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করা এবং পরে যামিনী, পুত্রকন্যা সব নিয়ে আবার ঠেলে উজানে নৌকা নিয়ে যাওয়া—সারাজীবন একজন মাঝি আর নৌকার সম্পর্ক যেমন থাকে আর কী!
ঘড়িটা নিয়ে বসার আগে তাঁর কেমন চা খাবার বাসনা হল। বাসনাগুলো আছে বলেই রক্ষা। যদি না থাকত, তিনি আছেন, অথচ তাঁর আর কোন বাসনা এই, তবে তো মৃত ঘোড়া। এখনও কতটা টগবগে ভাবার জন্য বেশ দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে নীচে নামলেন। অন্ধকারে পায়ের মধ্যে কী একটা ঠেকল। সিঁড়িটার এদিকটায় তিনি হাঁটেন না বড়ো। ছোটো এ-ঘরটায় থাকত—পড়ত। ডাক্তারি পড়াটা এত বিদঘুটে তিনি যদি জানতেন। আস্ত মানুষের কঙ্কাল একটা না হয় থাকলই ঘরে! তাই বলে মানুষের আলগা সব যন্ত্রপাতি এনে ঘরটাকে ভরে ফেলা কেন! মানুষের ভিশেরা এবং লিভার দেখতে এমন কদাকার! আর উৎকট ফরমেলিনের গন্ধে ঘরে ঢোকাই দায়। বছর দুই এ-সব ঘরটায় জাঁকিয়ে ছিল। ফাইনাল ইয়ারে ওঠার আগে সব বিদেয় করে দেওয়া হল। কিন্তু মনের খুঁতখুঁতানি যায় না। দক্ষিণা কালীর পূজা এবং চণ্ডীপাঠ। দ্বাদশ ব্রাহ্মণ ভোজন। সন্ধায় মনে হয়েছিল তাঁর বাড়িটার আবার তিনি শুচিতা ফিরিয়ে আনতে পেয়েছেন। এবং রাতে চাদরের নীচে কী একটা শক্ত কিছু লাগতেই উঠে বসেছিলেন। কী লাগে! হাত দিয়ে মনে হয়েছিল একটা শক্ত কিছু। চাদর তুলে মনে হয়েছিল স্পঞ্জের মতো কী যেন নরমও নয়, খুব শক্তও নয়। ছোটোকে ডেকে বলেছিলেন, এটা এখানে কী দেখতো!
ছোটো দেখে বলল, নাকের হাড়!
সব যে তোর কাছ থেকে কে কিনে নিয়ে গেল! এটা এখানে এল কী করে!
সেই তো।
তিনি জানেন ছোটোর স্বভাবটা বড়ো এলোমেলো। কঙ্কালটা সে নিয়ে এসেছিল একটা বড়ো বেতের ঝুড়িতে। দু-দফায় আনতে হয়েছে। এক জায়গায় বসে এক নাগাড়ে পড়তে পারে না বলে, এখানে ওখানে সব ঘরে, কেবল ঠাকুরঘর আর রান্নাঘর বাদে। কীভাবে যে কঙ্কালটার অজস্র হাড় এখানে সেখানে পড়ে থাকত! মানুষের মধ্যে কত হাড় থাকে তার হিসাব ছোটো রাখে। কলেজের নতুন ছেলেটি যখন ঝুড়িটা সহ হাড়গোড়গুলি কিনতে এল, বার বার তিনি বলেছিলেন, মিলিয়ে নিও। ছোটোর কিছু ঠিক থাকে না। কোথাও কিছু পড়ে থাকল কী না…।
ছোটো, ছেলেটিকে বলেছিল, সবই আছে। এদিক ওদিক দু-একটা পড়ে থাকলে তোমায় খবর দেব।
সেই থেকে তিনি প্রায়ই প্রশ্ন করতেন, আর নেই তো!
ছোটো বলেছিল, নেই।
তারপর বছর না ঘুরতেই বিছানার নীচে কী করে যে একটা নাকের হাড় ভেসে ওঠে!
সেই থেকে কখনও অন্ধকারে কিছু শক্ত মতো পায়ে ঠেকলে ভাবেন, ছোটোর সেই কঙ্কালের হাড়। সে কবেকার কথা—অথচ সেই আতঙ্কটা তাঁর এখনও আছে। নীচের ঘরের জানালা বন্ধ থাকে বলে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। এখনও এ-বাড়িতে কঙ্কালটা তবে আছে! আসলে প্রেতাত্মা এবং কঙ্কাল, সংসারে নানাবিধ সংস্কার মানুষের—সবই কিন্তু তকিমমাকার। আলোটা জ্বালাতেও ভয় পাচ্ছেন। কাউকে যে ডাকবেন তারও উপায় নেই। এমন একটা বুড়োমানুষ খালি বাড়িতে প্রেতাত্মার ভয়ে ছোটাছুটি করছেন ভাবতে গেলেও লজ্জা। বরং উপরে উঠে যাওয়া যাক। বাড়িটা ফাঁকা বলে তেনার উপদ্রব বাড়তেই পারে। কোনোরকমে তবু আলোটা জ্বালালেন। বড়ো ঘাম হচ্ছে। দেখলেন পায়ের কাছে পড়ে আছে বাপ্পার একটা চিনেমাটির কড়ে আঙুলের মতো পুতুল।
পুতুলটি হাতে নিতেই মনে হল তিনি আর একা নন। তাঁর দোসর বাপ্পার পুতুল। সুতরাং পুতুলটি তিনি রান্নাঘরে নিয়ে গিয়ে একপাশে দাঁড় করিয়ে রাখলেন–চা করলেন গ্যাসে। তারপর এক হাতে পুতুল অন্য হাতে চায়ের কাপ। তিনি পুতুলটিকে সামনে বসিয়ে ঘড়ি মেরামত করতে বসলেন। কথাবার্তা পুতুলটার সঙ্গেই হচ্ছে।-বাপ্পা তোমাকে আদৌ ভালোবাসে বলে মনে হয় না।
পুতুলটা বলল, হ্যাঁ ভালোবাসে।
ভালোবাসলে ফেলে যাবে কেন।
ওর কত কাজ। স্কুলের পড়া আছে না। বাপ্পাকে মা তো আমার উপর রেগে সব সময় টং হয়ে থাকত।
তিনি ঘড়িটা একটা ছোটো ছুরি দিয়ে খুলে ফেললেন এ-সময়। কাপ তুলে চা খেলেন। তারপর যেন কিছু বলা—বলতে হয় বলে বলা—তুমি বাপ্পার সঙ্গে সব সময় খেললে রাগ তো করবেই।
বাপ্পার মাও তো খেলে। ওই তো বাপুকে নিয়ে গেল—কেবল সারাদিন পেছনে লেগে থাকবে। পড় পড় বলবে। এটা খেলা না!
কখনও না। সকালবেলা আর সন্ধ্যায় পড়বে। আমি বলে দিয়েছি, বিকেলে ওকে খেলতে দিও। দেবেই না। একগাদা টাসক দিয়ে বসিয়ে রাখবে। এখানে এসব পারতো না বলেই তো চলে গেল।
