আসলে বয়স হলে মানুষের বুঝি এমনই হয়। তিনি ভয় পাচ্ছেন। এক অন্ধকার থেকে আর এক অন্ধকারে যাত্রা কেন?
শেষ রাতের দিকে এইসব বাড়ির জানালায় বেশ একটা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে যায়। পাখা চালাতে হয় না। তিনি নিজে অন্তত ঘুম ভাঙলে পাখা বন্ধ করে দেন। পাখার আওয়াজে তাঁর মনে হয় তিনি বিভ্রমে ভুগছেন। পাখাটা বন্ধ করে দিলে চরাচরের গোপন সত্য ধরতে পারবেন তিনি। কিন্তু কে গায়, কোথায় গায়, গানের অস্পষ্ট শব্দমালায় হতচকিত হয়ে নিদারুণ বিভ্রান্তির মধ্যে যান। তখন নিজেই মনে করে নেন, আসলে কেউ তাঁকে সতর্ক করে দিচ্ছে—নিজের একাকিত্বে এতে বিচলিত কেন! সারাজীবন খড়কুটো সংগ্রহ করেছ, এখন তোমার ছুটি। তোমার অপেক্ষায় কেউ আর বসে নেই।
বুকটা তাঁর এত খালি কখনও হয়ে যায়নি। স্ত্রীর মৃত্যুর সময়েও না। তিনি পুত্র কন্যাদের মুখের দিকে তাকিয়ে বল ভরসা খুঁজেছিলেন, শক্ত ছিলেন। কদিন থেকে তাও কে যেন হরণ করে নিয়েছে।
বালিশের পাশ থেকে চশমাটা তুলে নিলেন। চোখে ভালো দেখতে পান না। চশমাটা কত বল ভরসা না পরলে বোঝা যায় না। তিনি যে অক্ষম নন, চশমাটা পরলে টের পান। আগে এদিকটায় ফাঁকা মাঠ ছিল। বাড়িটা করার সময় সবাই তাঁকে কিছুটা মাথাখারাপ লোক ভেবেছিল। যামিনীকে জমিটা দেখিয়ে তিনি বোকা বনে গেছিলেন। বাসস্ট্যান্ডে উঠে হাউহাউ করে কান্না—এ-কেমন জায়গায় জমি কিনলে। অঘ্রাণ মাসে হাঁটু জল।
বেশ নীচু জায়গায় জমি। কিছুদূর দিয়ে ট্যাংরার দিকে একটা খোয়ার রাস্তা চলে গেছে। তিনি বলেছিলেন, এত কম টাকায় কলকাতার কাছাকাছি আর কোথায় জমি পাবে যামিনী!
যামিনী কোনো কথা বলেনি আর।
জমিটা কেনার পর মনে হয়েছিল, জীবনে এমন শখ না জন্মালেও পারত তাঁর। যা আয়, নিজের সংসার, মা-বাবা সবাই মিলে বড়ো টানাটানি যায়। তবু কি যেন থাকে মনে। দারিদ্র্য বড়ো ক্ষোভের বস্তু। আজীবন ছুটিয়ে মারে। আজীবন ভাবনা, বাসাবাড়ি, চাকুরি, মৃত্যু এবং অক্ষমতার যে-কোনো একটা তাঁকে অপদস্ত করলে তিনি ফুটপাথের মানুষ। নিজের জীবন দিয়ে যে দুর্ভাগ্য ভোগের অধিকারী তিনি ছিলেন, পুত্র-কন্যাদের জীবনেও তা ঘটবে ভাবলে তাঁর হাঁটু কাঁপত। কেমন নিরুপায় মানুষের মতো তখন পুত্রকন্যা এবং স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকতেন।
সেই নিরাপত্তা বোধের অভাবই তাঁর বোধহয় সহায় ছিল শেষ পর্যন্ত। একটা জমি, বাড়িঘর, এবং ছাদের নীচে আশ্রয় পাবার জন্য কী অমানুষিক পরিশ্রম গেছে তাঁর। কী না ব্যাকুলতা!
এ-সময়ে মুখে মৃদু হাসি খেলে গেল তাঁর! ফাঁকা বাড়িতে একা মানুষের এই হাসি বড়ো নির্জীব।
কেন হাসলেন?
মনে পড়ল শ্রীমানের জন্মদিনের কথা। ঝড় জল ভেঙে হাসপাতাল। মফস্বল শহরে বাস তাঁর তখন। এমনি আশ্বিনে তাঁর বড়ো পুত্রের জন্ম। এমনি শেষ রাতে তিনি আজকের মতো উদবেগে পায়চারি করছিলেন। কান্না—কোথাও তিনি নবজাতকের কান্না শুনতে পান। দুহাত দুমড়ে মুচড়ে বলছে, আমি এসেছি। আমি খাব। আমার জায়গা চাই। আসলে যে যার জায়গার খোঁজ পেয়ে গেলে সংসারে তখন কেউ আর কারো না।
জায়গা তিনি সবার জন্য করতে পেরেছেন। শুধু এ-বয়সে দেখছেন, নিজের জায়গাটা ফাঁকা হয়ে গেছে।
জানালায় পাশে এক গ্লাস জল থাকে। জলের গ্লাসটা তুলতে গিয়ে হাত কাঁপছিল। জীবনটা পোকা-মাকড়ের মতো মনে হচ্ছিল।
দোতলার জানালায় দাঁড়ালেই দেখা যায়, কত সব ঘরবাড়ি। এইসব ঘরবাড়ির মধ্যে লুকিয়ে থাকে হাজার রকমের সুখ-দুঃখ। বাইরে থেকে বোঝাই যায় না, এক অতি নিরন্তর নিঃসঙ্গতা অন্তরালে কাজ করে যায়। সব একদিন কেমন অর্থহীন মনে হয়।
আকাশে কিছু মেঘের ওড়াউড়ি চলছে। এই জানালাটা তাঁর ভারি প্রিয়। যামিনী বেঁচে থাকতে সব লক্ষ রাখত। ইজিচেয়ার পাতা থাকত। এখানে বসে, সকালের সূর্য ওঠা থেকে পাখি ওড়া সব দেখতেন। খাল পার হয়ে যে বড়ো উপনগরী তৈরি হচ্ছে, সেখানে তখন ঘরবাড়ি ছিল না। শুধু নিরন্তর মাঠ আর কাশবন। অনেক দূরে দেখা যেত একটা সাদা মতো বাড়ি। কেমন রহস্যময় লাগত বাড়িটাকে। ঝাউগাছের গ্রিন ভার্স তৈরি হচ্ছে তখন। আর খালের এপারে সব জলাজমি ধানের খেত। দেখতে দেখতে সব কোথায় কবছরে হারিয়ে গেল।
এগুলো তিনি কেন ভাবছেন। কিছুই তো ভাবার কথা নয়। সব ঘরগুলো ফাঁকা। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেল। বড়ো ছেলে চলে গেল বাইরে। ছোটো ছেলে ছিল, বউমা ছিল। আর ছিল বাপ্পা। কতদিন থেকে সেই ছোটো শিশুটি তার একাকিত্বের সঙ্গী ছিল। তারাও ফ্ল্যাট কিনে চলে গেল। এই চলে যাওয়াটা যে কী করুণ কেউ বুঝল না।
আমি দাদু যাব না।
না, যাও। তোমার স্কুল কাছে হবে।
আমি তো এখান থেকেই যেতাম।
যেতে। এখন যেতে কষ্ট হবে।
কে বলে!
কে যে বলে বুঝি না!
বাপ্পা বায়না ধরেছিল। ছোটো বলল, আপনি বুঝিয়ে বলুন। ও তো বোঝে না, এতদূর থেকে কত অসুবিধা।
সেই।
কে যেন মনের কোণ থেকে উঁকি দিয়ে বলল, কী বুঝছ!
কিছু না।
বুঝতে চাও না। সব করলে কার জন্য!
সেই।
ছোটোর সেই এক কথা, আপনার বউমার কষ্ট হয় এতদূর থেকে রোজ ট্রেনে যেতে।
তিনি শুধু বলেছিলেন, আমার জন্য ভেব না। আমার চলে যাবে।
ওরা চলে যাবার পর কদিন খুব উতলা হয়েছিলেন। কিছু আর করার নেই। কারো জন্য আর ভাবতে হবে না। ঠিকঠাক সবাই বাড়ি ফিরে এল কি না, বারান্দায় দাঁড়িয়ে আর অপেক্ষা করার দরকার নেই। মুক্তি। মুক্তি। এ সময়ে তাঁর চোখে জল দেখা দিল।
