আমি রাস্তা হারিয়ে ফেলতে পারি। ভয় ধরে গেল। ডাকলাম, ল…তা…আমাকে একা ফেলে কোথায় চলে গেলে। ল…তা…।
কোনো সাড়া পেলাম না।
আমি যেন আরও গভীর বনভূমিতে ঢুকে যাচ্ছি। ওকে আর দেখা যাচ্ছে না!
আর পারলাম না, চিৎকার করে বললাম রাস্তা হারিয়েছি।
আর তখন দেখি নীচে, অনেক নীচে, হ্রদের পাড়ে দাঁড়িয়ে সে হাত তুলে দিচ্ছে।
ক্ষোভে অভিমানে নীচে নেমে ওর সঙ্গে আর একটা কথাও বললাম না। ব্যাগ ফ্লাকস দিয়ে সোজা এসে বাসে ওঠে পড়লাম। চেয়ে দেখি, সেও কখন আমার পাশে এসে বসে পড়েছে। চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে।
–কী হল!
লতা কিছু বলল না।
জাহাজে ফিরে সারারাত ঘুমাতে পারলাম না। এমন বিচিত্র মেয়ে কে কবে কোথায় দেখেছে। তার গির্জায় বসে থাকা, আমার সংলগ্ন হয়ে বসে থাকার মধ্যে এক আশ্চর্য নরম উষ্ণতা যে টের পেত, সে কেন আমাকে এত ভয় পেয়ে নীচে নেমে গেল!
আমার আর যাওয়া ঠিক কিনা ভেবে জাহাজ থেকে কদিন নেমে গেলাম না। এক রবিবারে দেখি লতা নিজেই হাজির। যে ফিরিয়ে দেয়, সে ভয় পায়, সে যদি যেচে আবার নিজেই চলে আসে ঠিক থাকি কী করে? আগের মতোই নিয়মিত আবার যাওয়া আসা। বন্ধু দেবনাথের সঙ্গেও তার বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। অনেক দিন আমরা একসঙ্গে ওর দোকানে গেছি। সে বাড়ি থেকে আমাদের জন্য কোনোদিন নিজের হাতে রান্না করা খাবার উপহার দিত। খেতে যে খুব ভালো লাগত তা না, তবু নিতাম এবং তৃপ্তি করে খেতাম। কোনোদিন জাহাজে টিফিন ক্যারিয়ারে নিয়ে আসতে হত খাবার। পরদিন বিকালে ফিরিয়ে দিতাম। রাতও হয়ে যেত।
এমনি একদিন টিফিন ক্যারিয়ার ফিরিয়ে দিতে গিয়ে টের পেলাম—বেশ রাত হয়ে গেছে। আটটায় দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে যায়। দেবনাথ বন্ধুর রাতে ওয়াচ আছে। পাহাড়ের নীচে বসে লতাকে নিয়ে গল্প জমে উঠেছিল। একবার ওর বাড়ি যাওয়া দরকার। কোথায় থাকে এটাই জানা হয়নি। আমার অভিজ্ঞতার কথাও বললাম। ওদের এক কথা, পাগলি!
এমন কথায় আমি যে কষ্ট পাই ওরা বোঝে। ওকে ছোটো করলে যেন আমাকে ছোটো করা হয়—এই ধরনের নানা কথাবার্তায় রাত হয়ে গেলে, ওরা বলেছিল, তুই দিয়ে আয়। আমরা জাহাজে ফিরছি। ঘড়ি দেখে বলল, ইস, দেরি হয়ে গেল।
গিয়ে দোকান বন্ধ দেখব বুঝতে পারিনি। কিন্তু ভিতরে আলো জ্বলছে! আলো জ্বলায় নিশ্চিত হলাম। দরজার বেল টিপলে, কিংবা ঠেলে দিলে তাকে দেখতে পাব। ভেবে সিঁড়ি ভাঙতে গিয়ে মনে হল ধস্তাধস্তি হচ্ছে। ফলের ঝুড়ি ছিটকে পড়ছে। ওর গলা পেলাম। সে স্তিমিত গলায় আর্তনাদ করে উঠছে, ছেড়ে দাও। পারছি না। লাগছে! মা মেরির দোহাই।
আর পারলাম না। লতাকে কি কেউ মারধোর করেছে। ধস্তাধস্তি কেন!
দরজা ঠেলে দিতেই ঘরটা হাঁ হয়ে গেল। উত্তেজনায় মাথায় কিছু ঠিক থাকে না। দরজা লক করতে ভুলে গেছে। দোকান বন্ধ থাকলে দরজা ঠেলে কারও ঢোকার নিয়ম থাকে না। দেখছি লতার উপর একটা বিশাল লোক ফলের কাউন্টারের প্ল্যাটফরমে বাঘের মতো হামলে পড়েছে। লতা দু-হাতে বাধা দিচ্ছে। ওর শরীরের বেশবাস আলগা।
এত উন্মত্ত যে, একটা লোক ভিতরে ঢুকে গেছে তাও টের পায়নি। লতা শুধু আমাকে দেখে ফেলেছে।
আমি সঙ্গে সঙ্গে বের হয়ে এলাম। দৌড়ালাম। হা
ত-পা কাঁপছে। কসাই লোকটা! লতার মালিক লোকাটা। লতাই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল একদিন। আমি সেদিন রাতে জাহাজে ফিরতে পারিনি। গির্জার সিঁড়িতে শুয়ে আকাশ পাতাল ভেবেছি। এক অনাত্মীয়া নারীর জন্য চোখে এত জল আসে আগে জানতাম না। শীতে আমি জমে যাচ্ছিলাম। তবু মানুষের এক পাপ আমাকে তাড়া করছে। সকালে জাহাজে ফিরলে সবাই অবাক। সারেঙ সাব বললে, তুইও নষ্ট হয়ে গেলি!
বললাম, হ্যাঁ চাচা। জাহাজে কাজ করলে কে কবে নষ্ট চরিত্রের হয়নি বলুন! নষ্ট হয়েছি বেশ করেছি। বেশ করেছি।
বিকালে দোকানে গেছিলাম। মালিক লোকটি আজ নিজেই খদ্দের সামলাচ্ছে। মুখে অমায়িক হাসি।আসুন।
শালা খচ্চর। বললাম, লতা আসেনি?
-না।
পরে প্রতিদিন বিকেলে গেছি।–লতা আসেনি?
-না।
একদিন লোকটা বিরক্ত হয়ে বলল, আর আসবে না। না বলে কয়ে কোথায় সে চলে গেল। পুলিশে ডাইরি করেছি। টাকা তছরুপের।
চিনেমাটির পুতুল
শেষরাতে তিনি আজও কান খাড়া করে রাখলেন। কে গায়! কোনো দূরবর্তী মাঠে উদাস গলার স্বর—কাছাকাছি তো কোনো মাঠ নেই, শস্যক্ষেত্র নেই! কে গায়। আগে মনে করতেন স্বপ্ন, ভেঙে গেলে মনে হত স্বপ্ন নয়, সত্যি। নদীর ওপারে দাঁড়িয়ে কেউ তাঁকে ডাকছে। কে সে? ইদানীং ভয়ে ভয়ে আগেই ঘুম ভেঙে যায়। আজও ঘুম ভাঙলে টর্চ জ্বেলে ঘড়ি দেখলেন, ঠিক চারটে। শেষ রাত। জানালা খোলা থাকে। রাস্তার আলো জ্বালা থেকে বলে, রাত কত গভীর বোঝা যায় না। শুধু নিঝুম একটা ভাব থাকে, তার তারতম্য থেকে আন্দাজ করতে পারেন রাত। নিশুতি, না আরও গভীরে কিংবা শেষের দিকে। জানালা খুলে তিনি দেখতে পান সেই বিশাল আকাশ, আর কিছু নক্ষত্র। যা তার জন্মেও এক ছিল, শেষ রাতেও এক আছে।
কে গায়!
গায়, না তিনি নিজের মধ্যেই কোনো উদাস গানের সুর সঞ্চার করেন। শুনতে পান যেন সে আর কেউ নয়, তিনি নিজেই।
জানালা খুললে কিছু গাছপালা নজরে আসে। সামনে পাকা রাস্তা। ছিমছাম সব কিছু। সামনে বড়ো স্কুলবাড়ি। স্কুলবাড়ির মাঠটায় কেউ দাঁড়িয়ে গাইছে না তো! না সেখানে কেউ নেই। গানের কোনো শব্দ স্পষ্ট নয়। অদ্ভুত এক ব্যঞ্জনা সেই সুরের। যেন বলে যায় কেউ, এক অন্ধকার থেকে আর এক অন্ধকারে যাত্রা।
